
সকাল তখন ঠিক সেই মুহূর্তে পৌঁছেছে, যখন সূর্যের আলো শহরের বিল্ডিংগুলোকে কাঁচের মত ঝলমলে করে তোলে, অথচ মানুষের মুখে তখনও ঘুমের রেখা। অটোয়ার ডাউনটাউনের ব্যস্ত সড়কে তখন এক অপূর্ণ প্রতিজ্ঞা নিয়ে ছুটছিল একটি সাইকেল—চুপচাপ, নিষ্পাপ, নিরীহ। ক্যানালপাড় ঘেঁষে বাইক লেন ধরে লরিয়ার অ্যাভিনিউ ওয়েস্টের দিকে যাচ্ছিল এক তরুণী।
নুসরাত জাহান। বয়স মাত্র ২৩। সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ তরুণী, যাকে নিয়ে একটি পরিবার প্রতিদিন নতুন করে ভবিষ্যৎ কল্পনা করত। বাবা ছিলেন কূটনৈতিক কর্মকর্তা—বাংলাদেশ হাই কমিশনের হিসাববিভাগে নিযুক্ত। কন্যা পিতা-মাতার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে অনেক সময়, আর নুসরাত তো সরাসরি তাঁর বাবার পেশার পথ ধরেই এগোচ্ছিল। উইলিস কলেজে পড়াশোনা করছিলেন অ্যাকাউন্টিং নিয়ে, এবং জানুয়ারিতে কার্লটনে ভর্তি হয়ে ফিনান্স জগতে নিজের জায়গা করে নেওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর। কিন্তু সব পরিকল্পনা একটি অনভিপ্রেত মোড়ে এসে থেমে গেল।
সেদিন ছিল ১ সেপ্টেম্বর ২০১৬। সকাল ৭টা ৪৫ মিনিট। অফিস টাইম, স্কুল টাইম, জীবন চলার সর্বোচ্চ গতি। অথচ বাইক লেন ছিল শান্ত, গাছের ছায়া ছুঁয়ে যে ট্র্যাফিক লাইটের দিকে সে যাচ্ছিল, তা ছিল তার চেনা পথ। বাড়ি থেকে মাত্র দুই ব্লক দূরে, এক ফালি রোদ ও প্রতিশ্রুত ভবিষ্যতের মাঝখানে, নুসরাতকে চাপা দিল টমলিনসন কনস্ট্রাকশন কোম্পানীর একটি বিশালকায় ডাম্প ট্রাক।
অথচ সেই বাইক লেনটি ছিল ‘সেগ্রিগেটেড’—অর্থাৎ বিশেষভাবে সাইকেল আরোহীদের জন্য আলাদা করা নিরাপদ পথ।
নুসরাত ছিলেন খুবই প্রতিভাবান। বাংলাদেশে থেকেই তিনি ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক শেষ করে এসেছিলেন। কার্লটনে ভর্তি হয়ে ফিনান্সে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর। নুসরাতের ভাই, মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল নাসেরের ভাষায়, “সব ভাইবোনের মধ্যে ও ছিল সবচেয়ে মেধাবী। ও চেয়েছিল একদিন বড় কোনো ব্যাংকে চাকরি করবে, নিজে কিছু করবে, পরিবারের পাশে দাঁড়াবে।” কিন্তু সেই পরিবারকেই আজ দাঁড়াতে হয়, কাঁধে কফিন তুলে—যে কফিনে কোনো ভাষা নেই, কোনো জবাব নেই।
ঘটনার পরদিনই, ২ সেপ্টেম্বর, সিটি হলে আয়োজিত হয় এক শোকাবহ সমাবেশ।। শতাধিক মানুষ অংশ নেয় সেই সমাবেশে। বাইকে ফুল বেঁধে, মোমবাতির আলো জ্বেলে, “নুসরাতের জন্য ন্যায়বিচার চাই” স্লোগানে মুখরিত হয় অটোয়া ডাউনটাউন। উইলিস কলেজের শিক্ষার্থীরাও দাঁড়িয়ে গিয়েছিল সেই মোড়ে—যেখানে রক্ত আর ডাম্প ট্রাকের চাকা একসাথে ছাপ রেখে গিয়েছিল।
দীর্ঘ তদন্তের পর পুলিশ জানায়—এটি একটি “দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা।” একটি “ব্লাইন্ড স্পট”-এ পড়ে গিয়েছিলেন নুসরাত। ট্রাক চালক তাঁকে দেখতেই পাননি। ট্রাক চালক স্টিভেন ব্রুস কনলির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল বটে, কিন্তু ২০১৮ সালে তাঁকে আদালত নির্দোষ ঘোষণা করে।
নুসরাতের মৃত্যুর পর, অটোয়া সিটি কাউন্সিল বাইক লেন উন্নয়ন করার সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন রাস্তার পরিকল্পনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়।
নুসরাত আর নেই, কিন্তু তাঁর ছোট্ট সাইকেলটি যেন আজও অটোয়া ডাউনটাউনের বাতাসে ধীরে ধীরে প্যাডেল ঘোরায় নিঃশব্দে, নির্ভীক এক অভিমান নিয়ে।









