ইসলাম

প্রযুক্তির দিক নির্দেশনায় ইসলাম

মহান আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি বা আশরাফুল মাখলুকাত মানুষ। মানুষকে আল্লাহ অনেক ভালোবেসে তৈরি করেছেন এবং তার সব ধরনের প্রয়োজনও মিটিয়েছেন। মাতৃগর্ভ থেকে শুরু করে পৃথিবীতে আসার পর মানুষ যা ভোগ করে সব আল্লাহর বিশেষ দান।

সুন্দর এই সৃষ্টি যখন পথভ্রষ্ট হয়ে যায়, তখন আল্লাহ তাদের সুপথে ফেরার জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী রাসূল প্রেরণ করেন। আর যে যুগে যে জিনিসটির প্রভাব বেশি ছিল সেই প্রভাবিত জিনিসটির প্রভার দূর করতে আল্লাহ তায়ালা নবী রাসূলদের মুজিযা বা অলৌকিক বিষয় দান করেছিলেন। তবে একেক নবীকে একেক ধরনের মুজিযা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিল।

যেমন, হজরত ঈসা (আ.) প্রেরিত হয়েছিলেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির যুগে। আল্লাহতায়ালা তাকে অলৌকিক চিকিৎসা ক্ষমতা দিয়েছিলেন। তিনি জন্মান্ধকে দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন করে তুলতে পারতেন।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, আমি জন্মান্ধ ও শ্বেত-কুষ্ঠ রোগীকে সুস্থ করে তুলি। আর আমি আল্লাহর হুকুমে মৃতকে জীবিত করে দেই। (আল ইমরান: ৪৯)।

হজরত মূসা (আ.) যখন নবী হিসেবে প্রেরিত হন তখন জাদু বিদ্যাচর্চার যুগ ছিল। আল্লাহতায়ালা তাকেও সেরকম মুজিযা দিয়েছেন। তিনি তার লাঠি মাটিতে ফেললে তা বিরাট অজগরে পরিণত হতো। বগলের নিচ থেকে হাত বের করলে তা প্রদীপ্ত ও উজ্জ্বল হয়ে যেত।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে এরশাদ হচ্ছে, তিনি তার লাঠি ফেললেন। তৎক্ষণাৎ জলজ্যান্ত অজগরে রূপান্তরিত হল। আর নিজের হাত বের করলেন, সঙ্গে সঙ্গে তা দর্শকদের চোখে ধবধবে উজ্জ্বল দেখাতে লাগল। (আরাফ ১০৮-৯)।

হজরত মুহাম্মদ (সা.) আরবে সাহিত্যচর্চার যুগে রাসূল হিসেবে আবির্ভূত হন। আল্লাহতায়ালা তাকে সর্বোৎকৃষ্ট মুজিযা হিসেবে দিয়েছেন আল কোরআনুল কারিম। এ কোরআন সর্বোচ্চমানের সমৃদ্ধ সাহিত্য। অলংকার শাস্ত্রের বিবেচনায় অতুঙ্গ শৃঙ্গে তার অবস্থান। মানুষের পক্ষে এমনটি রচনা করা অসম্ভব।

আরও পড়ুন: জিহবার সংযত ব্যবহার মানুষকে শান্তিতে রাখে

পবিত্র কোরআনেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া হয়েছে, কোরআনে সবচেয়ে ছোট সূরার মতো একটি সূরা রচনা করো তো দেখি। আরবের নামিদামি সব কবি-সাহিত্যিকরা একত্রিত হয়েও সে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারেননি। কেয়ামত পর্যন্ত কেউ পারবেও না।

মহান আল্লাহতায়ালার এ অমোঘ নীতি থেকে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, সমকালীন বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে অবজ্ঞা অবহেলা নয়, সত্য ন্যায়ের পথে তার যথোচিত ব্যবহারই আল্লাহর নির্দেশ।

