সম্পাদকের পাতা

উত্তর আমেরিকায় হালাল লেবেলের আড়ালে প্রতারণা

নজরুল মিন্টো

ইসলামী শরিয়তের আলোকে ‘হালাল’ শব্দের অর্থ—যা বৈধ, যা শুদ্ধ, যা নির্ভরযোগ্য। শুধু খাবার নয়, হালাল মানে হলো—জীবনের প্রতিটি কোণে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা এক জীবন্ত প্রতিজ্ঞা। মুসলিমদের জন্য হালাল পণ্য গ্রহণ একটি ধর্মীয় দায়িত্ব, একটি আত্মিক নিরাপত্তা। কিন্তু বর্তমান বাজারে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার দক্ষিণ এশিয় দোকানগুলোতে “হালাল” লেবেলটি যেন এক বাণিজ্যিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে—যার আড়ালে চলছে প্রতারণা, জালিয়াতি, এমনকি জনস্বাস্থ্য বিপন্ন হওয়ার মতো কাজ।

একটা সময় ছিল যখন ‘হালাল’ মানেই ছিল প্রশান্তি—পবিত্রতার গন্ধে মোড়া এক খাদ্য সংস্কৃতি। আজ উত্তর আমেরিকার শহরগুলোয়—টরন্টো থেকে শুরু করে শিকাগোর ডিভন অ্যাভিনিউ, নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস, কিংবা মন্ট্রিয়লের পার্ক অ্যাভিনিউ—এই শব্দটাই হয়ে উঠেছে চোরাবালির মতো। হালাল ট্যাগ আজ আর কেবল একটি ধর্মীয় নির্দেশনা নয়, বরং হয়ে উঠেছে এক বাণিজ্যিক ‘ব্র্যান্ড’, যেখানে নৈতিকতা গলেছে লাভের চুলায়।

২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী হালাল বাজারের আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ২.৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি শুধু একটি ধর্মীয় পরিভাষা নয়, বরং একটি বিশ্বব্যাপী মাল্টি-ট্রিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রি—যা খাদ্য, কসমেটিকস, ওষুধ, ফ্যাশন এবং লজিস্টিকস পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বিশাল বাজারে একদিকে যেমন তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ, অন্যদিকে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে বাণিজ্যিক ফাঁদে পরিণত করেছে।

গ্রাহকেরা সাধারণত হালাল স্টিকার দেখেই পণ্যে ভরসা রাখেন। অনেকেই উপাদানের তালিকা পড়েন না, মেয়াদোত্তীর্ণ কিনা তা খেয়াল করেন না, কিংবা সার্টিফিকেশন যাচাইয়ের প্রয়োজন বোধ করেন না—তাদের বিশ্বাসের মূলভিত্তি হয় ‘হালাল’ শব্দটির প্রতি এক গভীর আস্থা। আর এই সরল বিশ্বাসকেই অস্ত্র করে তুলেছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। এ প্রতারণা চক্রে শুধু বাংলাদেশি বা পাকিস্তানিরাই নয়—ভারত, শ্রীলঙ্কার কিছু দুর্বৃত্তও জড়িত, যারা বছরের পর বছর ধরে ধর্মীয় আস্থাকে পুঁজি করে চালিয়ে যাচ্ছে নিষ্ঠুর ছলনা।

কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে হালাল লেবেল জালিয়াতি এখন এমন এক বাস্তবতা, যা রীতিমতো সংগঠিত অপরাধের রূপ নিয়েছে। শহরভেদে প্রতারণার ধরন আলাদা—কখনো ভুয়া সার্টিফিকেট, কখনো মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য। কেউ ধরা পড়ে—জরিমানা হয়, দোকান সাময়িক বন্ধ থাকে, তদন্ত রিপোর্ট জমা পড়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টেবিলে। কিন্তু সেসব ঘটনা সাধারণ মানুষের দৃষ্টির আড়ালেই থেকে যায়। গ্রাহকের সামনে প্রকাশ পায় না কার দোকান সিলগালা হলো, কে কী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলো। আর এই তথ্য-অভাবই পরবর্তীতে সেই একই প্রতারণাকে নতুন মোড়কে ফিরে আসতে সাহায্য করে। সাজা হয়, কিন্তু অপরাধ রোধ হয় না।

