সম্পাদকের পাতা

গাড়ি ইন্স্যুরেন্সের ছায়ায় ছলচাতুরি

নজরুল মিন্টো

১৮৯৭ সালে বৃটেনের লিভারপুলে সূচনা হয়েছিল গাড়ি ইন্স্যুরেন্সের। দুর্ঘটনার ক্ষতি লাঘব করার মানবিক প্রয়াস হিসেবে এর যাত্রা শুরু। তখন এর উদ্দেশ্য ছিল দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতি থেকে চালক ও যাত্রীদের সুরক্ষা দেওয়া। আজকের দিনে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, এমনকি বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও গাড়ি চালাতে চাইলে ইন্স্যুরেন্স বাধ্যতামূলক। গাড়ি ইন্স্যুরেন্স কেবল দুর্ঘটনা-পরবর্তী আর্থিক প্রতিকার নয়, বরং এটি চালকের সামাজিক দায়িত্ববোধ ও নাগরিক আস্থার প্রতীক।

কিন্তু যেখানে নীতির জন্ম, সেখানেই অসাধুরাও জন্ম নেয়। সুবিধাভোগের পথ থেকে কখনো কখনো মানুষ সুবিধালোভের পথে চলে যায়। কিছু মানুষ ইন্স্যুরেন্স ব্যবস্থাকে নগদ অর্থ আয়ের কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছে। এই প্রতারণার ছায়া শুধু কানাডার সীমান্তে আটকে নেই। আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এই নকশা—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় একই ধরনের কৌশল পুনঃপ্রয়োগ হচ্ছে। প্রতিটি ক্লেইম যেন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা একই চিত্রনাট্যের পুনরাবৃত্তি।

আইবিসি (Insurance Bureau of Canada) অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কানাডার ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো শুধু অটো ফ্রডের কারণেই ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে প্রায় $২.৩ বিলিয়ন ডলার। তার মধ্যে বাংলাদেশি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি ড্রাইভারদের সম্পৃক্ততা লক্ষ্য করা গেছে ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে, বিশেষ করে টরন্টো, ব্রাম্পটন ও মন্ট্রিয়লে।

প্রতারণার ধরনগুলোও বেশ অভিনব ও কৌশলনির্ভর। একই গাড়ির VIN নম্বর ব্যবহার করে একাধিক ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে ভিন্ন ভিন্ন ক্লেইম, একাধিক ব্যক্তিকে ভুয়া যাত্রী হিসেবে দেখিয়ে ইনজুরি ক্লেইম, এমনকি MRI রিপোর্টে নাম বদল করে একাধিক রোগীর ফাইল তৈরি—এসবই এখন বাস্তবতা। তবে একজন চালক একা এই অপরাধে জড়িত নন; তাকে ঘিরে থাকে ফেক ক্লিনিক, অসাধু আইনজীবী, ছদ্মবেশী মেডিকেল বিশেষজ্ঞ এবং রিক্রুটারদের গোপন নেটওয়ার্ক। এইসব বিষয় বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন, মিডিয়ার অনুসন্ধান ও আইনি প্রক্রিয়ার নির্ভরযোগ্য নথিপত্রে।

‘‘ব্রেক ট্যাপিং’’—এ এক পরিচিত প্রতারণার কৌশল। সামনের গাড়িটি হঠাৎ করেই ব্রেক চাপে, একেবারে ইচ্ছাকৃতভাবে। পিছনের গাড়ি ধাক্কা দেয়, তারপর শুরু হয় নাটক—কারো “গলা মোচড়ে গেছে,” কারো “ঘাড় আর পিঠে জ্বালা ধরেছে,” কারো “ডান হাতটা ঠিকঠাক নড়ছে না!” প্রত্যেকে যেন চিকিৎসা নাটকের এক একটি সাজানো চরিত্র।

