ড. বিজয় দাস চলে গেছেন না ফেরার দেশে

ষাটের দশকের শুরুতে, কানাডায় পদচিহ্ন রাখতে শুরু করে বাংলাভাষী মানুষেরা। কেউ পড়তে, কেউ পড়াতে কিংবা কেউ পেশাজীবী হয়ে। কেউ বাংলাদেশ থেকে, কেউ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আবার কেউ কেউ ইউরোপের কোনো কোনো দেশ থেকে। তখনকার টরন্টো শহর ছিল অপেক্ষাকৃত শান্ত, ছিমছাম, জনসংখ্যায় ছিল তুলনামূলকভাবে ছোট—কিন্তু আশাবাদী, নবীন, এবং বহুজাতিক সমাজ গঠনের সূচনাপর্বে দাঁড়ানো।
বিশ্বদরবারে যে জাতি ভাষা, শিল্প, বিজ্ঞান ও সাহিত্যে শত শত বছর ধরে নিজের আলো জ্বালিয়ে এসেছে, তার প্রতিনিধিরা যখন কানাডা, আমেরিকা কিংবা বিশ্বের অন্য প্রান্তে পা রাখেন, তখন তারা শুধু অভিবাসী হয়ে আসেন না—তারা আসেন মেধা, মনন ও সংস্কৃতির দূত হয়ে। তুষারপতনের দেশ কানাডাতেও বাঙালি অভিবাসীরা ঘর-সংসারের ভিত শক্ত করার আগেই শুরু করেন বাংলা সংস্কৃতির চর্চা। আর তাদের হাত ধরেই নতুন প্রজন্ম প্রথম জানতে শেখে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, আর বাঙালির হাজার বছরের সৃষ্টিশীল ঐতিহ্য।
তখন প্রবাসে বাঙালি ছিলেন হাতে গোনা। কোথাও কোনো বাংলা ভাষার বই পাওয়া যেত না, ঢাকাই শাড়ি আনার জন্যে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হতো। বাংলা গান শুনতে হলে কারও বাড়ির ক্যাসেট প্লেয়ারের সামনে বসে থাকতে হতো নির্জনে। তবু এই মানুষগুলো হাল ছাড়েননি।
ঘরের বেসমেন্ট থেকে শুরু। বিভিন্ন উপলক্ষে ছোট ছোট অনুষ্ঠান, খাওয়াদাওয়া, গ্রীষ্মকালের পিকনিক, রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা—এসবই হয়ে উঠল প্রবাসী জীবনের ভরকেন্দ্র। সময়ের বিবর্তনে সেই বেসমেন্টভিত্তিক আয়োজনগুলো ধীরে ধীরে বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ল—স্কুলের অডিটোরিয়াম, চার্চের হলঘর, বড় বড় ব্যাঙ্কুয়েট হলে। ছোটদের হাতে তুলে দেওয়া হলো হাতের লেখা খাতায় বানানো বাংলা বর্ণমালা। শুরু হলো বাংলা স্কুল।
এই ‘গোড়াপত্তন’-এর সময়ে, যাঁরা প্রথম প্রবাসী সমাজ গঠনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, যাঁরা এই শহরে বাংলার আলো জ্বালিয়েছিলেন—তাঁদেরই একজন ড. বিজয় শংকর দাস। সজ্জন, আলাপচারী, আপাদমস্তক একজন খাঁটি বাঙালি।
গত ৭ জুন ২০২৫ তারিখে, মিসিসাগার ক্রেডিট ভ্যালি হাসপাতালে বর্ষীয়ান সমাজসেবক, শিক্ষাবিদ ও সংগঠক ড. বিজয় শংকর দাস শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই পুত্র, পুত্রবধূ এবং নাতি-নাতনিকে রেখে গেছেন।
ড. বিজয় দাসের প্রয়াণে প্রবাসী বাঙালি সমাজে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর বিদায় শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোক নয়, বরং পুরো কমিউনিটির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
ড. বিজয় শংকর দাসের শেকড় বাংলাদেশে। ১৯৩৫ সালে তিনি ফরিদপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হেমচন্দ্র দাস ছিলেন ওখানকার একটি স্কুলের প্রিন্সিপাল। বিজয় দাস ছিলেন একজন আদর্শ পরিবারপ্রেমী মানুষ। ১৯৬৪ সালে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। স্ত্রী ছন্দা দাস ছিলেন তাঁর জীবনের দীর্ঘসঙ্গী ও অনুপ্রেরণা। দুই পুত্র, অপ্রতিম ও সুপ্রতীক তাঁর গর্ব। পরিবারে তিনি ছিলেন এক অটুট বন্ধনের প্রতীক—প্রেম, ধৈর্য আর প্রজ্ঞার মূর্ত প্রতীক।
ড. বিজয় দাস ছিলেন গ্রেটার টরন্টো এলাকায় বসবাসরত বাঙালি অভিবাসী সমাজের এক অগ্রদূত। তিনি দীর্ঘদিন PBCA (প্রবাসী বাঙালি কালচারাল এসোসিয়েশন)-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ২০১৩ সালে পেয়েছেন সংগঠনের লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড। টরন্টোতে অনুষ্ঠিত NABC (North American Bengali Conference)-এর চেয়ারপারসন হিসেবে তাঁর নেতৃত্ব ছিল স্মরণীয়। তিনি সেই সম্মেলনকেও জীবন্ত করে তুলেছিলেন তাঁর প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও সাংস্কৃতিক অনুরাগ দিয়ে। NABC কর্তৃপক্ষও তাঁকে আজীবনের অবদানের জন্য বিশেষ সম্মানে ভূষিত করে।
ড. বিজয় দাস ১৯৬১ সালে কানাডায় আসেন। এখানে এসে তিনি ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োগ রসায়নে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি তাঁর পেশাগত জীবনে ছিলেন এক নিখাদ গবেষক। তাঁর গবেষণা মনস্কতা, বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি ও একাডেমিক উৎকর্ষতা তাঁকে তাঁর সহকর্মীদের মাঝে আলাদা মর্যাদায় স্থান দিয়েছিল। জীবনভর তিনি গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থেকে বৈজ্ঞানিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
ড. বিজয় দাস ছিলেন এমন একজন মানুষ যাঁর উপস্থিতি ছিল নিঃশব্দ কিন্তু গভীর, যাঁর নেতৃত্ব ছিল স্থির কিন্তু দৃঢ়, এবং যাঁর মন ছিল উদার কিন্তু শৃঙ্খলাবদ্ধ। তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে শিখিয়েছেন কিভাবে প্রবাসে থেকেও শেকড়ের টান বজায় রাখা যায়, কিভাবে সংস্কৃতি ও সমাজের মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি করা যায়।
ড. বিজয় শংকর দাসের প্রয়াণে আমরা হারালাম এক আলোকিত মানুষকে—যিনি ছিলেন প্রিয়জন, পথপ্রদর্শক এবং সমাজের বাতিঘর। তাঁর অসামান্য অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী এবং বৃহত্তর কমিউনিটির হৃদয়ে।









