
নিউ ইয়র্ক শহরের এক প্রান্তে, আটলান্টিক মহাসাগরের কোল ঘেঁষে শুয়ে থাকা ফার রকওয়ে বিচ। যেখানে ইট-পাথরের নগরজীবন এসে মিশে যায় জলের ছন্দে, আর ক্লান্ত আত্মারা এসে খোঁজে এক চুমুক প্রশান্তি। ফার রকওয়ে—একটা জায়গা নয়, যেন এক অনুভব; যেখানে জীবনের ব্যস্ততায় হারিয়ে যাওয়া মানুষ ফিরে পায় নিজেকে। এখানে নীলাকাশ এতটাই বিস্তৃত যে মেঘেরা রং বদলায় মুহূর্তে মুহূর্তে। বাতাসে লবণের ঘ্রাণ, বালুর পরতে পরতে জমে থাকা মানুষের পদচিহ্ন, আর সমুদ্র—সে যেন এক অন্তহীন আত্মকথার পাণ্ডুলিপি, যার প্রতিটি ঢেউয়ে লেখা আছে কারও না কারও গল্প।
এই সমুদ্র কখনও বড় দয়ালু—ছেলেমেয়েরা তার কোলে খেলে, প্রেমিক-প্রেমিকারা তার ধারে বসে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনে। আবার কখনও সে ভয়ংকর—এক নিমেষে সে কেড়ে নেয় জীবন, ছিন্নভিন্ন করে দেয় সংসার, আর ঢেউয়ের পর ঢেউ তুলে শোককে ঢেকে দেয় নিজের নীল চাদরে।
ঠিক এমনই এক সকালে—যখন আকাশে রোদের ছোঁয়া ছিলো, বাতাসে ছিল নির্জন গ্রীষ্মের সুর, আর পাথুরে শহর ঘুম ঘুম চোখে জেগে উঠছিল—তখনই ঘটল সেই অপ্রত্যাশিত, হৃদয়বিদারক ঘটনা।
তিনটি কিশোরী—তিনটি ফুটন্ত গোলাপ, তিনটি ভবিষ্যৎ—একসাথে নেমেছিল জলে, একসাথে ধরা দিয়েছিল ঢেউয়ের আহ্বানে। তারা এসেছিল আনন্দ খুঁজতে, মুগ্ধতা পেতে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতিময় সকালে সমুদ্র তার রহস্যময় রূপ ত্যাগ করে হয়ে উঠেছিল করাল। ঢেউয়ের নীচে, প্রতিস্রোতের টানে তারা হারিয়ে গেল।
২০০১ সালের ২৩ জুলাই, সোমবার। সকাল ৯টা। সেই সকালে নিউ জার্সির প্যাটারসন থেকে আসা এক বাংলাদেশী পরিবার পৌঁছায় ফার রকওয়ে বিচে। গাড়ির ট্রাঙ্কে ছিল খাবারের বাক্স, বালতি আর তোয়ালে। সেদিনের পরিকল্পনা ছিল একটি সাধারণ ‘বিচ ডে’।
চাচা মোহাম্মদ ইসলাম তখন গাড়ি থেকে জিনিসপত্র নামাচ্ছিলেন, আর সেই ফাঁকেই কিশোরীরা উচ্ছ্বাসে ঝাঁপিয়ে পড়ে সমুদ্রের জলে। জোবেদা আহমেদ (১৬), তার ছোট বোন সাজেদা আহমেদ (১২) এবং তাদের চাচাতো বোন রাহেলা বেগম (১৩)—তিনজনই জন্মসূত্রে আমেরিকান নাগরিক হলেও, হৃদয়ের গভীরে লালন করত বাংলাদেশের শিকড়। তাদের দেশের বাড়ি বাংলাদেশের সিলেট জেলায়।
তারা তিনজন যখন সাঁতার কাটছিল, তখন সৈকতে ছিল না কোনো লাইফগার্ড। নিউইয়র্ক সিটির নিয়ম অনুযায়ী সকাল ১০টার আগে বিচে সাঁতার নিষিদ্ধ। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা কে মানে? ঢেউ ছিল শান্ত, সূর্য মিষ্টি, চারপাশে কেউ নেই।
কিন্তু আটলান্টিক তার বিপদ লুকিয়ে রাখে না বেশি সময়। হঠাৎ একটি রিপ কারেন্ট, অর্থাৎ একটি সংকীর্ণ কিন্তু প্রচণ্ড শক্তিশালী প্রতিস্রোত যা তীর থেকে গভীর সমুদ্রের দিকে টেনে নেয়, হঠাৎ ধেয়ে আসে। এক মুহূর্তে কোমর-সমান জল উঠে আসে গলা ছুঁই ছুঁই; পরের মুহূর্তেই তারা হারিয়ে যায় মধ্য সমুদ্রে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, “তারা সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিল, কিন্তু উদ্ধারকারী কেউ কাছাকাছি ছিল না।” একমাত্র রাহেলা তখনও হাত উঁচু করে ভাসছিলো। তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। ডাক্তাররা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেন। কিন্তু তার হৃদস্পন্দন থেমে গিয়েছিল।