এরপর অ্যাম্বুলেন্স আসে, আইনজীবী আসে, ইনস্যুরেন্স ক্লেইম জমা পড়ে। কিছুদিনের মধ্যেই ফিজিওথেরাপি বিল, মনোরোগ চিকিৎসার খরচ, কর্মক্ষমতা হারানোর ক্ষতিপূরণ—সব মিলিয়ে লাখ লাখ ডলারের একটি ‘পেইন অ্যান্ড সাফারিং’ প্যাকেজ তৈরি হয়।

আরো ভয়ংকর রূপ নেয় যখন এটি হয়ে ওঠে “স্টেজড কলিশন”—অর্থাৎ পূর্বপরিকল্পিত সংঘর্ষ। এতে জড়ায় তিন-চারটি গাড়ি। কেউ সামনে ব্রেক চাপে, কেউ পাশ দিয়ে কাটিয়ে যায়, আর কেউ ‘নিরীহ পথচারী’ সেজে সাক্ষী হয়। পুরো ঘটনাটি এমনভাবে সাজানো হয়, যেন মনে হয় রাস্তায় এক রক্তাক্ত দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু বাস্তবে, এটি এক সংঘবদ্ধ প্রতারণা নাটক—যার উদ্দেশ্য একটাই: ইনস্যুরেন্স কোম্পানির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়।

কিছু বিশেষ গ্রুপ ট্যাক্সি বা Uber চালকদের টার্গেট করে, কারণ তাদের বীমা কভারেজ বেশি। একাধিক ড্রাইভার ও যাত্রীর মাধ্যমে করা হয় মাল্টিপল ক্লেইম। কখনও দেখা যায় এক গাড়ির ভিডিও ফুটেজ পাঁচটি ভিন্ন দুর্ঘটনার প্রমাণ হিসেবে দাখিল হয়েছে!

এই অপরাধ শুধু দুর্ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে একটি গোছানো নেটওয়ার্ক। ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে নতুন সদস্য খোঁজা হয়, মূলত আর্থিক সংকটে থাকা নতুন ইমিগ্র্যান্টদের। তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, কোথায় কীভাবে গাড়ি ধাক্কা দিতে হবে, কবে কী বলবে, কোথায় যাবে চিকিৎসা নিতে। কিছু নির্দিষ্ট ফিজিওথেরাপি ক্লিনিক বারবার ব্যবহৃত হয়। পুলিশি তদন্তে দেখা গেছে, এক ক্লিনিক এক মাসে ১৭টি ইনজুরি রিপোর্ট দিয়েছে!

একটি সফল ভুয়া ক্লেইমের টাকাও বণ্টন করা হয় নিয়ম মেনে। উদাহরণস্বরূপ: $২০,০০০-এর একটি ক্লেইমে ড্রাইভার পায় $৫,০০০, অর্গানাইজার $১০,০০০ এবং ক্লিনিক বা আইনজীবী $৫,০০০।

তবে প্রযুক্তি এখন প্রতারণার জাল ছিঁড়ে ফেলছে। AI, ব্ল্যাকবক্স ডেটা ও GPS অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে বহু ক্লেইম আগেই সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। একটি আলোচিত ঘটনায় দেখা যায়, এক চালক ডিপফেইক কণ্ঠ ব্যবহার করে ফোনে ক্লেইম পাস করাতে গিয়েছিলেন—AI কণ্ঠ বিশ্লেষণ করে তা শনাক্ত করে এবং মামলার সূত্র তৈরি হয়।

মন্ট্রিয়লের ২০২৪ সালের একটি আলোচিত কেস—”দ্য ভ্যানিশিং গাড়ি” স্ক্যাম। একটি গ্যাং একই গাড়িকে তিনটি ভিন্ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে ইনসিওর করে, তারপর নদীতে ফেলে দেয়। তারা আলাদা তিনটি দাবি করে: ইন্টাক্ট ইন্স্যুরেন্সে চুরি (২৫,০০০ ডলার), TD ইন্স্যুরেন্সে আগুনে ক্ষতি (১৮,০০০ ডলার), স্থানীয় কোম্পানিতে সংঘর্ষে ধ্বংস (২০,০০০ ডলার)।