উত্তর আমেরিকার লাখো মুসলিম পরিবার বছরের পর বছর বিশ্বাস করে আসছেন—দোকানের রঙিন প্যাকেট, আরবি হরফে লেখা ‘হালাল’, মসজিদের পাশে ঝুলে থাকা “Zabiha Certified” বোর্ড, কিংবা ওয়েবসাইটে ঝাপসা এক সিল—এসবই যথেষ্ট নিশ্চয়তা। অনেকে মনে করেন, দোকানদার যেহেতু মুসলিম, সুতরাং বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। কিন্তু আজ এই সহজ-সরল বিশ্বাসই সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তায় রূপ নিচ্ছে। কারণ প্রতারণা এখন আসছে ধর্মের মুখোশ পরে, মুনাফার লোভে বিশ্বাসকে পণ্য বানিয়ে।

নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস—একটি ছোট্ট ভূখণ্ড, যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ অভিবাসী জনগোষ্ঠীর হৃদস্পন্দন ছড়িয়ে আছে প্রতিটি গলিতে। দক্ষিণ এশিয়ার অভিবাসীরা এই অঞ্চলকে বানিয়ে তুলেছে একটি নিজস্ব গ্রহ—যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম সব একসূত্রে গাঁথা। সেই জ্যাকসন হাইটসের প্রাণকেন্দ্রে ছিল একটি বাংলাদেশি গ্রোসারি দোকান, যার দরজায় ‘Hand Slaughtered Halal’ লেখা বড় স্টিকার। যার ‘হালাল’ ট্যাগ ছিল অভিবাসী মুসলমানদের জন্য শুধু একটি লেবেল নয়, বরং ঈমানদীপ্ত এক আশ্বাস।

২০২৫ সালের মার্চ মাসে, নিউইয়র্ক সিটি হেলথ ডিপার্টমেন্ট ও Consumer Affairs and Business Integrity (DCWP) যৌথ অভিযান চালায়। অনুসন্ধানে দেখা যায়—দোকানটি বছরের পর বছর ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ মাংস নতুন তারিখের জাল স্টিকার লাগিয়ে বিক্রি করছিল, এমনকি কিছু পণ্যের উৎসেই হালাল সার্টিফিকেট ছিল না। “Halal Certified” স্ট্যাম্প বসানো হচ্ছিল এক গ্যারেজ ঘরে বসে, প্রিন্টার দিয়ে বানানো স্টিকারে।

ফলস্বরূপ, NYC Health Department $১২৫,০০০ ডলার জরিমানা করে। ভোক্তা প্রতারণা ও জনস্বাস্থ্য লঙ্ঘনের দায়ে দোকানটির লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত ও তিন মাসের জন্য দোকানটি বন্ধ করে দেয়া হয়। জাল স্টিকার ব্যবহারের দায়ে পৃথকভাবে Civil Penalty আরোপ করা হয় আরও $৩০,০০০ ডলার।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—এই পুরো ঘটনাটি দোকানের গ্লাসের বাইরে কখনোই লেখা হয়নি। গ্রাহকদের বলা হয়, “রিনোভেশনের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ”।

টরন্টোর পূর্ব প্রান্তে একটি বহুল পরিচিত বাংলাদেশি গ্রোসারি—বাইরে ঝকঝকে সাইনবোর্ড, জানালায় ঝোলানো সবুজ ‘হালাল’ লোগো, আর কাঁচের ভেতর থরে থরে সাজানো নানান ব্র্যান্ডের পণ্য। সপ্তাহান্তে এই দোকানে ভিড় করে বাঙালি অভিবাসীরা, কেউ আসেন মসজিদ থেকে ফেরার পথে, কেউ আসেন সস্ত্রীক সাপ্তাহিক বাজারে। তারা বিশ্বাস করেন—এই দোকান ‘নিজেদের মানুষে’র, তাই এখানে ধর্ম ও বিশ্বাসে কোনো ভেজাল থাকবে না।

কিন্তু কানাডিয়ান ফুড ইন্সপেকশন এজেন্সির (CFIA) এক অঘোষিত পরিদর্শনে বেরিয়ে আসে এক ভয়াবহ প্রতারণার চিত্র।

এই দোকানে ভুয়া হালাল সার্টিফিকেট ব্যবহার করা হচ্ছিল দীর্ঘদিন ধরে। শুধু তাই নয়—মেয়াদোত্তীর্ণ মাংস ও খাদ্যপণ্যে নতুন করে হালাল স্টিকার লাগিয়ে বিক্রির মতো চাঞ্চল্যকর অনিয়ম ধরা পড়ে। বেশ কিছু নিম্নমানের পণ্য ছিল অপরিষ্কার, দুর্গন্ধযুক্ত ও অস্বাস্থ্যকর। প্যাকেটের-এর ভেতরে পচা মাছ ও ছাঁচ ধরা মিষ্টি পর্যন্ত পাওয়া যায়।