মহান আল্লাহ হজরত মুহাম্মদ (সা.)কে যে পবিত্র কোরআন দিয়ে পাঠিয়েছেন তার পুরোটাই বিজ্ঞানময়। কিয়ামত পর্যন্ত কোরআন মানুষের জন্য হেদায়েতের পথ প্রদর্শক। সর্বকালের বিজ্ঞানীদের জন্যও পথ নির্দেশক। পবিত্র কোরআনে কোরআন মানুষের জন্য হেদায়েতের পথ প্রদর্শক হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, কেয়ামত পর্যন্ত এ কোরআনের অত্যাশ্চর্য আবিষ্কার ও গবেষণা শেষ হবে না। পৃথিবীর বাস্তব ইতিহাস তার জ্বলন্ত সাক্ষী। পবিত্র কোরআনকে গবেষণার মূল প্রতিপাদ্য বানিয়ে এ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা অনেক বড় বড় আবিষ্কার করেছেন। সে সবের ফিরিস্তি ছোট পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব নয়।

হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অনেক মুজিযাই সম্পূর্ণ বিজ্ঞানময়। চন্দ্র বিদীর্ণকরণ ও মিরাজের ঘটনা তো বিজ্ঞানীদের অনেক গবেষণার দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছে। সে পথে তারা অনেক দূর সফলভাবে এগিয়েছেন। অন্য আরও অনেক মুজিযা নিয়ে গবেষণা করলেও তারা আবিষ্কারের পথ খুঁজে পাবেন। অন্যান্য নবী-রাসূলদের অনেক মুজিযার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

প্রকৃতপক্ষে পবিত্র কোরআন, হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও অন্য নবী-রাসূলদের অনেক মুজিযাই বিজ্ঞানের এমন উচ্চ শিখরে আরোহণ করেছে কেয়ামত পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে সে পথ আরও প্রসস্ত করবেন।

আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছায় হজরত ঈসা (আ.) যেভাবে নিমেষেই জন্মান্ধ ও শ্বেত কুষ্ঠ রোগীকে সুস্থ করে তুলতেন বিজ্ঞানীদের পক্ষেও হয়তো একদিন তা করা সম্ভব হবে।

হজরত মুহাম্মদ (সা.) যেভাবে অতি সামান্য সময়ে বাইতুল্লাহ থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস এবং সেখান থেকে ঊর্ধ্ব থেকে ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ করে আবার বহাল তবিয়তে ফিরে এসেছেন, বিজ্ঞানীরা তাও হয়তো একদিন করতে পারবেন। ইসলাম কখনও বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে অবজ্ঞা করেনি। বরং সেদিকে পথ প্রদর্শন করেছে। যুগের বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে ইসলামের কাজে ব্যবহার করতে শিখিয়েছে, হজরত মুহম্মদ (সা.) এ ব্যাপারে একটি উদার অসংকোচ ঘোষণা দিয়েছেন। তোমাদের পার্থিব বিষয়ে বরং তোমরাই ভালো জান। সভ্য-শালীন জনকল্যাণকর যে কোনো আবিষ্কার এবং তার সঠিক ন্যায়ানুগ ব্যবহার অনুমোদন করা হয়েছে ইসলামে।

বর্তমান বিশ্বের বিজ্ঞান প্রযুক্তির গগণচুম্বী উন্নতির প্রতিও তিনি ইঙ্গিত করে গেছেন। সেকালের আরব কবি তুরকার একটি পঙ্ক্তি তিনি মাঝে মধ্যেই আবৃত্তি করতেন। যার অর্থটা এমন, যুগ-জামানা তোমার সামনে এমন সব বিষয় প্রকাশ করে দেবে যা সম্পর্কে তুমি অজ্ঞ ছিলে। এমন লোক তোমার কাছে সংবাদ নিয়ে আসবে যাকে তুমি কোনো মজুরি দাওনি।