ধরা পড়ার কারণ হলো- গাড়ির VIN নম্বর তিনটিতেই এক, AI সিস্টেম অ্যালার্ট দেয়, নদী থেকে উদ্ধার করা গাড়ির ইঞ্জিন নম্বর মিল খায়! জহির উদ্দিন (৩২) নামের মূল অপরাধী পায় ৪ বছরের জেল এবং $৩০০,০০০ ডলার জরিমানা।

Canadian Life and Health Insurance Association (CLHIA) জানিয়েছে—ফিজিও ক্লিনিক ভিত্তিক প্রতারণায় প্রতি বছর $৬০০ মিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে।

২০২৩ সালে টরন্টোর একটি ফিজিও ক্লিনিক ২৮৮টি ভুয়া ইনজুরি রিপোর্ট তৈরি করে। প্রতি রোগীকে $৫০০ নগদ দিলে তারা সাইন করে দিত। একই MRI রিপোর্ট ব্যবহার হয়েছে ১৭ জনের জন্য—শুধু নাম পাল্টে। এক রোগীর অডিও রেকর্ডিং ও পুলিশের হস্তক্ষেপে ক্লিনিকের কম্পিউটার থেকে টেমপ্লেট রিপোর্টের আস্ত ফোল্ডার উদ্ধার হয়। ড. আব্দুর রহমানের লাইসেন্স বাতিল হয় ও তিনি ৫ বছরের জেল পান।

২০২৩ সালে ব্রাম্পটনের এক বাংলাদেশি গ্যাং ১৪টি স্টেজড দুর্ঘটনা ঘটায়, মোট ক্লেইম $৫২০,০০০। ধরা পড়ে যখন একই ড্যাশক্যাম ফুটেজ ভিন্ন ক্লেইমে ব্যবহৃত হয়। দুইজনের ১৮ মাসের জেল হয়েছে, বাকিরা জরিমানা গুনেছে।

২০২৪ সালে টরন্টোতে এক সংঘবদ্ধ গ্যাং রেন্টাল গাড়ি নিয়ে ৪২টি দুর্ঘটনা ঘটায়। এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৪ বছর জেল ও $২১০,০০০ জরিমানা হয়। বাকি সদস্যদের ডিপোর্টেশনের মুখোমুখি হতে হয়।

মন্ট্রিয়লে Diamond Cab-এর ১২ জন ড্রাইভার GPS ও মেডিকেল রিপোর্টে ধরা পড়ে। প্রধান অভিযুক্ত আরিফুর রহমানকে $৪২০,০০০ জরিমানা ও ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

গাড়ি ইন্স্যুরেন্স প্রতারণার ইতিহাসে এক আলোচিত অধ্যায় হয়ে আছে টরন্টো পুলিশের ২০১৯ সালের “Project Side Swipe”। এটি ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং গভীর পর্যবেক্ষণভিত্তিক অভিযান, যার মাধ্যমে উন্মোচিত হয় একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র—যারা স্টেজড কলিশন, ভুয়া ইনজুরি, জাল চিকিৎসা রিপোর্ট ও ইনস্যুরেন্স ক্লেইম এর মাধ্যমে বহু বছর ধরে বিশাল অর্থ আত্মসাৎ করে আসছিল।

তদন্তে ধরা পড়ে, এই চক্রটির কেন্দ্রে ছিলেন মূলত বাংলাদেশি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত একাধিক অভিবাসী। গ্রেফতারকৃত ৩৪ জনের মধ্যে ২১ জনই দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী, যাদের অনেকে নতুন ইমিগ্র্যান্ট, কেউ কেউ স্বনামধন্য ব্যবসায়ী বা আইন সহায়তাদানকারী সংস্থার সাথে যুক্ত।