এছাড়া বাংলাদেশি কিছু পণ্যে বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন-এর অনুমোদন ছাড়া জাল ‘হালাল’ লোগো ব্যবহার করা হয়েছিল। কিছু মাছের গায়ে বাংলায় লেবেল লাগানো ছিল, যেগুলো মায়ানমার থেকে আমদানীকৃত। পণ্যের গায়ে বাংলা ভাষা, দেশি পরিচিতি এবং ধর্মীয় চিহ্ন ব্যবহার করে ভোক্তাদের আবেগকে বাণিজ্যিক অস্ত্রে পরিণত করা হচ্ছিল।

শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসই নয়, গ্রাহকের অর্থনৈতিক বুদ্ধিকেও কৌশলে হুমকি দেওয়া হতো—দোকানদারেরা বলতেন, “ক্যাশ দিলে ট্যাক্স লাগবে না”, অথচ মূলত তা ছিল সরকারি ট্যাক্স ফাঁকির কৌশল। কাউন্টারে দামও ঠিক রাখা হতো না—প্রদর্শিত দামের চেয়ে পণ্যের দাম বেশি রাখা, এবং গ্রাহকের অজান্তে অতিরিক্ত আইটেম যুক্ত করে বিল বৃদ্ধি করতেও দেখা গেছে। এইসব প্রতারণার বেশ কয়েকটি ছবি এবং অভিযোগ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত CFIA ও কানাডা রেভিনিউ এজেন্সির (CRA) যৌথ তদন্তে সকল অভিযোগের সত্যতা মেলে। প্রতিষ্ঠানটিকে $৭৫,০০০ ডলার জরিমানা করা হয়, এবং লাইসেন্স পুনর্মূল্যায়নের আওতায় নেওয়া হয় পরবর্তী সময়ের জন্য।

অন্টারিও, কানাডার ব্রাম্পটনের একটি ব্যস্ত দক্ষিণ এশীয় গ্রোসারি দোকানে যখন CFIA (Canadian Food Inspection Agency) হঠাৎ অভিযান চালায়, তখন বেরিয়ে আসে—তারা টানা তিন বছর ধরে জাল হালাল সার্টিফিকেট ব্যবহার করছে। অথচ সেই দোকানের দরজার সামনে শুক্রবারের জুমা নামাজ শেষে সারি সারি মানুষ ঢুকে যেতো; শিশুদের হাত ধরে নিয়ে আসা মায়েরা যাঁরা বিশ্বাস করতেন—এই দোকানের প্রতিটি প্যাকেটে আছে তাদের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা, নিরাপত্তা আর আস্থার সিলমোহর। ফলস্বরূপ, দোকানটিকে ৯০,০০০ কানাডিয়ান ডলার জরিমানা করা হয় এবং এক বছরের জন্য লাইসেন্স স্থগিত করা হয়।

মন্ট্রিয়লের এক আরব অধ্যুষিত এলাকায়—যেখানে রাতের বেলায় কুরআনের তিলাওয়াত ভেসে আসে হাওয়ায়, আর দোকানের জানালায় শোভা পায় ইসলামি ক্যালিগ্রাফি—সেখানেই এক নামকরা হালাল কসমেটিকসের দোকানে ধরা পড়ে ভয়াবহ প্রতারণা। মুখে মেখেছেন ক্রিম, ঠোঁটে তুলেছেন লিপস্টিক, নিশ্চিন্ত মনে—এই বিশ্বাসে যে ‘হালাল’ মানে পবিত্রতা। অথচ পরে জানা গেছে, সেসব পণ্যের উৎস শরিয়তবিরোধী—জীবজন্তুর উৎস থেকে নেওয়া হারাম গ্লিসারিন, অ্যালকোহল-ভিত্তিক সলভেন্ট এবং অপ্রকাশিত উপাদান।

তদন্তে কানাডার Health Canada এবং Quebec Halal Authority (QHA) যৌথভাবে প্রমাণ করে, কোম্পানিটি কোনো বৈধ তৃতীয় পক্ষের হালাল সার্টিফিকেশন না নিয়েই পণ্যে “100% Halal Certified” ছাপিয়ে বিক্রি করছিল।

ফলস্বরূপ, $৩২০,০০০ ডলার জরিমানা আরোপ করা হয় এবং ৫৬টি পণ্য জাতীয়ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। দোকানটির লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয় এবং প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করে দেওয়া হয়।

