
লন্ডনের পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত ইলফোর্ড—একটি জনপদ নয়, যেন বহুসংস্কৃতির এক জীবন্ত কোলাজ। এখানে দিনের শুরু হয় স্কুলবাসের ভেঁপু আর প্রাতঃভ্রমণকারীর পায়ের শব্দে, শেষ হয় ট্রেন লাইনের কাঁপুনি আর টেকওয়ে দোকানের ঝুলন্ত বাতিতে। একপাশে ভিক্টোরিয়ান টেরেস বাড়ি, অন্যপাশে আধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট। বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম এখানে গড়ে তুলেছে তাদের দ্বিতীয় বাসভূমি।
এই এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের জীবনে রয়েছে বহু না বলা গল্প। ছোট্ট দুই-তিন বেডরুমের বাড়িগুলোতে গড়ে ওঠা এই জীবনের ছায়ায় কখনো হাসি, কখনো কান্না লুকিয়ে থাকে। কেউ মিনিক্যাব চালান, কেউ রেস্টুরেন্টে কাজ করেন, কেউবা কাউন্সিল অফিসের ক্লার্ক। নারীরা মেডিকেল রিসেপশনিস্ট বা ক্লিনিং সার্ভিসে কাজ করে দিনের শেষে বাসায় ফিরে রান্না করেন, সন্তানদের পড়ান, আর রাতে টেলিভিশনে দেখেন ‘দেশের খবর’। এই জীবনেরই এক পাথুরে সন্ধ্যায়, হঠাৎ নেমে আসে রক্তাক্ত অন্ধকার। যেখানে নিভে গিয়েছিল এক তরুণীর জীবন, আর ছিঁড়ে গিয়েছিল একটি নিষ্পাপ শিশুর শৈশব।
২৭ এপ্রিল ২০১৮, স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৮টা ৩০। ইলফোর্ডের একটি দুইতলা বাড়ির নিচতলার ফ্ল্যাটে হঠাৎ শোনা যায় ভাঙা কাচের শব্দ, চিৎকার আর ছুটোছুটি। রান্নাঘরের দরজা বন্ধ—তার ওপাশে নাজমিন আক্তার নামের ২৫ বছর বয়সী এক নারী বাঁচার জন্য আকুতি জানাচ্ছেন, “আমি মরে যাচ্ছি, আমার বাচ্চাকে বাঁচাও।” রান্নাঘরের মেঝেতে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত, আর ছুরির একের পর এক আঘাতে নাজমিনের নিঃশ্বাস ফুরিয়ে আসছে।
হত্যাকারী ছিলেন তার স্বামী, মোহাম্মদ হোসেন—৪০ বছর বয়সী বাংলাদেশি অভিবাসী, যার হাতে তখন ছিল একটি বড় রান্নার ছুরি। তিনি সেই ছুরি দিয়ে ২২ বার নাজমিনকে আঘাত করেন, যার বেশিরভাগ আঘাত ছিল বুক ও পেট লক্ষ্য করে। পুরো ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করে তাদের মাত্র পাঁচ বছর বয়সী সন্তান, যিনি পরে বলেছিলেন, “আব্বু আম্মুকে কাটছিল, আমি লুকিয়ে পড়েছিলাম আলমারিতে।”
নাজমিন আক্তার ছিলেন যুক্তরাজ্যের নাগরিক। ১৯৯৩ সালে লন্ডনের এই শহরেই জন্ম। তার বাবা-মা বাংলাদেশের হবিগঞ্জ থেকে আসা অভিবাসী। বাবা রেস্টুরেন্টের কর্মী, মা গৃহিণী। লব্রোক প্রাইমারি আর ভ্যালেন্টাইনস হাই স্কুলের পর একটি ক্লিনিকে প্রশাসনিক সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন।
তার বিয়ে হয় ২০১২ সালে, মাত্র ১৯ বছর বয়সে, মোহাম্মদ হোসেন নামে এক অভিবাসীর সাথে। হোসেন স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাজ্যে এসে পরে একটি ভুয়া বিয়ের মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পান। পরে সেই ভূয়া স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তিনি নাজমিনকে বিয়ে করেন। তার আদি বাড়ি বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলায়।
