
লন্ডনের পূর্ব প্রান্তে, শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে, টেমস নদীর শান্ত গতি যেখানে শহরের হট্টগোল থেকে কিছুটা দূরে, সেখানেই সজাগ নিঃশ্বাসে জেগে ওঠে একেকটি সকাল। উঁচু উঁচু টাওয়ার ব্লকগুলো যেন আধুনিক শহরের নীরব প্রহরী, মেঘ ছুঁয়ে থাকা ছাদ তাদের শিরে, নিচে জীবন ঘন রুটিনে বাঁধা। এখানে সূর্য উঠে কাচের জানালার ফাঁক গলে, আর বিকেল নামে ধীরে ধীরে রেলিং ছুঁয়ে ছায়া নামিয়ে।
কলাম্বিয়া রোড—যেখানে প্রতি রোববারে বসে রঙিন ফুলের মেলা, আর বাতাস ভরে যায় তাজা লিলির সুগন্ধে। এই রাস্তা জুড়ে হাঁটে অভিবাসীদের ক্লান্ত পা, বুকভরা স্বপ্ন আর গোপন কান্না নিয়ে। সেই পথের শেষে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সিভিল হাউস—একটি টাওয়ার ব্লক, কংক্রিট আর ইস্পাতে গাঁথা বহুভাষিক এক মহল্লা, যেখানে প্রতিটি দরজার আড়ালে লুকিয়ে আছে আলাদা আলাদা একেকটি জীবনকথা।
পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রিন এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঘাঁটি। খয়েরি ব্রিকের ঘেরা রাস্তায় সকালে হাঁটলে দেখা যায় গায়ের চাদর টেনে হেঁটে চলা বৃদ্ধ, হাতে কাঁচাবাজারের ব্যাগ, পাশে ছোট্ট ছেলেটি স্কুল ইউনিফর্মে। এখানে আধুনিকতা এসে মিশেছে অভিবাসনের ক্লান্ত ভোরের সঙ্গে।
সেখানেই থাকতেন নূরজাহান খাতুন। তার পরিবার ব্রিটেনে অনেক বছর ধরেই বসবাস করছিলেন। তার বিয়ে হয় সিলেট শহরের শাহী ঈদগাহ এলাকার মকসুদ নামের একজনের সঙ্গে। বিয়ের পর মকসুদ এদেশে এলে তাদের ঘরে ফাহমিদার (সুজানা) জন্ম হয়। কিন্তু সন্তানের আগমনেও দাম্পত্য কলহ থামেনি, শেষ পর্যন্ত তাঁদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে।
এরপর তার দ্বিতীয় বিয়ে হয় জিতু মিয়া ওরফে বাদশা মিয়ার সঙ্গে। সে ছিল একজন ব্যর্থ রিফুউজি আশ্রয়প্রার্থী, বাংলাদেশ থেকে এসে যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করে এবং তার পরিচিতি ছিল ভিন্ন ভিন্ন নামে। অবশেষে স্থায়ী হবার আশায় সে নূরজাহানের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই সেই সম্পর্কে আগুন লেগে যায়। সে ছিল অত্যন্ত সন্দেহপ্রবণ প্রকৃতির একজন ব্যক্তি। লন্ডনে স্থায়ী হওয়ার জন্য সে নূরজাহান খাতুনের ওপর প্রতিনিয়ত চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। সে প্রায়ই মারধোর করতো এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতো। এক পর্যায়ে নূরজাহান সেপারেশনের চিন্তা করেন এবং শেষ পর্যন্ত আলাদা হয়ে যান।

নূরজাহান তার কন্যা সুজানাকে নিয়ে কলম্বিয়া রোডের সিভিল হাউসের ১৯ তলার ৭৪ নং ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। তবে জিতু মিয়ার কাছে ফ্ল্যাটটির একটি চাবি ছিল। সে মাঝে মাঝে এই ফ্ল্যাটে এসে নূরজাহানের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতো। এটা পরিবারের সবার জানা ছিল বলে নূরজাহানের পাঁচ ভাইয়ের কেউ না কেউ এসে নূরজাহান ও তার কন্যার সঙ্গে উক্ত ফ্ল্যাটে থাকতেন।
মাঝে মাঝেই সিভিল হাউসে দেখা যেত সেই মানুষটিকে—একবার দরজায় ধাক্কা, একবার চিৎকার, কখনো কাকুতি। প্রতিবেশীরা জানতেন না বিস্তারিত, কেবল দেখেছিলেন ভয়ার্ত চোখে দরজা বন্ধ করে দেন নূরজাহান।