পুলিশের মতে, এই চক্রটি একটি গোছানো “ক্রিমিনাল ইকোসিস্টেম” গড়ে তোলে, যার মাধ্যমে কয়েক বছরে মিলিয়ন ডলার মূল্যের ইনস্যুরেন্স প্রতারণা সংঘটিত হয়।

এই প্রতারণার শিকার কেবল গাড়িচালক নয়, পুরো সমাজ। প্রতিটি ভুয়া ক্লেইমের বোঝা গিয়ে পড়ে সৎ ও নিরীহ নাগরিকদের কাঁধে। বাড়তে থাকে ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম, সংকুচিত হয় আস্থা। বিশেষ করে টরন্টো ও ভ্যাঙ্কুভারের দক্ষিণ এশীয় ড্রাইভারদের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও প্রকট—যেখানে ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি শুধু বাজারের নিয়ম নয়—বরং সংঘবদ্ধ প্রতারণার সরাসরি পরিণতি। একটি গোষ্ঠীর লোভ, পুরো সম্প্রদায়ের জন্য হয়ে উঠছে অবিচারের কারণ।

এক গবেষণায় দেখা গেছে ৬৫% ফ্রডস্টার মনে করে, “বড় কোম্পানিকে একটু ঠকালে ক্ষতি নেই।” ২৫% বলে, “ঋণ শোধের জন্য করেছি।” ১০% এই ফ্রডকেই পেশা হিসেবে নিয়েছে। এই মনোভাবই তৈরি করেছে সামাজিক দুর্বলতা, যেখানে লোভ আর অজ্ঞতার মাঝে হারিয়ে গেছে নৈতিকতা।

সরকার বিবেচনা করছে একটি জাতীয় “ফাইন্যান্সিয়াল ব্ল্যাকলিস্ট” তৈরির, যেখানে ফ্রড কনভিক্টদের নাম থাকবে। কানাডার Criminal Code Section 380 অনুযায়ী $৫,০০০-এর বেশি ফ্রডে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের জেল হতে পারে। ইন্স্যুরেন্স অ্যাক্ট লঙ্ঘনে $৫০,০০০+ জরিমানা। আরও ভয়ংকর দিক হলো, ফ্রড প্রমাণ হলে অভিবাসনের স্থায়িত্ব বাতিল হয়ে যেতে পারে। PR বাতিল, সিটিজেনশিপ বাতিল এবং ডিপোর্টেশনের ঘটনা ঘটেছে একাধিকবার। কানাডিয়ান অ্যান্টি-ফ্রড সেন্টারের ভাষায়: “ইন্স্যুরেন্স ফ্রড একটি ফেডারেল অপরাধ। একটি ক্লেইম আপনার সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে পারে।”

এই প্রতিবেদন শুধু অপরাধের খতিয়ান নয়, এক ধরনের সতর্কবার্তা। প্রযুক্তি এখন শুধু তদন্তকারী নয়, বরং সমাজে সততার রক্ষাকবচ হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে। একজন সৎ ড্রাইভার, একজন সচেতন অভিবাসী যেন এই অন্ধকার চক্রের হাত থেকে মুক্ত থাকে, সে জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তি, সচেতনতা ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ।

তথ্যসূত্র:
Insurance Bureau of Canada (২০২৩ বার্ষিক প্রতিবেদন)
Royal Canadian Mounted Police (অটো ফ্রড ইউনিট)
Ontario Ministry of Finance (ইন্স্যুরেন্স রেগুলেশন)
Canadian Anti-Fraud Centre (২০২৪ পরিসংখ্যান)
মন্ট্রিয়ল গ্যাজেটে প্রকাশিত “The Vanishing Car Scam” কেস (২০২৪)


Back to top button
🌐 Read in Your Language