হোসেন মিনিক্যাব ড্রাইভার এবং পরে ইলফোর্ডের একটি টেকওয়ে রেস্টুরেন্টে কিচেন হেল্পার হিসেবে কাজ করতেন। নিজেকে অতি ধার্মিক দাবি করলেও আদালতের মনোবিজ্ঞানীরা তাকে “নিয়ন্ত্রণকারী ও নার্সিসিস্টিক” বলে চিহ্নিত করেন। আদালত-নিযুক্ত মনোবিজ্ঞানীর প্রতিবেদনে বলা হয়, হোসেন নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে ভুগছিলেন। তার মধ্যে ছিল অতিরিক্ত আত্মম্ভরিতা, নারীদেরকে সম্পত্তি হিসেবে দেখার প্রবণতা এবং অনুশোচনার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি।
হোসেনের জীবনে ছিল তিনটি বড় ক্ষোভ—এক, নাজমিন ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী; দুই, নাজমিনের আয় তার চাইতে বেশি এবং তিন, নাজমিন তাকে ডিভোর্স দিতে চাইছিলেন। তার মনে হচ্ছিল, এই ডিভোর্স তার পুরুষত্বে আঘাত করছে। তাই সেই সন্ধ্যায় তিনি সবকিছু শেষ করে দেন। হত্যার পর পালিয়ে যান, কিন্তু পরদিন ধরা পড়েন।
২০২০ সালে লন্ডনের ওল্ড বেইলি আদালতে শুরু হয় বিচার। আদালতে উপস্থাপিত হয় রক্তের প্যাটার্ন, ছুরির ফিঙ্গারপ্রিন্ট, মোবাইলের ডেটা, শিশুর বর্ণনা। বিচারক নিকোলাস হিলার রায়ে বলেন, “এই হত্যাকাণ্ড ছিল নিষ্ঠুর, পূর্বপরিকল্পিত এবং একটি শিশুর সামনে সংঘটিত—যা তাকে আজীবন তাড়া করবে।”
হোসেনের অতীত সম্পর্কের ইতিহাসও ভালো ছিল না। নাজমিনের আগে আরও দু’জন নারীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল, যারা তাকে বর্ণনা করেছিলেন “অবসেসিভ কন্ট্রোল ফ্রিক” হিসেবে। আদালতে প্রমাণিত হয়, তার আগের বিয়ে ছিল কেবল ভিসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে—একটি ঠকবাজির মতো।
হোসেনকে দোষী সাব্যস্ত করে আজীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি হাই-সিকিউরিটি প্রিজন HMP Whitemoor-এ বন্দি।
নাজমিনের ছেলে এখন বাংলাদেশে, দাদির কাছে। তাকে মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ডাক্তাররা বলছেন, সে PTSD ও সিলেক্টিভ মিউটিজমে ভুগছে। তার মুখে এখনো মাঝে মাঝে ফিরে আসে সেই শব্দ: “আব্বু কাটছিল… আম্মু কাঁদছিল…”
এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সমাজকে নাড়া দিয়েছিল। ব্রিকলেনের বাংলাদেশি নারী ফোরাম মোমবাতি মিছিল করে, Southall Black Sisters সচেতনতা প্রচারণা চালায়। মিডিয়া– দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, ডেইলি মেইল ব্যাপকভাবে কভার করে।
নাজমিনের করুণ গল্প নাটক ও ডকুমেন্টারিতেও উঠে এসেছে। চ্যানেল এস নির্মাণ করে “নাজমিন: একটি অসমাপ্ত গল্প” (২০২১), যেখানে তার জীবনের বিভিন্ন পর্যায় তুলে ধরা হয়।









