
লন্ডনের আকাশটা সেই রাতে নীল ছিল না। ২০১৭ সালের ১৪ জুন রাত ১২টা ৫৪ মিনিটে যখন গ্রেনফেল টাওয়ারের দ্বিতীয় তলা থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ল, তখন শহরের অন্য প্রান্তে হয়তো কিছু মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন, কেউ হয়তো ইফতারের ক্লান্তি মুছে নিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, কেউ বা ভাবছিলেন আগামীকালের পরিকল্পনা। কিন্তু সেই ভবনের ২১ তলায় বসবাস করা এক পরিবার জানত না—এই রাতই হবে তাঁদের জীবনের শেষ অধ্যায়।
লন্ডনের ল্যাটিমার রোড। শহরের এই প্রান্তে ছিমছাম গলি, রাস্তাঘাটে ভিক্টোরিয়ান আমলের ঘরবাড়ির ছায়া, আর তার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিশাল ধূসর ভবন—গ্রেনফেল টাওয়ার। এই টাওয়ারটিতে বহুজাতিক মানুষের বসবাস, নানা গল্প, নানা স্বপ্ন। সেই আকাশছোঁয়া টাওয়ার এখন শুধু ছাইয়ের স্তূপ নয়, স্মৃতির মিনার।
যে তলায় আগুন ধরেছিল, তার অনেক ওপরে, ২১ তলার এক কোণে ছিল কামরু মিয়া পরিবারের শান্তিময় বাসা। জানালার পাশে ছিল রাবেয়া বেগমের ছোট্ট গাছপালা, কামরু মিয়ার বইয়ের তাক, আর দেয়ালে টাঙানো ছিল বাংলাদেশের মানচিত্র। এখান থেকেই তাঁরা প্রতিদিন নিচের ব্যস্ত শহরটাকে দেখতেন—বাস চলেছে, মানুষ হাঁটছে, পৃথিবী যেন যন্ত্রচালিত এক টিকটিকির মতো এগিয়ে যাচ্ছে।

কামরু মিয়া দেশে শিক্ষকতা করতেন। ১৯৯৭ সালে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। রাবেয়া বেগম বাসায় বসে সেলাইয়ের কাজ ও পরিবারের দেখাশোনা করতেন। তাদের বাড়ি সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলায়।
প্রথমে তারা ছিলেন নটিং হিলের একটি ছোট্ট ফ্ল্যাটে, তারপর বিভিন্ন ভাড়া বাড়ি ঘুরে ২০০৯ সালে তাঁরা উঠেন গ্রেনফেল টাওয়ারে, ২১ তলার ফ্ল্যাট ১৯৬-এ। ইতিমধ্যে কামরু মিয়া অবসর নিয়েছেন, বাড়িতেই থাকতেন। সকালে উঠে কুরআন তেলাওয়াত করেন, বাংলা পত্রিকা পড়েন। রাবেয়া বেগম রান্না করতেন ছেলেমেয়েদের পছন্দের খাবার।
বড়ো ছেলে হামিদ ট্যাক্সি চালক, মেজো ছেলে হানিফ স্থানীয় এক রেস্তোরাঁর ম্যানেজার, ছোটো ছেলে হাকিম পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল, আর মেয়ে হুসনা লেস্টার ইউনিভার্সিটিতে এমবিএ করছিলেন। হুসনা সপ্তাহান্তে কাজ করতেন এক এল্ডারলি কেয়ার সেন্টারে। একমাস পর তাঁর বিয়ে, সবকিছু প্রস্তুত। ১৫ জুলাই লেস্টারের গ্র্যান্ড হোটেলে অনুষ্ঠানের দিন নির্ধারিত। নিমন্ত্রণপত্রের ডিজাইন, খাবারের তালিকা, এমনকি মেহেদির গানের লাইন পর্যন্ত হুসনা নিজে ঠিক করে রেখেছিলেন।
২০১৭ সালের ১৩ জুন, এক মঙ্গলবার রাত। বাড়ির সকলে ছিলেন একত্রে, শুধু হাকিম ছিলেন বন্ধুর বাড়িতে। রাবেয়া রান্নাঘরে, হানিফ ফোনে কথা বলছেন, হুসনা শেষ করছিলেন তাঁর বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রের কাজ। হঠাৎ রাত ১২:৫০-এ নিচতলা থেকে এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ। জানালা দিয়ে হামিদ দেখে নিচে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ফায়ার ব্রিগেডে ফোন করা হয়। নির্দেশ আসে—”Stay inside.” তখনো কেউ জানে না, এই সিদ্ধান্ত হবে মৃত্যুর এক নির্বাক ফরমান। আগুন ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে। রাত ১:৪৫ নাগাদ ফ্ল্যাট ছেড়ে নামার সুযোগ ছিল। কিন্তু ৮২ বছরের কামরু মিয়া তখন বিছানায়, চলাফেরায় অক্ষম। রাবেয়াও শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। সন্তানরা কি তাঁদের রেখে চলে যাবে?