আর জোবেদা ও সাজেদা? তারা যেন পানির নিচে এক অদৃশ্য টানেলে ঢুকে গেল। কেউ আর তাদের খুঁজে পায় না। কোস্ট গার্ড, পুলিশ, স্কুবা ডাইভার—ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোঁজ চলল। জাহাজ, হেলিকপ্টার, নৌকা—সবই নামানো হলো। কিন্তু আটলান্টিক গিলে নেয়, ফিরিয়ে দেয় না সহজে।
ঘটনার পাঁচদিন পর, ২৮ জুলাই, Beach 36th Street-এর কাছে পাওয়া গেল জোবেদার নিথর দেহ। ঢেউয়ের তীরে ভেসে এসেছিল তার শরীর, যেন সমুদ্র নিজেই বলছে—“আমার ক্ষমা করো।” আর সাজেদার দেহ পাওয়া গেল আরও পরে, ১ আগস্ট, Beach 88th Street-এ।
নিউ ইয়র্কের ফার রকওয়ে বিচ তার সৌন্দর্য দিয়ে যেমন মুগ্ধ করে, তেমনি ভয়াবহতা দিয়ে বিস্মিত করে। এটি এমন এক সমুদ্রতট, যা দিনে ভ্রমণপিপাসুদের প্রশান্তি দেয়, অথচ রাতে সমুদ্রের গর্জনে লুকিয়ে থাকে মৃত্যুর নিঃশব্দ আহ্বান। বালুর গায়ে খেলা করা ঢেউ যতটা কোমল মনে হয়, তার নিচে ততটাই প্রতারণাময় প্রতিস্রোত—যা মুহূর্তে মুহূর্তে একজন মানুষকে টেনে নিয়ে যেতে পারে গহীন অতল জলে। গত দুই দশকে ফার রকওয়ে বিচের এই সুন্দর-মরণফাঁদ প্রাণ কেড়ে নিয়েছে অন্তত ২৮ জন মানুষের।
নিউইয়র্ক সিটি কর্তৃপক্ষ বহুবার সতর্কতা জারি করেছে। বিচজুড়ে দেখা যায় “Swimming Prohibited Before 10 AM” বা “Beware of Rip Currents” লেখা সাইনবোর্ড। কিন্তু পর্যটক ও স্থানীয় অনেকেই এই নির্দেশনাকে তেমন গুরুত্ব দেন না। কারণ এখানকার ঢেউ প্রথম দর্শনে নিরীহ—তাতে থাকে না কোনো ভয়াবহ পূর্বাভাস, থাকে না হিংস্রতার কোনো আভাস। অথচ নিচে লুকিয়ে থাকে এমন স্রোত, যা একবার টেনে নিলে আর ফিরতে দেয় না; সোজা গভীর সমুদ্রের দিকে টেনে নেয়।
ফার রকওয়ে বিচ তাই শুধু একটি সমুদ্রতট নয়—এটি এক জেগে থাকা স্মৃতিস্তম্ভ, যেখানে প্রতিটি ঢেউয়ে শোনা যায় হারিয়ে যাওয়া মানুষের আর্তনাদ। এখানে সমুদ্র যেমন আলো এনে দেয় জীবনে, তেমনি ছায়াও বিস্তার করে নিঃশব্দে।
এই মৃত্যু কেবল তিনটি প্রাণকে নিয়ে যায়নি, এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—প্রকৃতি কখনো খেলনা নয়। তাদের হারিয়ে যাওয়ার সেই মুহূর্তটি আজও আটলান্টিকের ঢেউয়ের গর্জনে প্রতিধ্বনিত হয়। সেইদিন, ফার রকওয়ে বিচ আর কেবল একটি পর্যটনস্থল ছিল না—তা হয়ে উঠেছিল এক শোকমগ্ন তীর, যেখানে জল আর জলরাশি সাক্ষ্য রেখেছিল তিনটি কিশোর জীবনের অসমাপ্ত স্বপ্নের।
ফার রকওয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে, ঢেউ আসে, মানুষ আসে, হাসি-ধ্বনি শোনা যায়। কিন্তু কেউ জানে না, এই বালুর নিচে তিনটি নাম কাঁদে—নীরবে, প্রতিটি ঢেউয়ের গর্জনে।
বি. দ্র: রিপ কারেন্ট প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে ৮০ জনের প্রাণ নেয়। (তথ্যসূত্র: NYC Parks & Recreation Annual Safety Report, 2024)