ভ্যাঙ্কুভার—ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার উপকূলঘেরা সেই শহর, যেখানে সবুজ পাহাড় আর সুশৃঙ্খল নগরজীবনের মাঝেও মুসলিম সম্প্রদায়ের উপস্থিতি এক শৃঙ্খলিত আত্মপরিচয়ের নাম। প্রার্থনা, পরিবার আর পরিশ্রম—এই তিনের ওপর দাঁড়িয়ে যাদের জীবন, সেই সমাজেও যখন হালাল শব্দের পবিত্রতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন আঘাত লাগে মূলত বিশ্বাসে।

সাম্প্রতিক এক অভিযানে বেরিয়ে আসে—ভ্যাঙ্কুভারের তিনটি বড় দক্ষিণ এশীয় সুপারমার্কেট টানা তিন বছর ধরে ভুয়া হালাল সার্টিফিকেট ব্যবহার করে চলছিল। দোকানের শেলফে ঝলমলে হরফে লেখা ‘100% Halal’, অথচ এর পেছনে ছিল না কোনো বৈধ শরিয়াহ নিরীক্ষা, ছিল না কোনো তৃতীয় পক্ষের অনুমোদন। শুধু তা-ই নয়, কানাডিয়ান রেভিনিউ এজেন্সি (CRA)-এর তদন্তে দেখা যায়, দোকানগুলো ট্যাক্স ফ্রড ও সার্টিফিকেশন ফি এভয়ডেন্স-এও জড়িত ছিল—যেখানে সরকার অনুমোদিত কোনো লেনদেনের রেকর্ডই ছিল না।

ফলস্বরূপ, তিনটি সুপারমার্কেটকে সম্মিলিতভাবে $১.৮ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়। দুটি প্রতিষ্ঠানের বিজনেস লাইসেন্স এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট মালিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বিজ্ঞাপনের আইনে ফৌজদারি তদন্ত শুরু হয়।

শিকাগোর মুসলিম অধ্যুষিত ডিভন স্ট্রিট—যা একসময় “Mini Pakistan” কিংবা “South Asian Market” নামে পরিচিত ছিল— সেখানে ১২টি হালাল ফুড ট্রাকের একসাথে প্রতারণায় জড়িত থাকার ঘটনা যেন পুরো কমিউনিটির মুখে এক তীব্র অস্বস্তির ছাপ ফেলে।

২০২৪ সালের মাঝামাঝি, শিকাগো হালাল কনজিউমার রিভিউ প্যানেল ও Illinois Attorney General’s Office যৌথ তদন্তে জানতে পারে, এই ট্রাকগুলোর সবাই একই অবৈধ ও অ-হালাল সরবরাহকারী থেকে মাংস সংগ্রহ করছে। মাংসে ছিল না জবাইয়ের শরিয়াহ অনুমোদন, না ছিল তৃতীয় পক্ষের কোনো অডিট বা যাচাই সনদ। অথচ প্রতিটি ট্রাকেই লাগানো ছিল বড় বড় “Zabiha Halal Certified” সাইনবোর্ড।

তদন্তে উঠে আসে আরও ভয়ংকর তথ্য—মাংসগুলো আসছিল এমন একটি প্রসেসিং ইউনিট থেকে, যেটি পূর্বে খাদ্য নিরাপত্তা লঙ্ঘনের দায়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

ফলস্বরূপ: Illinois Attorney General এই ১২টি ফুড ট্রাক মালিকের বিরুদ্ধে ভোক্তা প্রতারণা, জালিয়াতি ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের দায়ে মামলা দায়ের করে। ৫ জন ফুড ট্রাক অপারেটরের ব্যবসার লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়। সম্মিলিতভাবে আরোপ করা হয় $২.৩ মিলিয়ন ডলার জরিমানা।

শিকাগো শহর চালু করে “Real Halal Truck ID Program”, যেখানে প্রত্যেক বৈধ ফুড ট্রাককে একটি কিউআর কোড ও অনলাইন ট্রেসিং আইডি যুক্ত করতে হয়।

মিশিগানের ডিয়ারবর্ন—যে শহরটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আরব মুসলিম জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল, যেখানে প্রতিটি গলিতে আরবি ভাষার সাইনবোর্ড, মসজিদের মিনারে প্রতিফলিত সূর্য, আর রমজানের রাতে আলোকিত রেস্টুরেন্টে জেগে থাকে উৎসব। এমন এক শহরে, যেখানে ‘হালাল’ শব্দটি শুধু ধর্ম নয়—সম্মান, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অংশ—সেখানেই এক বিখ্যাত “হালাল ফাইন ডাইনিং” রেস্টুরেন্টে ধরা পড়ে অবিশ্বাসের কাহিনি।

