
একটা সময় ছিল, যখন অপরাধ মানেই ছিল খুন, ডাকাতি কিংবা বড় কোনো বেআইনি কাণ্ড। এখন কেউ ফুটপাথে থুথু ফেললেই হয়ে যেতে পারে ‘ক্রিমিনাল’! কেউ কফির কাপ ছুঁড়ে দিল রাস্তায়, কেউ পাবলিক টয়লেট না পেয়ে গাছের গোড়ায় একটু স্বস্তি খুঁজতেই হাজির হলো পুলিশ। হতে হবে জেল, জরিমানার মুখোমুখি।
একটি শহর ঠিক যেন এক নিঃশব্দ পাঠশালা। যেখানে নাগরিকদের আচরণই তার পাঠ্যবই, রাস্তাঘাট তার সিলেবাস, আর ধৈর্য-নম্রতাই তার শিক্ষকের মতো। কেউ পড়ে গেলে তাকে কেউ টেনে তোলে, আবার কেউ রাগে চেঁচিয়ে ওঠে—শহর শোনে, বোঝে, মনে রাখে। শহরের সৌন্দর্য শুধু তার স্থাপত্যে নয়, বরং বাসিন্দাদের অভ্যাসে, ব্যবহার ও নৈতিকতায়।
প্রতিদিন সকালবেলা যখন কেউ ঘুমভাঙা হাই তুলতে তুলতে কফির কাপ হাতে শহরে নামে- সে জানে না, তার অসাবধানতাবশতঃ একটি কাজ হয়তো তাকে সমাজের চোখে অপরাধী করে তুলবে। থুথু ফেলা, টিস্যু ছুঁড়ে দেওয়া, যেখানে সেখানে প্রসাব করা, উচ্চস্বরে চিৎকার করা, বা কাউকে লক্ষ্য করে অশালীন গালি ছুঁড়ে দেওয়া এসব আমাদের কাছে ছোট অভ্যাস, অথচ শহরের জন্য এগুলো মারাত্মক ব্যাধি।
অতি সম্প্রতি একটি ভিডিও (সংযুক্ত) সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যায় লন্ডনের একটি ফুটপাতে এক মধ্যবয়সী বাঙালি ভদ্রলোক হাঁটছিলেন। হঠাৎ তিনি অভ্যাসবশতঃ থুথু ফেলেন মাটিতে। অদূরে গাড়িতে বসে ছিল স্থানীয় কাউন্সিল অফিসার। তাদের চোখের সামনে ঘটে ঘটনাটি। আর যায় কোথায়?
একজন ইউনিফর্মধারী ব্যক্তি এগিয়ে এসে বললেন,
-Sir, you’ve committed a public offence.
-For what?
-For spitting in a public space. Here’s your £120 fine notice.

১২০ পাউন্ডের টিকিট তার হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়। ১০ দিনের ভেতর জরিমানার অর্থ পরিশোধ করতে হবে। ১৪ দিন পার হয়ে গেলে দিতে হবে ১৮০ পাউন্ড, আর কোর্টে গেলে জরিমানা হবে ২০০০ পাউন্ড।
ভদ্রলোক স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তার মুখে লজ্জা, চোখে বিস্ময়। একটুকুন থুথুর এত দাম হতে পারে, তা বোধহয় জীবনে ভাবেননি।
ভাইরাল সেই ভিডিও
লন্ডনে এ ধরনের অপরাধকে ‘Fixed Penalty Notice’ (FPN) এর আওতায় ফেলা হয়। কেউ থুথু ফেললে জরিমানা হতে পারে ৮০ থেকে ১৫০ পাউন্ড পর্যন্ত। না দিলে বিষয়টি গড়ায় ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট পর্যন্ত, যেখানে জরিমানা দাঁড়াতে পারে ২৫০০ পাউন্ড পর্যন্ত।
নিউইয়র্ক শহরে এক বাঙালি সাবওয়ের প্ল্যাটফর্মে ফোনে কথা বলছিলেন। এমন উচ্চস্বরে কথা বলতে বলতে গালি দিচ্ছিলেন আর হুমকি দিচ্ছিলেন যে পাশের যাত্রীদের অনেকেই কানে হেডফোন গুঁজেও শান্তি পাচ্ছিল না।
কেউ একজন পুলিশ কল করলে একজন অফিসার এসে বললেন, -‘Verbal abuse in a public place. That’s $250 fine’. বাঙালি ভদ্রলোক বললেন, আমি আমার স্ত্রীর সাথে কথা বলছিলাম…। পুলিশ কোনো দয়া দেখালো না। উপরন্ত বললো- তুমি কথা বলোনি, করেছিলে চিৎকার!
নিউইয়র্কে ‘Public Nuisance’, ‘Disorderly Conduct’, এবং ‘Offensive Language’ আইনের আওতায় এসব অপরাধে জরিমানা হয় $৫০ থেকে $১০০০ পর্যন্ত। অনেক ক্ষেত্রেই আদালতে হাজিরা দিতে হয়।
২০১৯ সালে টরন্টোর এক রাস্তায় এক ছাত্র কফি শেষ করে বরফের ওপর ফেলে দিল কাপটা। পাশের এক কানাডিয়ান ভদ্রলোক বললেন,
-You dropped something.
