সম্পাদকের পাতা

রুমানা মঞ্জুরের জীবনের মহাকাব্য

নজরুল মিন্টো

রুমানা মঞ্জুর—কানাডার প্রথম অন্ধ নারী আইনজীবী

জানালা দিয়ে হালকা রোদ এসে পড়ছে ভ্যাঙ্কুভারের আকাশ ছুঁয়ে থাকা গগনচুম্বী ভবনের ভেতরে এক অফিস কক্ষে। দূরে বরফঢাকা পাহাড় দেখা যায়, মাঝেমধ্যে মেঘ এসে তাদের ঢেকে দেয়, আবার কখনো তুষারের আলোয় ঝিকমিক করে ওঠে। এখানে, আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠানের ব্যস্ততম কর্পোরেট পরিবেশের মাঝে, একটি মৃদু অথচ দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে আসেন এক নারী—যার চোখ নেই, কিন্তু দৃষ্টিশক্তি আছে।

তিনি চোখ দিয়ে দেখেন না, কিন্তু অনুভব করেন হৃদয়ের গভীর দৃষ্টি দিয়ে। পাশে তাঁর এক টুকরো আলো—ছোট্ট একটি কন্যা। মেয়েটির হাসি যেন নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে, যেমন জোনাকির আলো ছুঁয়ে যায় রাতের আকাশ। মা ও মেয়ের এই দীর্ঘ পথচলা আজ এক আলোকিত পরিণতির পথে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এ পথে যাত্রার সূচনা এমন মসৃণ ছিল না। এই গন্তব্যে পৌঁছাতে তাঁদের পার করতে হয়েছে কত অনিশ্চয়তা, কত নিঃসঙ্গ রাত, কত অনাকাঙ্ক্ষিত অন্ধকার।

রুমানা মঞ্জুর। জন্ম ঢাকায়। তাঁর পিতা ছিলেন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বড়। শৈশবে তাঁর স্বপ্ন ছিল পাইলট হওয়ার। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আগ্রহ প্রবাহিত হয় শিল্প ও স্থাপত্যের দিকে। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে, যেখানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

এই সময়েই আসে একটি বিয়ের প্রস্তাব—হাসান সাইদ সুমন নামের এক তরুণ, যিনি বুয়েটে যন্ত্রকৌশলে অধ্যয়নরত। তাঁর ও রুমানার পিতার বন্ধুত্ব থেকেই এই প্রস্তাবের সূচনা। রুমানাকে মতামত চাওয়া হলে তিনি সম্মতি দেন। প্রথম দেখা, প্রেম, এবং অতঃপর বিয়ে। ২০০০ সালে তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হয়।

বিয়ের ছবি: রুমানা ও হাসান সাইদ সুমন

নববিবাহিত জীবনের প্রথম দিন থেকেই রুমানা অনুভব করেন এক অশান্ত ছায়া। নির্যাতন শুরু হয় নিঃশব্দে। কিন্তু সমাজ, পরিবার, ও এক অদৃশ্য ভয়ের কারণে তিনি সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখেন। মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্ন হন, কিন্তু আবারও ফিরে আসেন।

২০০৪ সালে রুমানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এর মধ্যেই জন্ম নেয় তাঁদের কন্যা আনুশেহ। ২০১০ সালে রুমানা ইউবিসি (University of British Columbia) তে একটি মাস্টার্স প্রোগ্রামে অংশ নিতে আসেন—এবং এখান থেকেই তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

২০১১ সালের জুন মাসের শুরু। রুমানা মনজুর বাংলাদেশে পরিবারের সাথে সময় কাটাচ্ছিলেন। তার স্বামী তার কানাডায় ফিরে যাওয়া এবং উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে।

