সম্পাদকের পাতা

সিডনির আরনিমার গল্প

নজরুল মিন্টো

মায়ের সাথে আরনিমা

সিডনির পেনাল্ট হিলস রোডের একটি নিস্তব্ধ অ্যাপার্টমেন্ট। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে সিডনির গ্রীষ্মকালীন আকাশ ছিল ঝলমলে, কিন্তু তার ভেতরেই যেন হঠাৎ এক অপ্রত্যাশিত বিষণ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। কোনো অপঘাতের নীরব পূর্বাভাস যেন চারদিকে।

২৮ জানুয়ারি, ২০২৪-এর সেই রোববার সকালে স্থানীয় পুলিশের জন্য অপেক্ষা করেছিল এক ভয়াবহ দৃশ্য। বাথটাবের পানিতে ভাসছিল এক তরুণীর নিথর দেহ। চারপাশে ছড়ানো ছিল রাসায়নিকের তীব্র গন্ধ—মুখ ঢাকা ছিল কালো প্লাস্টিকে, হাতে-পায়ে জমাট বাঁধা রক্ত। দৃশ্যটি দেখে মনে হচ্ছিল, কোনো এক নৃশংস থ্রিলার চলচ্চিত্রের সেট।

১৯ বছর বয়সী মেডিসিনের শিক্ষার্থী আরনিমা হায়াত। ২০০৬ সালে বাবা আবু হায়াৎ ও মা মাহাফুজার হাত ধরে বাংলাদেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। তাদের গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জে হলেও পুরান ঢাকার নাজিরাবাজারে দাদা-দাদির বাড়িতে কেটেছিল তার শৈশবের দিনগুলি।

আরনিমা ম্যারিকভিলের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েছিলেন। তারপর টেম্পে হাইস্কুলে ভর্তি হন যেখানে তিনি গণিতে বেশ পারদর্শীতা প্রদর্শন করেন। সমবয়সীদের মধ্যে তিনি দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন। এইচএসসিতে ৯৭ এর বেশি স্কোর করে ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদে ভর্তি হন।

তার স্বপ্ন ছিল একজন সার্জন হওয়া—মানুষের ব্যথা কমানো, প্রাণ রক্ষা করা। ক্লাসের বন্ধুরা বলত, আরনিমা যেন এক হাঁটতে থাকা কবিতা। চোখে সব সময় এক রকম স্বপ্নিল দীপ্তি, মুখে হাসি, আর কথায় আত্মবিশ্বাস। কিন্তু সেই মেয়েটি যে নিজেই একদিন কারও নিঃশ্বাসে নিঃশেষ হয়ে যাবে—তা কেউ ভাবেনি।

খুনি মিরাজ জাফর

২০২১ সালের শেষ দিকে, অল্প বয়সে প্রেমে পড়ে গিয়েছিল আরনিমা। যার প্রতি ভালোবাসা জন্মেছিল, তার নাম মিরাজ জাফর—পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত, বয়সে মাত্র এক বছরের বড়। পরিবারকে না জানিয়েই সে মিরাজের সঙ্গে গোপনে ইসলামি রীতি অনুযায়ী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়।

এই বিয়ে মেনে নেননি আরনিমার বাবা-মা। তারা মেয়েকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, মিরাজের আচরণ ছিল নিয়ন্ত্রণবাদী, রাগান্বিত, এবং অবিশ্বাসে ভরপুর। কিন্তু তরুণ প্রেমের অন্ধত্বে সে কিছুই শুনতে চায়নি। মেয়েটি বিশ্বাস করেছিল, ভালোবাসাই সবকিছু ঠিক করে দেবে।

বিয়ের ছয় মাসের মধ্যেই সম্পর্কে ফাটল ধরে। মিরাজের আসল রূপ ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে। প্রতিবেশীরা প্রায়ই শুনতেন ঝগড়ার আওয়াজ। সে নিয়মিত আরনিমাকে মানসিকভাবে নির্যাতন করত। একাধিকবার হাত তুলেছিল তার উপর। এমনকি গলা চেপে ধরে একবার শ্বাসরোধ করেছিল। মিরাজের পরিবার আরনিমাকে “বাংলাদেশি” বলে হেনস্থা করতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। একদিন আরনিমা ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন, “ভালোবাসা নামক জিনিসটা আসলে কী?”

