
নামের মাঝে কী লুকিয়ে আছে? কেউ বলে, এক জীবনের গল্প; কেউবা ভাবে, ভাগ্যের পরিহাস। কারও কাছে নাম মানে প্রার্থনা, আবার কারও কাছে সেটি এক নিছক পরিচয়ের ভার। নাম নিয়ে মানুষের চিন্তার কমতি নেই—অর্থহীন থেকে অর্থপূর্ণ, সহজ থেকে কঠিন, সুন্দর থেকে হাস্যকর—সবই চলে এই নামের জগতে। এমনই অদ্ভুত নাম-দুনিয়ায় আজ গল্পের সাগরে পাল তুলে দিয়েছি। হ্যাঁ, আজকের গল্পের বিষয়—‘বাঙালির নামনামান্তর’।
নাম নিয়ে বাঙালিরা যেন এক চিরকালীন আত্ম-সংশয়ে ভোগে—নিজস্বতা আর বাহ্যিকতার মাঝে এক দ্বন্দ্বে। তবে ৭০ এর দশকে সুন্দর সুন্দর বাংলা নাম রাখা শুরু হয়। জাতীয়তাবাদের চেতনায় উদ্ভুদ্ধ হয়ে ঐ সময় বিশুদ্ধ বাংলা নাম রাখার প্রচলন ঘটে। বিজয়, স্বাধীন, আকাশ, সাগর, রাত্রি, নদী, বর্ষা, শিশির, পলাশ, শিমুল ইত্যাদি ঐ সময়ের নাম।
আশির দশক থেকে শুরু হলো ‘আল’, ‘বিন’, ‘ইবনে’ আর ‘বিনতে’র যুগ। আল ফারুক, ওমর বিন শামস, ফাতেমা বিনতে… ইত্যাদি।
এখন আবার ধারা পাল্টেছে; এসেছে সুন্দর সুন্দর বাংলা নাম। অনন্যা, অনিন্দিতা, অনির্বাণ, তন্ময়, চৈতি.. ইত্যাদি। এসব নাম দেখেই বুঝা যায় এরা একুশ শতকের প্রজন্ম।
বাঙালি হিন্দুরা পৌরাণিক যুগেই ভাল ছিলেন। একক নাম ছিল। অর্থাৎ নামের আগে পিছে কিছু ছিল না। রাম, লক্ষণ, সীতা, কর্ণ, যুধিষ্ঠির, দুর্যোধন বড় উদাহরণ। কলিযুগে এসে নামের বাহার দিতে গিয়ে এখন সামলানো কষ্টকর হয়ে গেছে। শ্রী মহেশ কুমার ভট্টাচার্য্য। ১ বছর বয়সেও কুমার, ৮০ বছর বয়সেও।
নিজের ‘শ্রী’ যাই থাক নামের আগে ‘শ্রী’ লিখে দিতে দ্বিধা করেন না অনেকে। শ্রীমতি প্রতিমা রানী দাস, কোন দেশের রানী বুঝানোর দরকার নেই। এক বাড়িতে কয়েক গন্ডা রানীর বাস!
