
নভেম্বরের শেষভাগে ইউরোপের আকাশে নেমে আসে এক ধূসর বিষণ্ণতা। সূর্য যেন অনেক তাড়াতাড়ি তার রোদ গুটিয়ে নেয়, আর আকাশের ক্যানভাস জুড়ে খেলা করে ভারী সীসার মতো মেঘ। এমন দিনে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস আরও নির্জন মনে হয়—যেন এক শিল্পীর আঁকা শহর, যেখানে ছায়া আর আলো পাশাপাশি বসবাস করে।
ব্রাসেলস শুধু ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রশাসনিক কেন্দ্র নয়, এটি অভিবাসী মানুষের শহরও। এখানকার অলিগলিতে ভেসে আসে নানা ভাষার সুর—ফরাসি, ডাচ, আরবির সঙ্গে মিশে যায় বাংলা। শহরের পশ্চিমাঞ্চল—এটারবিক, মোলেনবিক কিংবা আন্দারলেখট—এ যেন আরেকটি ছোট বাংলাদেশ।
এই শহরের বাংলাদেশি কমিউনিটি বেশ পুরোনো। কেউ কেউ এসেছেন আশির দশকে, কেউবা নব্বইয়ের দশকে। আজকের প্রজন্ম কাজ করে কুরিয়ার সার্ভিসে, রেস্টুরেন্টে, হেলথ কেয়ার সেক্টরে। তাদের জীবনে স্বপ্ন যেমন আছে, তেমনি আছে বিসর্জনের ইতিহাস—নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলার বেদনা।
এ রকমই এক জীবনের নাম নিগার সুলতানা। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার নিভৃত গ্রাম থেকে উঠে আসা এই নারী, স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন ব্রাসেলসে। নিগারের জীবনের বাঁকগুলো ছিল প্রতিটি নারীর মতোই কঠিন অথচ সহনীয়। তিনিও এই শহরের হাজারো বাঙালি নারীর মতোই নিঃশব্দে দিন কেটেছেন, সংসার গড়েছেন, সন্তান লালন করেছেন, অপমান গিলে চুপ থেকেছেন।
কিন্তু তার জীবনে একদিন নেমে আসে এমন এক মুহূর্ত, যা কেবল শরীর নয়, সময়কেও পোড়াতে শুরু করে। তার নিজের ঘরে, নিজের স্বামী অ্যাসিড ছুঁড়ে মারে তার দেহে, মুখে, ভবিষ্যতের স্বপ্নে। এক লহমায় নিগারের চেনা পৃথিবী বদলে যায়।
এই গল্প কেবল নিগারের একার নয়। এই গল্প—ইউরোপের বুকে হতাশা আর যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকা শত শত নারীর, যারা একটুখানি সম্মান আর নিরাপত্তার আশায় দেশ ছেড়েছিলেন, অথচ প্রবাসে এসে বন্দি হয়েছেন আরেক অদৃশ্য নিপীড়নে। এটি সেই গল্প, যা মুখ খুলতে শেখায়, প্রতিবাদে দাঁড়াতে শেখায়, জ্বলন্ত বিষের মুখেও কীভাবে একজন নারী নিজেকে জাগিয়ে তুলতে পারেন—তা দেখিয়ে দেয়।
নিগার এইচএসসি পাস করার পর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমান। ভর্তি হন একটি স্বনামধন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। লেখাপড়ার পাশাপাশি কর্মজীবন শুরু করেন একটি বায়িং হাউসে। মেধা, আন্তরিকতা আর পরিশ্রমে খুব দ্রুতই সহকর্মীদের ভালোবাসা ও আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন তিনি। সেই কর্মস্থলেই একসময় পরিচয় হয় বেলজিয়াম প্রবাসী এক যুবক, আব্দুর রহমানের সঙ্গে। ধীরে ধীরে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তা পরিণতি পায় বিয়েতে। ২০১৫ সালে নিগার পাড়ি জমান ব্রাসেলসের পথে—এক নতুন জীবনের সূচনায়।
নতুন দেশে নিগারের জীবনের সূচনা হয়েছিল রঙিন স্বপ্নে ঘেরা এক আশায়। রহমান তখন ব্রাসেলসের একটি রেস্টুরেন্টে সেফ হিসেবে কাজ করতেন, আর নিগার শুরু করেন একজন কেয়ার ওয়ার্কারের চাকরি। কর্মব্যস্ততার মাঝেও তারা গড়ে তোলেন একটি শান্তিপূর্ণ সংসার। ব্রাসেলসের এটারবিক এলাকায় একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন তারা। সময়ের পরিক্রমায় একে একে তাদের ঘর আলোকিত করে দুই সন্তানের আগমন।