২৭ জানুয়ারি রাতে শেষবারের মতো তাকে দেখা গিয়েছিল স্থানীয় একটি সুপারমার্কেটে। ক্যামেরা ফুটেজে দেখা যায়, মিরাজের সাথে তার তীব্র বাকবিতণ্ডা হচ্ছে।

২০২২ সালের ২৯ জানুয়ারি। মিরাজ সেদিনের সকালে আরনিমাকে হত্যা করে। ধারণা করা হয়, শ্বাসরোধ করে অথবা চাপা দিয়ে মেরে ফেলে সে।

পোস্টমর্টেম রিপোর্টে প্রকাশ, আরনিমার মাথায় আঘাতের চিহ্ন, গলায় ফাঁসির দড়ির রেখা। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ড. অ্যালেক্স ফিশার বলেন, “দেহটি হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডে ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল, সম্ভবত আলামত ধ্বংস করতে।” মিরাজের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয় রক্তমাখা ছুরি ও তার ল্যাপটপে আরনিমাকে হুমকি দেওয়ার চ্যাট হিস্ট্রি। তার ফোনের গুগল সার্চ হিস্ট্রি বলছে, সে আগেই খুঁজে দেখেছিল:

– “হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড কি ত্বক গলিয়ে দিতে পারে?”

– “সিডনিতে কাউকে হত্যা করলে কত বছরের জেল হয়?”

একটা পরিকল্পিত হত্যার পরিণতি দাঁড়িয়েছিল অ্যাসিডে গলিত শরীরের ভয়াবহ দৃশ্য। ফায়ার সার্ভিস যখন পৌঁছায়, তারা দেখে বাথটাবে ফেনায়িত রাসায়নিকের মধ্যে পড়ে আছে এক অর্ধগলিত দেহ। পুলিশ অফিসার জুলি বুনের কণ্ঠে কাঁপন ছিল: “আমি ২৫ বছরের চাকরিজীবনে এমন দৃশ্য কখনো দেখিনি।” হত্যাকালে আরনিমা গর্ভবতী ছিলেন। তার দেহ ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছিল ।

মেয়ের খোঁজ না পেয়ে যখন আরনিমার বাবা-মা পুলিশের কাছে যান, তখন তারা জানতেন না—এই খোঁজ তাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর উত্তর বয়ে আনবে। মাহাফুজা আক্তার, আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বললেন: “আমার মেয়ের স্বপ্ন ছিল একজন সার্জন হওয়া। সে মানুষের জীবন বাঁচাতে চেয়েছিল। কিন্তু আজ আমার মেয়ের মুখটাই আর চেনা যাচ্ছে না।” জানা যায়, ২০২১ সালে মিরাজ আরনিমার বাবাকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন, যার ফলে তার বিরুদ্ধে একটি নিষেধাজ্ঞা আদেশ জারি করা হয়েছিল ।

হত্যার পর মিরাজ আত্মগোপনে চলে যায়। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কয়েকদিন পালিয়ে ছিল। শেষমেষ ৩০ জানুয়ারি সে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে। শুরু হয় বিচারিক প্রক্রিয়া। আদালতে সে নিজের দোষ স্বীকার করে নেয়।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিডনির সুপ্রিম কোর্ট মিরাজকে ২১ বছর ৬ মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে, যার মধ্যে ১৬ বছর তাকে অনিবার্যভাবে কাটাতে হবে জেলে।

এই ঘটনার গভীরে গেলে দেখা যায়—সহিংসতা কখনো একদিনে আসে না। এটি আসে ছোট ছোট সন্দেহ, নিষেধ, নিয়ন্ত্রণ, ও হুমকির মাধ্যমে। আরনিমার জীবনে এই অশুভ উপস্থিতিগুলো ছিল শুরু থেকেই। সে বলেছিল, “আমি ঠিক আছি,” কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে কাঁদছিল।

তার বন্ধুরা বলছে, “আরনিমা কখনো কাউকে কষ্ট দিতে পারত না। সে সবসময় অন্যদের মুখে হাসি ফোটাতে চাইত।” কলেজের এক শিক্ষক কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “সে আমার শ্রেষ্ঠ ছাত্রীর একজন ছিল। এমন নিষ্ঠুর পরিণতি সে পেতে পারে—কল্পনাও করতে পারছি না।”
আরনিমা ছিল এক সম্ভাবনার নাম, যার ভবিষ্যৎ হয়তো বহু জীবনকে রক্ষা করত। কিন্তু সেই আলোকবর্তিকা নিভে গেল এক হিংস্র প্রেমিকের কারণে।

আরনিমার স্মৃতিতে তার বাবা প্রতিষ্ঠা করেছেন “আরনিমা ফাউন্ডেশন”। যেসব মেয়েরা নির্যাতনের শিকার হয় তাদের জন্য আশ্রয় ও আইনি সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করবে এ সংগঠন।


Back to top button
🌐 Read in Your Language