বাঙালি খৃষ্টানরাতো পশ্চিমা নাম না রাখলে খৃষ্টান বলে ভাবতেই পারেন না। এড্রিয়ান সুভাষ গোমেজ (ইংরেজি, বাংলা পর্তুগিজ), তৃষা এঞ্জেলা রোজারিও। নামের মধ্যে যেন পশ্চিমা ছায়া বা রেশ থাকতেই হবে—এই ধারণা অনেকের মধ্যে গভীরভাবে গেঁথে আছে। উল্লেখ্য, বাঙালি খৃষ্টানদের বেশিরভাগই পর্তুগিজ পদবী ব্যবহার করেন।
বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে অনেকে মনে করেন, আরবী নাম রাখা আবশ্যক। অর্থবহ হোক বা না হোক, আরবী নাম চাই (আমাদের কাছে যেটা ইসলামী বলে পরিচিত)। একটা কথা আমরা ভুলে গেছি যে, ইসলাম আসার আগেও আবদুল্লাহ, ঈসা, মুসা, ইব্রাহীম, জুলেখা, জয়নব ইত্যাদি নামগুলো ছিল। নামের ব্যাপারে আরবীরা ধর্মকে না টেনে তার গোত্র, ঐতিহ্য বা তার সংস্কৃতিকেই বেশি প্রাধান্য দেয়।
হলিউডের বিখ্যাত চিত্রতারকা ওমর শরীফের নাম কমবেশী সবাই জানেন। তিনি ছিলেন একজন মিশরীয় খৃষ্টান। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী তারিক আজিজ ছিলেন একজন আরবী খৃষ্টান। ফিলিস্তিনের নেত্রী হান্নান আশরাভিও ছিলেন একজন ফিলিস্তিনি খৃষ্টান।
এক সিরিয়ান লোকের সাথে আমার দশ বছর ধরে পরিচয়। তার নাম ‘মিলাদ’। একবার সে আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে একটি ক্রিসমাস কার্ড উপহার দিল। আর তখনই জানতে পারলাম ‘মিলাদ’ একজন খৃষ্টান।
খালেদ, তারেক, ইব্রাহীম, দাউদ, নাসের এগুলো ধর্ম-জাতি নির্বিশেষে সকল আরবীরাই রাখে। কে যে মুসলমান, আর কে যে খৃষ্টান বা ইহুদী বুঝা মুশকিল। এগুলো সেমেটিক জাতির ঐতিহ্যবাহী নাম। স্থান ভেদে আবার অনেক নামের বানান ও উচ্চারণ পরিবর্তন হয়ে অন্যরকম হয়ে গেছে।
আমাদের কাছে যিনি ইব্রাহিম, ইংরেজদের কাছে তিনি আব্রাহাম; একইভাবে ইসহাক হয়েছেন আইজ্যাক, দাউদ হয়েছেন ডেভিড, জিব্রাইল হয়েছেন গাব্রেইল ইত্যাদি।
আমাদের দেশে একসময় সন্তানদের উপর যেন দুষ্টুগ্রহের কু-নজর না পড়ে সেজন্য অদ্ভুত অদ্ভুত নাম রাখা হতো। যেগুলো অত্যন্ত হাস্যকর। যেমন, ঝাড়ু মিয়া, মুগুর আলি, পঁচা বেগম ইত্যাদি। এছাড়া কিছু অর্থহীন নামও চোখে পড়ে। হানিফা বলে কোন সন্তান নেই অথচ নাম তার আবু হানিফা। বিয়েই করেনি অথচ মুসার বাপ হয়ে গেছে। অর্থাৎ আবু মুসা। আবু ওসমান, আবু রুশদ ধরনের প্রচুর নাম প্রায়ই দেখা যায়। ছইয়ারা (গাড়ি), ছফিনা (জাহাজ) এ ধরনের নাম কেবল বাংলাদেশেই রাখা হয়।
মাঝে মধ্যে কিছু নাম দেখে স্তম্বিত হয়ে যাই। ঢাকার এক সরকারী কর্মকর্তার নাম দেখলাম ফানা ফিল্লাহ। এর কোন সরাসরি অর্থ নেই। এটি হলো সুফি দর্শনের একটি গভীর তাত্ত্বিক ধারণা।