কিন্তু সেই স্বপ্নের ঘরে প্রতিদিনই যেন জমতে থাকে এক অজানা বিষ। স্বামী আব্দুর রহমান ধীরে ধীরে পরিণত হন এক অত্যাচারী মানুষে। নিগারের মেসেঞ্জার চেক করা, বাজারের খরচ হিসাব করে প্রতি সেন্টের কৈফিয়ত চাওয়া, নানান অজুহাতে গায়ে হাত তোলা—এসব যেন নিয়মে পরিণত হয়। শুরু হয় মানসিক নিপীড়ন।
এক পর্যায়ে ২০২২ সালে নিগার স্থানীয় একটি নারী সহায়তা সংগঠনের শরণাপন্ন হন। কিন্তু সন্তানদের কথা ভেবে তখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি।
সেদিন সন্ধ্যা নেমে এসেছিল স্বাভাবিকের মতোই। নিগার রান্নাঘরে রাতের খাবার বানাচ্ছিলেন, পাশের রুমে টেলিভিশনে চলছিল কোনো একটি কার্টুন। হঠাৎ পেছন থেকে আসে স্বামীর গর্জন- “তুই যদি তালাকের মামলা তুলে না নিস, আজ তোর মুখটাই থাকবে না।”
নিগার ঘুরে দাঁড়ানোর সাথে সাথেই রহমান এক মগ গরম তরল ছুড়ে মারেন নিগারের মুখে, বুকে, হাতে। প্রথমে তিনি ভাবেন, গরম পানি। কিন্তু মুহূর্তেই ত্বক ঝলসে যেতে থাকে। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে, চিৎকার করতে থাকেন —পোড়া গন্ধ, কান্না, রক্ত, ব্যথা সব একত্র হয়ে যেন এক বিভীষিকায় রূপ নেয়। প্রতিবেশীরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে, কেউ পুলিশে ফোন করে, কেউ তাকে কম্বলে জড়িয়ে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
সেন্ট লুক হাসপাতালে নিগার ভর্তি হন। শরীরের ৭০ শতাংশ পোড়া, মুখমণ্ডলের ত্বক গলে গেছে, চোখে অ্যাসিড ঢুকে গেছে। ডাক্তাররা জানান, তার ডান চোখের দৃষ্টি প্রায় সম্পূর্ণই হারিয়ে গেছে। পরবর্তী ছয় মাসে তিনটি প্লাস্টিক সার্জারি করতে হয় তাকে। হাসপাতালের নির্জন কক্ষে নিগার শুয়ে থাকেন, বারবার তার সন্তানদের নাম ধরে ডাকেন।
রহমানকে সেদিন রাতেই গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনি দাবি করেন, এটি “দুর্ঘটনা”। কিন্তু নিগারের বয়ান, প্রতিবেশীদের সাক্ষ্য ও প্রমাণিত অ্যাসিডের সোর্স অনুযায়ী, আদালত সেটি খারিজ করে দেয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ: “ইচ্ছাকৃত গুরুতর শারীরিক ক্ষতি” ও “প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত হামলা”।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিচার কার্য শুরু হয়। আদালতে আব্দুর রহমানকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এর আগে নিগারের তালাক মঞ্জুর করে একটি জরুরি আদালত।
নিগার এখনও পুনর্বাসন কেন্দ্রে রয়েছেন, সপ্তাহে ৩ বার থেরাপি নেন। প্রতিদিন চামড়ার ব্যথা, চোখের জ্বালা, রাতে দুঃস্বপ্ন—এই তার রুটিন। কিন্তু তবুও, তার কণ্ঠে যে আত্মবিশ্বাস, সেটি শোনলে বোঝা যায়—তিনি থামেননি। বেলজিয়াম সরকার তাকে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি দিয়েছে এবং মাসিক ১,২০০ ইউরো সহায়তা দিচ্ছে।
সার্জারির শেষ পর্বে একদিন আয়নার সামনে দাঁড়ালেন নিগার। আয়নাটি হাসপাতালে রাখা, কোনো ফ্রেম নেই, শুধু একটা ঝাপসা কাঁচ। সে কাঁচে তিনি নিজেকে দেখেন—পোড়া মুখ, চোখের দৃষ্টিহীনতা, চামড়ার সেলাই, চুল উঠে গেছে একপাশে। কিন্তু ঠিক তখনই তার মনে হয়—এই মুখে একটা নতুন শক্তির রেখা দেখা যাচ্ছে। আগের মুখ ছিল পরাধীন, এ মুখ হলো প্রতিরোধের।
নিগারের গল্প শুধু একজন অ্যাসিড সারভাইভারের নয়—এটি সেই অগ্নিপরীক্ষার গল্প, যেখানে পোড়া ত্বকের নিচে জেগে ওঠে এক অদম্য আত্মা।