৫ জুন, ২০১১ সাল। বাইরে তখন আষাঢ়ের ভরা দুপুর। মেঘলা আকাশ, গরমে ঘামে ভিজে আছে দেয়াল, কাক ডাকা দুপুর যেন আরও নিঃসঙ্গ করে তোলে বাসার নিস্তব্ধতা। রুমানা মা-বাবার ঘরে বসে ছিলেন, কম্পিউটারে চোখ রেখে থিসিস লিখছিলেন। তাঁর পিঠ ছিল দরজার দিকে। হঠাৎ দরজা বন্ধের শব্দ—চমকে তাকানোর আগেই বুঝলেন, ঘরে প্রবেশ করেছে কেউ। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে।

তাঁর স্বামী সুমন ছিল সেই আগন্তুক। গৃহকর্মী অজান্তে তাকে ঘরে ঢুকতে দিয়েছিল। সুমন দরজা ভিতর থেকে লক করে দেয়। তারপর নিঃশব্দে, ঠান্ডা ক্রোধে রুমানাকে টেনে নিয়ে যায় বিছানায়।

হঠাৎ করেই ঘরের ভেতর নামতে থাকে এক ভয়ানক কুয়াশা—কোনো দৃশ্যমান ধোঁয়া নয়, এক ভয়ের ঘনত্ব। রুমানা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সুমন ঝাঁপিয়ে পড়ে হাত চেপে ধরে তাঁর গলায়। তিনি ছটফট করতে থাকেন, নিশ্বাসের পথ রুদ্ধ হয়ে আসে। পরক্ষণেই সুমনের মুষ্ঠির ঘায়ে ভেঙে যায় তাঁর কয়েকটি দাঁত, কামড়ে ছিঁড়ে নেয় তাঁর নাকের আগা। দানবীয় উন্মত্ততায় সুমন তাঁর দুটি আঙুল ঢুকিয়ে দেয় রুমানার চোখের ভেতরে। রুমানা তখন আর চিৎকার করতে পারেন না—শুধু কাঁপতে থাকেন নিঃশব্দে। সেই মুহূর্তেই তাঁর উপলব্ধি—সব অন্ধকার। কিছুই দেখা যায় না। রক্ত গড়িয়ে পড়ে বিছানায়, মেঝেতে। কিন্তু সেই পিশাচ থামে না—বরং আরও অন্ধকার নামিয়ে আনে।

ছবিতে কন্যা আনুশেহ-র সাথে রুমানা

এই বর্বরতা চলেছিল কয়েক মিনিট। পাশের ঘরে ছিলেন পাঁচ বছরের আনুশেহ, যার কান্না আর গৃহকর্মীর চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা এসে দরজা ভাঙেন। তখন রুমানা নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছেন রক্তাক্ত শরীর নিয়ে, কিন্তু তিনি জীবিত।

ঘটনার খবর চাউর হতেই বাংলাদেশে এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক, একজন মা, একজন স্কলার—এমন এক নারীর উপর এমন নির্মমতা? বিবিসি, সিবিসি, আলজাজিরা, টাইম ম্যাগাজিন, নিউ ইয়র্ক টাইমস—সবাই এই ঘটনায় শোক প্রকাশ করে ও প্রতিবাদ জানায়। কানাডায় তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় ইউবিসি তাঁকে ফিরিয়ে আনতে দ্রুত উদ্যোগ নেয়। ভিসা, চিকিৎসা, সবকিছুর ব্যবস্থা করা হয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে।

ভ্যাঙ্কুভারে নামার পর শত শত মানুষ তাঁকে স্বাগত জানায়। অনেকে ফুল হাতে দাঁড়িয়েছিলেন, কেউ ছিলেন চোখে অশ্রু নিয়ে। দৃষ্টিহীন চোখে তখনও ছিল সেই আগুন, যা তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার, থেরাপি—প্রথম ছয় মাস পার হয়ে যায় কেবল শারীরিক যন্ত্রণায়। কিন্তু রুমানার লড়াই ছিল তারও পরে। তিনি নিজেকে গড়েছেন নতুন করে। কম্পিউটারে ব্রেইল সফটওয়্যার ব্যবহার, সাদা ছড়ি দিয়ে হাঁটতে শেখা, রান্না, মেয়ের যত্ন নেওয়া—সবকিছু তিনি শিখেছেন শূন্য থেকে।