নামের সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক আমি খুঁজে পাইনি। ইরানিরা ফার্সি ভাষাকে প্রাধান্য দিয়ে তাদের নামকরণ করে। যেমন, আজাদ, ফরহাদ, ফারাহ, ফরিদা, আফসান ইত্যাদি। তুরস্কের লোকেরা বিশুদ্ধ তুর্কি নামই রাখে। যেমন, কামাল, আদিল, মোস্তফা, ইসকান্দার, আজদা, লায়লা ইত্যাদি।
বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই। ঘরের কাছে ইন্দোনেশিয়ার নামগুলো দেখলেই বুঝা যায় যে, নামের ব্যাপারে সে দেশের মুসলমানদের মধ্যে কোন রক্ষণশীলতা নেই। সুহার্তো, সুকর্ণ এগুলো বিশুদ্ধ সংস্কৃত নাম। সুকর্ণের মেয়ের নাম মেঘাবতী। মেঘাবতীর মেয়ের নাম মহারানী নক্ষত্র। হ্যাঁ, তারা সকলেই মুসলমান।
নামের বিকৃতিতে আমরা ইতিহাস তৈরি করেছি। খালেদা খানম। অর্থ দাঁড়ালো খালেদা স্ত্রীলোক। ‘খালেদা’ নিজেই স্ত্রী লিঙ্গ। এটুকুই যথেষ্ট। খানম এখানে লাগাবার দরকার নেই। ফার্সি/তুর্কি ভাষায় মহিলাদেরকে খানম বা খাতুন বলা হয়ে থাকে। বেগম শব্দটিও স্ত্রীদের বেলায় প্রযোজ্য। নিজের স্ত্রীকে উর্দূভাষীরা বেগম বলে ডাকে, বিবিও ডাকে। আমরা সেটাও নামের আগে পিছে লাগিয়ে দিই। অর্থাৎ যাকে তাকে বিবি বা বেগম বলতে আমাদের কোন অসুবিধা হয় না। অথচ নামের সাথে পিতা বা স্বামীর নাম ও বংশের উপাধি থাকার কথা।
আরব ভূখন্ডে বা ইউরোপে নাম থাকে একটি। নামের সাথে পিতার নাম এবং পারিবারিক উপাধি বা দাদার নাম সংযুক্ত করা হয়। এটাই ষ্ট্যান্ডার্ড।
অবশ্য এরকম হলে আমাদের দেশে এক একটি নাম এক নিঃশ্বাসে পড়া কষ্টকর হয়ে যাবে। ছেলের নাম আবুল কালাম মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজী ওরফে নান্টু। বাবার নাম মোহাম্মদ আহমেদ উল্লাহ সওদাগর, দাদার নাম শেখ মোহাম্মদ ধনাই মিয়া। অর্থাৎ পুরোটা লাগালে কাগজের দুই মাথায় ধরবে কি না সন্দেহ! যদিও দক্ষিণ ভারতে এর চাইতেও দীর্ঘ নামের ট্র্যাডিশন আছে।
বিদেশে গেলে এসব নামের অধিকারিরা নানান সমস্যায় পড়েন। গত কয়েক দশক ধরে নাম নিয়ে বিদেশে গিয়ে সমস্যায় পড়েছেন অনেক বাংলাদেশী। মোহাম্মদ আর মোসাম্মৎ নিয়ে কোনদিন ঝামেলা হতে পারে কেউ কি কখনও চিন্তা করেছেন! কিন্তু ঝামেলা হয়েছে। আসল নাম হারিয়ে এগুলোই হয়ে গেছে এখন অনেকের ফাষ্ট নেম।
অনেকে ‘মোহাম্মদ’কে সংক্ষেপ করতে গিয়ে ‘এমডি’ লেখেন। এই ‘এমডি’ নিয়েও ইমিগ্রেশনের মোকাবেলা করতে হয়েছে বহু লোককে। বুঝাতে হয়েছে এটা মেডিকেল ডক্টর নয়; নামেরও কোন অংশ নয়, কেবলই একটি রীতি।
ইউরোপ আমেরিকায় অভিবাসী হয়ে অনেকে বাপ-দাদার দেয়া নামের খৎনা করিয়ে তবেই শান্তি লাভ করেছেন। মোহাম্মদ আবুল কালাম হয়েছেন- ম্যাক, জোৎস্না হয়েছেন- জেসি, এবাদউল্লাহ হয়েছেন- অ্যাবি, আনোয়ারা হয়েছেন- অ্যানি ইত্যাদি।
