সম্পাদকের পাতা

ল্যান্ডলর্ড যখন হয় শিকারি

নজরুল মিন্টো

ছবিটি কল্পিত

টরন্টোর লরেন্স অ্যাভিনিউর ধারে পুরোনো একটি সেমি-ডিটাচড বাড়ি। সামনের উঠোনে জমে থাকা শীতল পাতার ওপর পায়ের চাপ পড়লেই শব্দ হয়—যেন কানাডার নীরবতা ভাঙার সতর্কতা। বেসমেন্টের জানালার ধারে জমে থাকা বরফের আস্তরণ রিফাতের স্বপ্নের মতোই অস্পষ্ট। টরন্টোর কঠিন শীতে এখানে রোদের আলো গা গরম করে না, বরং এই উঠোনের নিস্তব্ধতা আরও ঠান্ডা করে তোলে ভাড়াটিয়ার মন। এই বাড়ির বেসমেন্টে বাস করতেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী রিফাত (ছদ্মনাম), যার জীবনের ছন্দ ছিঁড়ে যায় ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে।

রিফাত ছিলেন সেনেকা কলেজের শিক্ষার্থী। বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার আশায় আসা, সাথে স্বপ্ন ছিল নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। কিন্তু কানাডার ব্যয়বহুল জীবনে, সীমিত আয় আর বৈধ কাজের সুযোগের সংকীর্ণতায়, অনেক আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীদের মতো তাকেও ঠাঁই নিতে হয়েছিল কোনো বেসমেন্টে।

এই বাড়ির মালিক ছিলেন শফিকুল ইসলাম (ছদ্মনাম), ৫৩ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি অভিবাসী, যিনি ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে কানাডায় বসবাস করছেন। কমিউনিটির কারো কারো মতে, তিনি “ভদ্র” মানুষ, স্থানীয় মসজিদ কমিটিতেও যুক্ত। কিন্তু অনেকেই জানতেন না এই ভদ্রতার আবরণে লুকিয়ে থাকা অন্য এক শফিকুলকে।

২০২২ সালের নভেম্বর মাসে রিফাত এই বাড়ির বেসমেন্টে ওঠেন। মৌখিক চুক্তিতে বাসা ভাড়া নেন—কোনো লিখিত কাগজপত্র নেই, ভাড়াও নগদে দিতেন। প্রথম দুই মাস সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও, জানুয়ারি থেকে শুরু হয় অশুভ ইঙ্গিত।

শফিকুল প্রথমে কথায় কথায় রিফাতকে বাংলাদেশি মেয়েদের চরিত্র নিয়ে অদ্ভুত প্রশ্ন করতে শুরু করেন। হঠাৎ হঠাৎ হাত ছুঁয়ে দেওয়া, রান্নার ঘরে এসে দাঁড়িয়ে থাকা, অপ্রয়োজনীয় আলাপ চালিয়ে যাওয়া। এসবের প্রতিবাদ করলে হাসি ঠাট্টায় উড়িয়ে দিতেন, বলতেন—”তুমি খুব সেন্সেটিভ।”

মার্চ মাসে তিনি সরাসরি প্রস্তাব দেন, “তুমি যদি আমার সঙ্গে একবার সময় কাটাও, আমি তোমার ছয় মাসের ভাড়া মাফ করে দেবো। কেউ জানতেও পারবে না।”

ভয়ে ভীত রিফা প্রাথমিকভাবে মৌন ছিলেন। কিন্তু কয়েকদিন পর যখন শফিকুল মধ্যরাতে দরজায় এসে দাঁড়ান এবং হুমকি দিয়ে বলেন, “আমি চাইলে তোমার স্টুডেন্ট ভিসা বাতিল করিয়ে দিতে পারি,” তখন বুঝলেন—এখন সময় পাল্টা পদক্ষেপ নেয়ার।

রিফাত শুরু করলেন গোপন রেকর্ডিং। তার iPhone 13-এ অটো রেকর্ডিং চালু রাখতেন, আর বাড়ির ডোরবেল ক্যামেরাও সাহায্য করত। প্রমাণ হিসেবে ছিল ৪৭ মিনিটের অডিও, ২টি ভিডিও এবং ১৫৮টি টেক্সট মেসেজ—যেখানে ল্যান্ডলর্ড কখনো বলেন, “তুমি কি virgin? আমি test করতে চাই।” আবার কখনো বলেন, “তুমি আমার বন্ধু হলে আমি তোমার পার্মানেন্ট ভিসার জন্য স্পনসর করতে পারি।”

১৫ মে ২০২৩, রিফাত পুলিশে অভিযোগ করেন। ডিটেকটিভ সার্জেন্ট এমিলি চেন কেসটি হ্যান্ডেল করেন। পরদিন ভোরে, পুলিশ শফিকুলের মিডল্যান্ড অ্যাভিনিউর বাড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করে।

ফরেনসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শফিকুলের মোবাইলে “Rifat basement” নামে একটি ফোল্ডার রয়েছে, যেখানে রিফাতের অনুমতি ছাড়া তোলা ১৮টি ছবি সংরক্ষিত ছিল। গুগল ম্যাপের লোকেশন হিস্টরি বলে দেয়, তিনি রাতবিরেতে বারবার বেসমেন্টের দরজার বাইরে ঘোরাঘুরি করতেন।

বর্তমানে রিফাত Walmart-এর চাকরি ছেড়ে এখন একটি নারী নির্যাতন প্রতিরোধকেন্দ্রে কাউন্সেলর হিসেবে কাজ করছেন। ইতিমধ্যে তিনি VPU ভিসা পেয়েছেন এবং PR-এর জন্য আবেদন চলছে।

অন্যদিকে শফিকুল জামিনে মুক্ত হলেও বাধ্যতামূলক তাকে ইলেকট্রনিক মনিটরিং ব্রেসলেট পরতে হচ্ছে। তার পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে (কানাডা ছাড়তে পারবেন না)। কমিউনিটির চোখেও এখন তিনি একজন কলঙ্কিত মানুষ। তার Uber লাইসেন্স বাতিল হয়েছে। সর্বশেষ, তার স্ত্রী ডিভোর্স ফাইল করেছেন, সন্তানরা স্কুলে বুলিং-এর শিকার হচ্ছে দেখে এখন তারা অন্যত্র বাসা নিয়ে চলে গেছেন।

এই মামলা এখনও চলমান। যদি শফিকুল দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে এবং সেক্স অফেন্ডার হিসেবে তার নাম কানাডার জাতীয় রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত হবে।

এই ঘটনাটি শুধুমাত্র এক নারীর নয়, বরং হাজারো বাংলাদেশি অভিবাসী ছাত্রছাত্রী ও ব্যাচেলর নারীদের জীবনের প্রতিচ্ছবি। ভাড়া বাড়ানো, নিরাপত্তাহীনতা, মৌখিক চুক্তি, জুলুম, হুমকি, প্রলোভন—সবকিছু মিলে অনেকেই এক অসহায় অবস্থায় বাস করেন। যেখানে বাসার চাবি ল্যান্ডলর্ডের হাতে, যেখানে রাতের আধারে landlord এসে দরজায় দাঁড়ায়, সেখানে একাকী নারীকে রক্ষা করার মতো কেউ থাকে না। এমন প্রেক্ষাপটে রিফাতের মতো কেউ যখন গোপনে সাহস সঞ্চয় করে প্রতিবাদ করেন, তখন সেটি হয়ে ওঠে একটি কমিউনিটির জন্য আলোর দিশা।


Back to top button
🌐 Read in Your Language