তিনি পিএইচডির পরিকল্পনা বাদ দিয়ে রাজনৈতিক বিজ্ঞানে মাস্টার্স শেষ করেন। এরপর আইনজীবী হওয়ার সংকল্প নেন। UBC-তে আবার ভর্তি হয়ে LSAT দিয়ে আইন পড়া শুরু করেন। তাঁর আইন পড়ার মূল প্রেরণা ছিল—নিজের কণ্ঠ নিজে হয়ে ওঠা। তিনি বলেছিলেন, “আমি নিজেকে প্রতিনিধিত্ব করতে চেয়েছিলাম। এই লড়াই আমার ছিল, আমারই থাকা উচিত।”

রুমানা মঞ্জুরের স্বামী হাসান সাইদ সুমনকে ২০১১ সালের জুন মাসে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। বাংলাদেশের আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে। তবে, রুমানার পরিবারের দাবি ছিল মৃত্যুদণ্ডের, যা আদালত দেননি। ২০১১ সালের ৫ ডিসেম্বর, গ্রেপ্তারের প্রায় ছয় মাস পর, তার মৃতদেহ পাওয়া যায় কারাগারের হাসপাতালে। সরকারি রিপোর্টে এটিকে আত্মহত্যা বলে চিহ্নিত করা হয়।

এদিকে ২০১৭ সালে, শত প্রতিকূলতার মাঝেও রুমানা ইউবিসি থেকে আইন ডিগ্রি অর্জন করেন শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী হিসেবে। সে বছরই চ্যান সেন্টারে তাঁর দেওয়া বিদায় বক্তৃতা কানাডার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে ওঠে। তাঁর চোখ ছিল না, কিন্তু কণ্ঠে ছিল আগ্নেয়গিরির মত সাহস। ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার চোখ নেই, কিন্তু আমার স্বপ্ন এখনও আলো ছড়ায়।

২০১৮ সালে তিনি DLA Piper (Canada) LLP তে আর্টিকেলড স্টুডেন্ট হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে তিনি ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিচার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ন্যাশনাল লিটিগেশন সেন্টারে অ্যাডভোকেট হিসেবে নিযুক্ত হন। এই অবস্থানে তিনি ছিলেন কানাডার প্রথম অন্ধ নারী আইনজীবী।

২০২৪ সালের ২৩ এপ্রিল, Penguin Random House থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর জীবনীগ্রন্থ ‘Out of Darkness’। লেখক ডেনিস চং বইটি রচনা করেন চার বছরের গবেষণায়। বইটিতে রুমানার কণ্ঠ, যন্ত্রণা, প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা, ও বিজয়ের প্রতিটি পর্ব অকপটে উঠে এসেছে। তিনি বলেন, “আমি চাই আমার মেয়ে জানুক—তার মা কীভাবে বেঁচেছিল, কীভাবে হেরেও জিতেছিল।” বইটির বাংলায় অনুবাদ করারও পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

রুমানা এখন ভ্যাঙ্কুভারে বসবাস করছেন তাঁর কন্যা আনুশেহকে নিয়ে। তিনি আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠান ও মানবাধিকার সংস্থায় কাজ করছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তা হিসেবে অংশ নিচ্ছেন। তাঁর মূল বার্তা হলো—বিশ্বের যেকোনো জায়গায় সহিংসতার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলা। TEDx, ইউনাইটেড নেশনস, গ্লোবাল উইমেনস ফোরাম—সবখানেই তিনি বলছেন, “নির্যাতনের কোনো জাত নেই, ধর্ম নেই। এটা শুধু অন্যায়ের আরেক রূপ।”

রুমানা মঞ্জুরের গল্প কেবল এক নারীর নয়—এটা সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়া এক প্রতিবাদ, এক আলোর যাত্রা। তাঁর জীবনে আছে অন্ধকার, কিন্তু আছে এক আশ্চর্য প্রভা, যা তাঁকে সাহস দেয়, অন্যদের জাগায়। এটাই এক সাহসিনীর আলো-আঁধারের গল্প।


Back to top button
🌐 Read in Your Language