৪ সেপ্টেম্বর ২০০২, অর্থাৎ ঘটনার আগের দিন জিতু মিয়া এসে নূরজাহানের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ শুরু করলে নূরজাহান তার বাবার বাসায় ফোন করে কাউকে না পেয়ে তার এক খালাকে ফোন করে ঘটনাটি জানালে খালা নূরজাহানের ভাই আব্দুল বায়েসকে ঘটনাটি জানান এবং বায়েস সঙ্গে সঙ্গে নূরজাহানের ফ্ল্যাটে গিয়ে হাজির হন।
ফ্ল্যাটে গিয়ে নূরজাহানের হাতে রক্ত ঝরতে দেখেন এবং হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা করিয়ে আনেন। পুলিশকে ঘটনাটি জানালে পুলিশ জিতু মিয়ার কাছ থেকে চাবি উদ্ধার এবং নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
৫ সেপ্টেম্বর ২০০২ বৃহস্পতিবার রাতে নূরজাহানের আরেক ভাই, কামাল উদ্দিন যিনি শারিরীক প্রতিবন্ধী, তার সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু রাত সাড়ে আটটার দিকে জিতু মিয়া আবার আসে। ইন্টারকমে পাশের ফ্ল্যাটের কাঠ মিস্ত্রি রডনি ড্যাভিলকে দরজা খোলার অনুরোধ করে, কিন্তু তিনি রডনি দরজা খুলতে অস্বীকার করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুনতে পান হৃদয়বিদারক চিৎকার।
তিনি দৌড়ে বেরিয়ে পাশের কর্নারে গিয়ে দেখেন খোলা দরজার ভেতরে এক নারীর মৃতদেহ। নৃশংসতা দেখে তার পা কাঁপতে থাকে। গলা কাটা, হাত কাটা, পা ছড়িয়ে—এক বিভৎস দৃশ্য। পাশে পড়ে আছে ছোট্ট ফাহমিদা—রক্তাক্ত, নিথর। পাশে কামাল উদ্দিন, যিনি হয়ত রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পারেননি। তিনিই পুলিশে খবর দেন।
রাত ৯টার দিকে পুলিশ এসে দেখে, নূরজাহান(৩১) ও কামাল উদ্দিন(২৫) মারা গেছেন, আর ফাহমিদা(৪) তখনো নিঃশ্বাস নিচ্ছে। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানেই তার মৃত্যু ঘটে। নিহতদের দেশের বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলায়।
একই সময়ে, পুলিশ রক্তের দাগ অনুসরণ করে ভবনের ৮ম তলায় আহত অবস্থায় এক ব্যক্তিকে খুঁজে পায় এবং তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সামান্য সুস্থ হওয়ার পর জানা যায় যে, আহত ব্যক্তি নূরজাহান খাতুনের সেপারেটেড স্বামী জিতু মিয়া। পুলিশ তখন তাঁকে প্রাথমিকভাবে হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করে।
এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের নয়, গোটা পূর্ব লন্ডনের বাঙালি সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। একই ছাদের নিচে এক মা, এক শিশু, ও এক ভাই—তিনটি প্রাণ অকস্মাৎ নিভে যাওয়ার ঘটনা মানুষ সহজে ভুলতে পারেনি। নিষ্পাপ ফাহমিদার মৃত্যু, রক্তাক্ত মায়ের স্তব্ধতা, আর প্রতিবন্ধী ভাইয়ের আত্মত্যাগ—সব মিলিয়ে তা হয়ে দাঁড়ায় এক অভিবাসী জীবনের করুণ প্রতিচ্ছবি।
বিবিসি, গার্ডিয়ান ও ইভনিং স্ট্যান্ডার্ডসহ দেশের শীর্ষ সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনার বিশদ প্রচার করে।
পুলিশের তদন্ত শেষে জিতু মিয়া ওরফে বাদশা মিয়াকে ইনার লন্ডন ক্রাউন কোর্টে হাজির করা হয়। বিচার শুরু হলে, সে নিজের অপরাধ স্বীকার করে নেয়।
আদালত তাকে তিনটি পৃথক ‘লাইফ সেন্টেন্স’ বা আজীবন কারাদণ্ড প্রদান করে। বিচারক রায়ে বলেন—“এটি একটি ঠান্ডা মাথায়, পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—যেখানে একটি শিশুকেও রেহাই দেওয়া হয়নি।”
নূরজাহান খাতুন, ফাহমিদা আহমেদ, এবং কামাল উদ্দিন—তিনটি নাম, একটি পরিবার, একটি ইতিহাস। তাদের মৃত্যু শুধু একখণ্ড সংবাদ নয়, এটি একটি অভিবাসী বাস্তবতা—যেখানে স্বপ্ন আসে স্যুটকেসে, আর অনেক সময় ফিরে যায় কাফনের কাপড়ে।