রেস্টুরেন্টটি পরিচিত ছিল ‘শরিয়াহ কমপ্লায়েন্ট কুইজিন’ নামে। ভিআইপি অতিথি থেকে শুরু করে ইসলামী সম্মেলনের আয়োজকগণ পর্যন্ত এখানে ভরসার সঙ্গে খেতেন। একদিন, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ছাঁটাই হওয়া এক মুসলিম শেফ গোপন তথ্য প্রকাশ করেন—এই রেস্টুরেন্টে ‘হালাল’ ট্যাগ থাকা সত্ত্বেও, তারা কোনো তৃতীয় পক্ষের হালাল সার্টিফিকেশন রাখে না, এবং সরবরাহকারীদের উৎসও কখনো যাচাই করে না।

Michigan Department of Agriculture and Rural Development (MDARD) ও USDA তদন্ত চালায়, এবং প্রমাণ মেলে—তারা গত চার বছর ধরে সার্টিফিকেশনবিহীনভাবে হালাল দাবি করে আসছে, এবং বহু ইভেন্টে ‘Islamic Catering’ নামেও খাবার সরবরাহ করেছে।

ফলস্বরূপ: $৭৫০,০০০ ডলার জরিমানা আরোপ করা হয় ধর্মীয় বিশ্বাসের নামে প্রতারণা ও ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনের দায়ে রেস্টুরেন্টের ব্যবসা লাইসেন্স ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করা হয়। রেস্টুরেন্টের ওয়েবসাইট, মেনু ও সোশ্যাল মিডিয়া থেকে “Halal” শব্দ সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয় FTC।

আজকের এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের লক্ষ্য একটিই—জেগে ওঠা। এ লেখাটি নিউইয়র্কবাসীর জন্য, টরন্টোর জনগণের জন্য, শিকাগো-ভ্যাঙ্কুভার-মন্ট্রিয়লের সেই ভাই-বোনদের জন্য—যারা প্রতিদিন বিশ্বাসের সঙ্গে বাজার করেন, অথচ জানেন না সেই বাজার কতখানি ভেজাল, কতখানি ভুয়া।

এইসব শহরে, প্রতিটি ঘটনায় উঠে এসেছে এক করুণ বাস্তবতা—ভোক্তা যেমন সহজ-সরল, তেমনি ব্যবসায়ীরা চতুর-ধূর্ত। হালাল প্রতারণা শুধু একটি আইন লঙ্ঘনের বিষয় নয়—এটি একটি ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা, মুসলিম ভোক্তার ঈমানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। প্রযুক্তি ও আইনের সমন্বয়ে এ চক্রান্ত রোধ করা সম্ভব, তবে সবচেয়ে বড় শক্তি—সচেতনতা।

তিনটি সহজ অভ্যাসে শুরু হোক এক সচেতন বিপ্লব—
১। প্রতিটি ‘হালাল’ পণ্যের QR কোড ও লোগো যাচাই করুন।
২। উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ খুঁটিয়ে দেখুন।
৩। মূল সার্টিফিকেট দেখুন—ফটোকপি নয়।

শুধু নিজে জানলেই হবে না—জানিয়ে দিন অন্যকেও। এই প্রতিবেদনটি শেয়ার করুন, ছড়িয়ে দিন সতর্কতার আলো—ভুল ভরসার অন্ধকার ভাঙার এটাই সময়।

দ্রষ্টব্য:
এই প্রতিবেদনের প্রতিটি ঘটনা, বর্ণনা ও পর্যালোচনা বাস্তবতার নির্যাস থেকে সংগৃহীত—সরকারি এজেন্সির তদন্ত প্রতিবেদন, গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা, এবং প্রকাশ্য তথ্যসূত্রের উপর ভিত্তি করে এটি রচিত হয়েছে। তবে বৃহত্তর স্বার্থে—বিশেষ করে দেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে কারণে ইচ্ছাকৃতভাবে এই প্রতিবেদনে কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম, ছবি, ঠিকানা বা ব্যবসার বিবরণ সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।

তবে এটুকু দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দিচ্ছি—যদি কোনো প্রতিষ্ঠান সৎ ও স্বচ্ছ ব্যবসা না করে—তাহলে আমরা ভবিষ্যতে সেই প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির নাম, পরিচয়, কার্যকলাপ, ছবি ও প্রমাণসহ জনসমক্ষে প্রকাশ করব।


Back to top button
🌐 Read in Your Language