
সমুদ্রের ধারে কানাডার পশ্চিম উপকূল। উত্তরে বরফঢাকা পর্বতমালা, দক্ষিণে রোদেলা বিচের অনন্ত নীল, আর মাঝখানে ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়—UBC। এই শহর ও ক্যাম্পাসে প্রতিদিনই আসে হাজারো মুখ, পেছনে ফেলে নানা দেশের আলাদা আলাদা গল্প। গত সোমবার (২ জুন ২০২৫) ভোরে, ওকানাগান লেকের কেলোনা প্রান্তে ভেসে ওঠে এক তরুণের নিথর দেহ—যেন নীল জলের বুক চিরে উঠে আসে এক নিঃশব্দ অনিশ্চয়তা। প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ে—এ কি নিছকই এক দুর্ঘটনা, না কি তার গভীরে লুকিয়ে আছে অন্য এক গল্প?
শাশ্বত সৌম্য—বুয়েটের সিএসই-১৫ ব্যাচের ছাত্র, ২০২১ সালে স্নাতক শেষ করে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে এবং পরে বুয়েটে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। তাঁর মেধা, নিষ্ঠা ও উচ্চাশা তাকে পৌঁছে দেয় বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—MIT-তে। সেখানে ২০২৪ সালে শুরু করেন পিএইচডি গবেষণা, বিষয়: “AI Ethics”—অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিকতা, বিশেষত প্রযুক্তির দায়বদ্ধতা, সামাজিক প্রভাব ও মানবিক মানদণ্ড রক্ষার প্রশ্ন।
২৫ মে ২০২৫, একটি সম্মেলনের আমন্ত্রণে কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় আসেন তিনি—”Advances in AI & Systems Research” শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিতে। গবেষণার শিরোনাম ছিল: “Algorithmic Bias and the Ethics of Machine Decision-Making.” তার উপস্থাপনা ছিল আলোচিত, যদিও তিনি কিছু সহগবেষকের আচরণ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন বলে জানা গেছে। কিন্তু সেই সম্মেলনই হয়ে ওঠে তার জীবনের শেষ অধ্যায়।

সোমবার ভোরে Kelowna-র Okanagan Lake-এর ধারে একজন “অচেতন ব্যক্তি” দেখার খবর আসে পুলিশের কাছে। সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। ঘটনাস্থলে কোনো দৃষ্টিগোচর আঘাতের চিহ্ন ছিল না। তদন্ত পরিচালনা করছে Kelowna RCMP।
ফেসবুকে ৩১ মে একটি পোস্টে শাশ্বত লেখেন, “The Great American Dream is Dead”। তাঁর ফেসবুক স্টেটাসটি বাংলায় অনুবাদ করে দেয়া হলো:
“The great American dream is dead!
গত সপ্তাহে আমি একটি বক্তৃতা দিতে এসেছিলাম ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে UC Berkeley, Princeton, Harvard ইত্যাদি স্থানেও আমার অন্যান্য আমন্ত্রিত বক্তৃতার সময়সূচি ছিল। আমি আমার কাজ নিয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী এবং এই বক্তৃতাগুলো নিয়ে খুবই উত্তেজিত ছিলাম।
কিন্তু কানাডায় আসার পর, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তৃতাগুলো আপাতত স্থগিত রাখব এবং বরং এই দেশেই কাজ করব। UBC-তে আমার বক্তৃতার পর, সেখানে NLP গবেষণা দল এতটাই মুগ্ধ হয়েছিল যে তারা আমায় জিজ্ঞেস করেছিল আমি কি এখানে AI গবেষণার সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত হতে আগ্রহী কিনা। এক রাত ঘুমিয়ে এই প্রস্তাব নিয়ে ভাবার পর, আমি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি—আমি হ্যাঁ বলছি।
এখনো অনেক কিছু রয়েছে যা আমাকে সামলাতে হবে, কিন্তু সেগুলো মেনে নেয়া যায়। আমার আমেরিকান স্বপ্ন শেষ। আর সেটাই শেষ থাকবে। একটি দেশ, যা গড়ে উঠেছিল দক্ষ ও মেধাবী অভিবাসীদের পরিশ্রমের ওপর ভিত্তি করে, তারা আজ সফলভাবে সেই মানুষগুলোকে নিরুৎসাহিত করেছে থেকে যাওয়ার জন্য।
বেছে নিন সতর্কতার সঙ্গে, মানুষ। পৃথিবী বদলে যাচ্ছে, এবং আমার মনে হয় যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই তার আকর্ষণ হারিয়েছে সেইসব স্বপ্নবান মানুষদের জন্য যারা গবেষণা ও কাজের মাধ্যমে বিশ্বকে সাহায্য করতে চেয়েছিল।”(স্ক্রিনশট সংযুক্ত)

এমআইটি তাঁর মৃত্যুকে “অপ্রত্যাশিত ও মর্মান্তিক” বলে উল্লেখ করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে প্রতিবাদ, ভালোবাসা, আর অশ্রুজলের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।
The B.C. Coroners Service-এ মামলা চলমান, রিপোর্ট আসতে ৪–৬ সপ্তাহ লাগবে।

সৌম্যের মৃত্যু কি গবেষণার চাপের ফল, নাকি লেকের নিষ্ঠুর খেলা? নাকি কোনো অদৃশ্য হাতের ইঙ্গিত? উত্তর এখনও তরঙ্গের নিচে অপেক্ষা করছে—যেমন অপেক্ষা করছে এক মা তার সন্তানের ফিরে আসার।