সময়টা এখন প্রযুক্তির, কী ব্যক্তি জীবন, কী জাতীয় জীবন, প্রযুক্তি ছাড়া ভাবাই যায় না। ভাবছেও না কেউ। বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে কে কতটুকু আঁকড়ে ধরবেন সে প্রতিযোগিতা আজ সর্বত্র। ইউরোপ, আমেরিকা থেকে শুরু করে এশিয়ার জীর্ণ কুটিরেও এখন প্রযুক্তির ছোঁয়া। নতুন এ মিলেনিয়ামে প্রযুক্তি যেন মানব জীবনের সবটুকু দায়িত্বভার নিজের কাঁধে নিয়ে নিয়েছে। প্রযুক্তিকে অস্বীকার করলে প্রযুক্তি থেকে পিছিয়ে থাকলে ছিটকে পড়তে হবে সময় থেকে, মানে জীবন থেকে।

ব্যক্তিগত বিষয়, চিকিৎসা, পড়ালেখা, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিসিয়াল কার্যক্রম, যোগাযোগ, সংবাদ আদান-প্রদান, বিনোদন- সবই এখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর। প্রয়োজনের সব ক্ষেত্রে বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে আবার বিজ্ঞানের আবিষ্কারের প্রতি বিষোদ্গার করা স্ববিরোধিতা বৈ কিছুই নয়।

অনলাইনে আজ কি হচ্ছে না। চিকিৎসা, যোগাযোগ, গবেষণা, ব্যবসা-বাণিজ্য সবই এখন অনলাইনে হচ্ছে। ইসলাম প্রচারের সব কাজও অনলাইনে হতে পারে। হচ্ছে না যে তাও কিন্তু নয়। হচ্ছে। তবে প্রয়োজনের ও অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।

নোংরা, অশ্লীল কাজে বিজ্ঞান প্রযুক্তির অপব্যবহার হচ্ছে বলে অনেক সভ্য, সুশীল সমাজ ও ওলামায়েকেরাম পুরো বিজ্ঞান প্রযুক্তিকেই অগ্রাহ্য করছেন। কিন্তু এটা তো একটা প্রান্তিকতা। মানুষের ব্যবহারের গুণে বা দোষে বিজ্ঞান আশীর্বাদ বা অভিশাপ হতে পারে। বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে মহৎ কাজে, মানবতার কল্যাণে যেন ব্যবহার করা হয় সেদিকে আলেম সমাজ ও সুশীল সমাজকে সদা সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

হিরোশিমা, নাগাসাকিতে আণবিক শক্তি যে ধ্বংসলীলা ঘটিয়েছিল তার মাধ্যমে মানুষের প্রভূত কল্যাণ সাধন সম্ভব ছিল। বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে যে ধ্বংসযজ্ঞ, বিপর্যয়, অকল্যাণ এবং সভ্যতার বিনির্মাণ ও কল্যাণকর বিষয় উভয়বিধ কাজেই ব্যবহার করা যায় তা পবিত্র কোরআনেই উল্লেখ রয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, আমি নাযিল করেছি লৌহ। যাতে রয়েছে প্রচণ্ড রণশক্তি ও মানুষের কল্যাণ। (সূরা হাদীদ: ২৫)। এখন দেখার বিষয়, বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে মানবতার সার্বিক কল্যাণে সদ্ব্যবহার করে আমরা এগিয়ে যাব নাকি অকল্যাণ, অশ্লীলতা বেহায়াপনা ও ধ্বংসযজ্ঞে অপব্যবহার করে বিপর্যয় ডেকে আনব, নাকি পুরো বিজ্ঞানকেই অশ্লীলতার বাহন বলে পিছিয়েই থাকব। পৃথিবী কিন্তু প্রতিনিয়ত এগিয়েই চলেছে। আমরা পিছিয়ে থাকলেও পৃথিবী কিন্তু পিছিয়ে থাকবে না।

এন এইচ, ১৩ অক্টোবর

Back to top button