হানিফ ফোন করেন কাজিন সামিরকে—”ভাই, আমরা বের হতে পারছি না… বাবা-মাকে নিয়ে অপেক্ষা করছি… হয়তো এটাই শেষ।”
রাত ৩টা ৮ মিনিটে হাকিমের ফোনে বোন হুসনার শেষ কল আসে। কণ্ঠে ছিল ভয়ের ছায়া, কিন্তু শব্দে অদ্ভুত শান্তি: “আগুন লেগেছে, আমরা ফ্ল্যাটে আটকা পড়েছি। যদি কখনো কষ্ট দিয়ে থাকি, ক্ষমা করে দিও। সম্ভবত আমরা বাঁচব না।”
রাত ৩:১০। হানিফ একটি ভয়েস নোট পাঠান—”সামির, শোন… আমাদের সময় শেষ। হুসনা বলছে, তার বিয়ের dress-টা যেন তার best friend সোহাগীকে দিয়ে দিতে… বাবা-মাকে আমরা ছেড়ে যেতে পারব না। Don’t cry… আমরা together আছি।”
ভোর চারটায় যখন ফায়ারফাইটাররা ২১ তলায় পৌঁছান, তখন তাঁদের চোখের সামনে এক ধ্বংসস্তূপে দেখা যায় পাঁচটি দেহ—জড়াজড়ি করে থাকা। কামরু মিয়ার হাতে খোলা কুরআন, হুসনার পাশে ছড়িয়ে থাকা বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রের অংশ। যেন এক পরিবার ইতিহাসের বুকেই ভালোবেসে নিঃশেষ হয়েছে।
নিহতরা ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক—বাবা কামরু মিয়া (৮২), মা রাবেয়া বেগম (৬০-এর কোঠায়), এবং তাঁদের তিন সন্তান—হানিফ (২৬), হামিদ (২৯) ও হুসনা (২২)।
পরিবারটি অন্তত এক ঘণ্টা সময় পেয়েছিল পালানোর জন্য। রাত ১টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত তাঁদের নিচে নামার সুযোগ ছিল। কিন্তু রাবেয়া বেগম অসুস্থ, কামরু মিয়া প্যারালাইসিসে আক্রান্ত এবং চলাফেরায় অক্ষম। সন্তানরা সিদ্ধান্ত নেয়—তাঁরা বাবা-মাকে রেখে যাবেন না। তাঁরা একসঙ্গে এদেশে এসেছেন, একসঙ্গেই যাবেন।

হুসনা, হানিফ ও হামিদ—তাঁরা চাইলে হয়তো নিচে নেমে বাঁচতে পারতেন। তাঁদের জীবনের কত কিছু বাকি ছিল—বিয়ে, ক্যারিয়ার, ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু পারিবারিক ভালোবাসা ছিল তাঁদের কাছে মুক্তির চেয়েও পবিত্র। বাবা-মাকে রেখে যাওয়া ছিল তাঁদের কাছে অসম্ভব এক নির্মমতা।
তাঁরা জানতেন, এই সিদ্ধান্তের মানে মৃত্যু। তবু তাঁরা বেছে নিলেন একসাথে চলে যাওয়ার পথ। হয়তো তাঁরা বিশ্বাস করতেন, একসঙ্গে থাকলে মৃত্যুও ভয় পাবে।
সেদিনের গ্রেনফেল অগ্নিকাণ্ডে ৭২ জনের মৃত্যু ঘটে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় আবাসিক অগ্নিকাণ্ড। সরকারি তদন্তে বিল্ডিং রেগুলেশন, ফায়ার সেফটি গাইডলাইন এবং হাউজিং কাউন্সিলের গাফিলতি বেরিয়ে আসে। হুসনা ও তাঁর পরিবারের মৃত্যু সেই ব্যর্থতার একটি নির্মম প্রতীক।
হুসনার নামে চালু হয়েছে মেমোরিয়াল স্কলারশিপ। লন্ডনের Portobello Road-এ তাঁদের পরিবারের একটি মুরাল আঁকা হয়েছে—হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচটি ছায়ামূর্তি।
এই গল্প কেবল একটি ট্র্যাজেডি নয়। এটি একটি ভালোবাসার মহাকাব্য। একটি পরিবার, যাঁরা শেষ মুহূর্তে একে অপরকে ছেড়ে যাননি। একসাথে মৃত্যুকে গ্রহণ করেছেন, যেন মৃত্যুর মধ্যেও জীবনের পূর্ণতা খুঁজে পান।
হাকিম প্রতি শুক্রবার কফির কাপ হাতে নিয়ে ল্যাটিমার রোডের বেঞ্চে গিয়ে বসেন—বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। বেঞ্চের পেছনে খোদাই করা লেখা—Here lived a family who loved each other beyond life itself. 14.06.2017.