সেদিন আমার পরিচিত একজন জানালেন তার পরিবারে এক কন্য সন্তান আসছে। তবে নাম নিয়ে তাদের (স্বামী-স্ত্রী) মধ্যে ট্যাগ অব ওয়ার চলছে। তিনি চান একটি আধুনিক ইংরেজি নাম আর তার স্ত্রী চান বিশুদ্ধ একটি বাংলা নাম।
আমাকে বললেন এমন একটা নাম যদি দিতে পারি যেটাতে খৃষ্টান বুঝা যাবে না আবার আধুনিকও হবে। কোনো ভাবনা-চিন্তা না করেই বললাম- রেখে দেন ‘অ্যালেক্সা’। জিজ্ঞেস করলেন এর অর্থ কি? আমি বললাম এর কোন অর্থ নেই এটা একটা প্রযুক্তি শব্দ। খৃষ্টানও না, ইহুদিও না।
চিন্তা করছি আগামী দিনের অর্থাৎ হাইটেক জেনারেশনের সন্তানাদির নাম কি কি রাখা যেতে পারে এ বিষয়ে কিছু পরামর্শ দিয়ে রাখি। যেমন ছেলেদের নাম রাখা যেতে পারে ‘গুগল’, ‘ইয়াহু’, ‘ভাইবার’, ‘টুইটার’, ‘রাউটার’, ‘অ্যামাজন’, ‘অ্যান্ড্রয়েড’, ‘ইউএসবি’, হ্যাসট্যাগ; আর মেয়েদের নাম রাখা যেতে পারে ‘মজিলা’, ‘ইমো’, ‘সাফারি’, ‘উইকি’, ‘কিন্ডেল’, ‘বাইনারি’ ইত্যাদি। বাদ বাকি পছন্দ সন্তানের পিতা-মাতার।
অনেকে মনে করতে পারেন আমি বোধহয় মজা করছি। না, মোটেও না। আমাদের দেশে অনেক নাম আছে যাদের নিয়ে কেউ কখনও কিছু বলতে শুনিনি। যেমন বুলেট, পাইলট, প্রিন্স, কুইন, টাইগার, এমনকি হিটলার নামের মানুষও আছে। আগামী প্রজন্মের নাম টেকি অর্থাৎ প্রযুক্তি পণ্যের নামানুসারেই যে হবে এটা আমি নিশ্চিত।
সবশেষে নাম বিষয়ক একটি গল্প।
হারিছ মিয়া সৌদি আরব গমন করলেন। ঢাকা এয়ারপোর্টে কোন অসুবিধা হলো না। পাসপোর্ট-ভিসা সবই ঠিক আছে। ঝামেলাটা বেধে গেলো রিয়াদ এয়ারপোর্টে। ইমিগ্রেশন অফিসার বারবার জিজ্ঞেস করছে তোমার নাম কি?
– হারিছ মিয়া।
অফিসার আবার জিজ্ঞেস করলো: তোমার নাম কি?
একই উত্তর: হারিছ মিয়া।
নবীন অফিসার জীবনে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হননি কোনদিন। ‘হারিছ’ কোন লোকের নাম হতে পারে তা তার ধারণার বাইরে। আরবীতে ‘হারিছ’ অর্থ দারোয়ান এবং মিয়া অর্থ এক’শ। অর্থাৎ এক’শ নম্বর দারোয়ান। সিনিয়র কয়েকজন অফিসারও জড়ো হয়েছেন।
দোভাষীর মাধ্যমে যাত্রীকে আবার প্রশ্ন করা হলো- এ নাম তোমাকে কে রেখে দিয়েছে?
হারিছ বললো- আমার বাবা।
তোমার বাবার নাম কি?
-তরিক মিয়া।
আরবীতে ‘তরিক’ অর্থ রাস্তা। নবীন অফিসার আরও আশ্চর্য হয়ে তার সিনিওরদের মুখের দিকে তাকালো।
নামের এই মজার খেলায় আমরা বাঙালিরা কখনোই পিছিয়ে থাকিনি। যুক্তির চেয়ে আবেগ বেশি, ভাবের চেয়ে বাহার বেশি, এমনই আমাদের নামের সমাচার। প্রযুক্তির যুগেও যদি একদিন আপনার পাশের বাড়ির ছেলে হয়ে ওঠে “গুগল মিয়া” বা মেয়েটির নাম রাখা হয় “সাফারি বেগম” বা ”মজিলা কুমারি” অবাক হবেন না মোটেও।