-It’s empty.
-Still yours.
ছুটে এলো একজন TTC নিরাপত্তা কর্মী। হাতে ধরিয়ে দিলো $195 জরিমানার টিকিট। কারণ কফির কাপ ফেলা Bylaw Offense।
কানাডার বিভিন্ন শহরে পাবলিক প্লেসে ময়লা ফেলা, থুথু ফেলা, পাবলিক ইউরিনেশন, বা শব্দদূষণ—সবই আইনের আওতায় পড়ে।
যেমন: যেখানে সেখানে প্রস্রাব করলে $365 জরিমানা, পার্কে বা ফুটপাতে কুকুরের মল পরিষ্কার না করলে মালিককে $250 জরিমানা, পাবলিক প্লেসে ‘এফ’ ওয়ার্ড ব্যবহার করে কথা বললে জরিমানা, সর্বোপরি গালি বা চিৎকার করলে ‘Public Disturbance’ ধারায় জরিমানা দিতে হবে।
লন্ডনে, নিউইয়র্কে এবং টরন্টোতে পাবলিক প্লেসে মূত্রত্যাগ করলে জরিমানা থেকে শুরু করে হাজতবাস পর্যন্ত হতে পারে।
এশিয়ার অন্যতম কঠোর আইনশৃঙ্খলা দেশের মধ্যে সিঙ্গাপুরে চুইংগামও শাস্তির যোগ্য অপরাধ। ১৯৯২ সালে সিঙ্গাপুরে চুইংগাম বিক্রি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়, কারণ এটি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ও ভবনের দরজায় আটকে যেত। শাস্তি: প্রথমবার $১,০০০ SGD জরিমানা, দ্বিতীয়বারে কারাদণ্ডের সম্ভাবনা! থুথু ফেললে জরিমানা $1000 SGD, দ্বিতীয়বারে ‘Corrective Work Order’, মানে জনসমক্ষে শহর পরিষ্কার করা; কফির কাপ, টিস্যু, চুইংগাম ফেলা—সবই কঠিন শাস্তিযোগ্য। অনেক বাংলাদেশিকে এ দেশটিতে এসব কারনে জরিমানা গুণতে হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে একই আইন বলবৎ রয়েছে। দুবাইয়ে এক যুবক পার্কের এক কোণে মুত্রত্যাগ করতে গিয়ে পুলিশের কবলে পড়ে। অভিযোগ: ‘Public Indecency’। জরিমানা: ৫০০ দিরহাম; পরদিন তাকে কোর্টে হাজিরা দিতে বলা হয়।
টোকিওর ট্রেনে ফোনে কথা বলা নিষেধ, এমনকি রিংটোনও ‘সাইলেন্ট’ মোডে রাখতে হয়। উচ্চস্বরে কথা বললে লোকজন তাকায়—আইন না থাকলেও সামাজিক চাপ কাজ করে।
এসবের পাশাপাশি আরো কিছু “নীরব” অপরাধের জন্য বিভিন্ন শহরে জরিমানা ও শাস্তির বিধান রয়েছে।
ট্রেনে বা বাসে পা তুলে বসলে, প্লাস্টিকের বোতল ফেললে, সংরক্ষিত সাইন লেখা এলাকায় ধূমপান করলে জরিমানা ও হাজত বাস দুটোই কপালে জুটে যেতে পারে।
প্রতিটি শহর তার নাগরিকদের মতোই। কেউ শহরের সৌন্দর্য বজায় রাখে আচরণে, কেউ তা নষ্ট করে এক কাপ কফি বা এক গাল অশালীন শব্দে।
আমরা জানি না, একটুকুন থুথু কত মানুষের গা ঘিনঘিনে করে তোলে, কিংবা একটা টিস্যু পেপার কতটুকু দূষণ ছড়ায়। কিন্তু আইন জানে। শহর জানে। ক্যামেরা তো সব জানেই।
অনেক শহরে প্রকাশ্যে থুথু ফেলা ‘public nuisance’ তো বটেই, ‘public health hazard’ হিসেবেও গণ্য। একজন যে থুথু ফেলছে, সে নিজের শরীরের ভিতর থেকে একটা জীবাণুর সম্ভাব্য প্যাকেট ছেড়ে দিচ্ছে একটা জনসমাগমে। আপনি জানেন না, থুথু ফেলা সেই ব্যক্তির শরীরে কোনো রোগ আছে কি না। কিন্তু আপনার শিশুটি জানে না—হাঁটতে হাঁটতে কোথায় তার প্রিয় খেলনাটা পড়ে যাবে।
প্রতিটি শহরের হাঁটাপথে, ফুটপাথে, পার্কে, স্টেশনে থাকা মানুষের কিছু নৈতিক দায়িত্ব থাকে। হেঁটে চলার জায়গা যেন থুথু দিয়ে চিহ্নিত না হয়, এটাই তো সভ্যতার চিহ্ন। মানুষের অভ্যাস তার পরিচয়, আর পরিচয়ই গড়ে তোলে শহরের সম্মান। আসুন, আমরা সবাই সতর্ক হই, অন্যদেরকে সচেতন করে তুলি।









