সম্পাদকের পাতা

‘কেচকি বান্দির পুতের নাম সুলতান খাঁ’!

নজরুল মিন্টো

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের কয়েকটি জনপ্রিয় প্রবাদের একটি হচ্ছে: ‘কেচকি বান্দির পুতের নাম সুলতান খাঁ’। প্রবাদটি বুঝায়: যোগ্যতা নেই, কিন্তু মঞ্চের মাঝখানে কুশন পেতে বসতে চায়। উঠোনে চৌকি বিছানোর জায়গা মেলে না, তবু দরজায় ঝোলানো সাইনবোর্ডে লেখা থাকে “রয়্যাল ভিলা”। বাহ্যিক চাকচিক্যের ঝিলিক, ভেতরে শূন্যের নকশা—এই বেমানান নাম–ধাম, ঠাঁট–বাট আর ফাঁপা বড়াইকেই ব্যঙ্গ করে এই প্রবাদ।

ইদানীং এ প্রবাদটি শহুরে মানুষের মুখে মুখেও খুব চলছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের এক ‘শিশু উপদেষ্টা’ যখন বলেছেন— রাত তিনটায় তিনি হাঁসের মাংস খেতে পূর্বাচলের নীলামার্কেটে যান, সেখানকার দোকান বন্ধ পেলে গুলশানের পাঁচ তারকা হোটেল ওয়েষ্টিনে খান। তারপর থেকে সামাজিক মাধ্যমে হাস্যরস, আলোচনা, সমালোচনা এবং ট্রলের ঝড় ওঠে।

বাংলার ইতিহাসে ‘খয়ের খাঁ’ নামে চাটুকারদের আলাদা এক অধ্যায় ছিল। এদেরকে “জ্বি হুজুর”ও বলা হতো। বিগত সরকারের আমলে এর ‘আপগ্রেড’ হয়ে ‘সুলতান খাঁ’-দের জন্ম হয়। এসব সুলতান খাঁ-রা হচ্ছে খয়ের খাঁ-দের বাপ। এরা কেবল চাটুকারিতা বা মোসাহেবিতে পারদর্শি নয়; এরা ধান্দাবাজ, এরা তদবিরবাজ, এরা বাটপার, এরা লুটেরা। এদের লুটপাটে দেশ কাঙলা হয়ে গেছে।

দেশের এমন কোনো সেক্টর নেই যে এসব কেচকি বান্দির পুতেরা লুট করেনি! কত মানুষের কল-কারখানা দখল করে তারা রাতারাতি মালিক বনে গেছে— মানুষ সেটা দেখেছে। ভুয়া পরিচয় দিয়ে এরা কিভাবে বোকা বানাতো— সে গল্পও মানুষের মুখে মুখে। এসব চাপাবাজদের কারণে বাংলাদেশের আজকের এ দুরবস্থা বলে মনে করেন এলাকার সাধারণ মানুষ—তথা দেশের সর্বস্তরের মানুষ।

৪৩° ডিগ্রি সেলসিয়াসে ‘বিশেষ কোট’ গায়ে লাগিয়ে, বঙ্গবন্ধুর নামে শ্লোগান দিয়ে এসব কেচকি বান্দির পুতেরা বাংলাদেশের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। এদের বেশিরভাগই বিভিন্ন দেশের পাসপোর্ট হোল্ডার। তারা চোরাপথে দেশ ত্যাগ করে এখন তাদের সেকেন্ড হোমে তথা নিরাপদ দেশে চলে এসেছে। তারা আজ ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

পলাতক এসব বাটপাররা গত এক বছর চুপচাপই ছিল। তারা জানে তাদের কর্মকান্ড সম্পর্কে কমিউনিটির মানুষ অবহিত। তাই তাদের দেখা যেতো না। বলা যায়, কমিউনিটিতে অঘোষিতভাবে এরা প্রত্যাখ্যাত ছিলো। কিন্তু গত এক বছর ধরে নানান কৌশলে তারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বড় অঙ্কের চাঁদা দিয়ে, গোল্ড/প্লাটিনাম স্পনসর হয়ে, মসজিদে মসজিদে মুঠো ভরে ডলার/পাউন্ড বিলিয়ে চেষ্টা করেছে— তাদের কুৎসিত চেহারা ঢাকতে। চেষ্টা করেছে নতুন করে ভাবমূর্তি তৈরি করতে। কোথাও কোথাও সেই ‘ইমেজ-ওয়াশিং’আংশিক ব্যর্থ হলেও দুঃখজনকভাবে অনেক জায়গায় তারা সফল হয়।

সম্প্রতি বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন শহরে এসব বাটপারদের (বিশেষ কোট গায়ে নেই) দেখা গেছে। সাধারণ মানুষের ভিড়ের মধ্যে ঢুকে এদের উঁকিঝুঁকি দিতে দেখা যায়। ফেসবুকে বিভিন্নজনের পোষ্টে তাদের ছবি দেখে নেটিজনরা তাজ্জব বনে গেছে। কমিউনিটির সাধারণ মানুষ এতো কিছু বুঝেন না, কিন্তু সচেতন মহল তো তাদের জানেন ও চেনেন। অভিযোগ উঠেছে কমিউনিটির অযোগ্য, পরিত্যক্ত কতিপয় নেতা এসব বাটপার-লুটেরাদের গর্ত থেকে বের করে আনছেন। বিগত সরকারের আমলে বিভিন্ন সুবিধা নেয়া লেখক-সাংবাদিকও ভবিষ্যতে আরও প্রাপ্তির আশায় এদের জায়গা করে দিচ্ছেন।

২০২৫ সালের ১৫ আগষ্ট ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়েছে। সারা বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দলীয় বৃত্তের বাইরে এনে এবারই প্রথম দলমত নির্বিশেষে সকল ধরনের মানুষ সম্মান জানিয়েছে; কোটি কোটি মানুষ হৃদয় থেকে বাংলার অবিসংবাদিত এ মহান নেতাকে স্মরণ করেছে। এমতাবস্থায় বাটপারেরা এসব আয়োজনে চুপিসারে ঢুকে পড়ে মহৎ স্মরণসভাকে কলুষিত ও অসম্মানিত করেছে বলে অনেক আয়োজক ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠকদের প্রতি আহবান, দয়া করে লুটেরা-বাটপারদের কমিউনিটিতে স্থান করে দেবেন না। আয়োজন ছোট হলেও নির্মল থাকুক। লুটের টাকায় মঞ্চ বড় হয়, মন বড় হয় না—লাইট জ্বলে, কিন্তু আলো জন্মায় না। যে টাকা মানুষের চোখের জল শুকিয়েছে, সেই টাকায় ব্যানার উড়ালে বাতাসও ভারী লাগে। মনে রাখুন, মাটির প্রদীপে আলো কম, কিন্তু তা থাকে গরম ও আন্তরিক; নকল ঝাড়বাতিতে ঝলক বেশি, উষ্ণতা নেই।

আমরা বাংলাদেশকে ভালোবাসি, বাংলাদেশটাকে সুন্দর দেখতে চাই। যাদের কারণে আমার দেশটার আজ এই অবস্থা তারা যেই হোক, যে দলেরই হোক, আসুন তাদেরকে ঘৃণা করি।


Back to top button
🌐 Read in Your Language