
নিশ্ছিদ্র রাতের নিস্তব্ধতা যখন নিঃশব্দে ফিসফিস করে, ফিলাডেলফিয়ার আকাশ তখনও বোবা। জেগে থাকা শহরের গায়ে লেপ্টে থাকা হিমেল বাতাসে সেদিনও ভেসে আসছিল নিঃশব্দ কষ্ট, গোপন যন্ত্রণা।
মো. একরামুল হক—চট্টগ্রামের হামজারবাগ থেকে আসা এক সরলপ্রাণ মানুষ, যিনি দুই যুগ আগে স্বপ্নের দুনিয়া আমেরিকায় পা রেখেছিলেন। মাথা উঁচু করে বাঁচতেন, পরিশ্রম আর সংযম যার প্রধান সঙ্গী ছিল। দিনরাত খেটে তৈরি করেছিলেন নিজের একটি ছোট্ট ঠিকানা, যেখানে ইট-কাঠের ভেতরে ছিল তাঁর পরিশ্রমের ঘাম, নীরব চোখের জল আর প্রবাসে একাকীত্বের দীর্ঘশ্বাস।
২০২৪ সালের জানুয়ারির ২০ তারিখ, শনিবার রাত। বাইরে তুষারপাত থেমেছে, চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা। গভীর রাত একটার দিকে ফিলাডেলফিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরেন একরামুল হক। কাজ শেষে পরনে এখনও ইউনিফর্মের ছাপ, হাতে ব্যাগ—অফুরন্ত পরিশ্রমের আরেক দিন পার করে অবশেষে নিজের স্বস্তির কোণে ফিরেছেন।
কিন্তু সেদিনের রাতটা আর ছিল না আগের মতো। তিন মাস ধরে ভাড়ার টাকা না দেওয়া হন্ডুরাস বংশোদ্ভূত কার্লোস নামের ভাড়াটিয়াকে মুখোমুখি হতে হয় একরামকে। হয়তো ক্লান্ত শরীর আর শীতল রাতের নীরবতা তাঁকে একটু সাহসী করে তুলেছিল, হয়তো তিনি ভাবেননি ঝিমিয়ে পড়া কার্লোস এমন হিংস্র হবে।
কিন্তু বাস্তবতা যে কল্পনার চেয়েও নিষ্ঠুর। ঝগড়া শুরু হয় টাকার বিষয় নিয়ে, উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের এক পর্যায়ে কার্লোস হঠাৎ হাতের কাছে থাকা একটি ভারী হাতুড়ি তুলে নিয়ে একরামের মাথায় আঘাত করতে থাকে—একটি, দুটি, তিনটি… আর গুনে রাখা যায় না।
একরামের দেহ লুটিয়ে পড়ে ঘরের মেঝেতে। সারা রাত তিনি সেখানেই পড়ে থাকেন—নিঃসাড়, নিঃসঙ্গ। পাশের ঘরে থাকা আরেক ভাড়াটিয়া ডেভিড হয়তো শুনেছিলেন কিছু, হয়তো ভেবেছিলেন ‘তাদের মধ্যকার ব্যাপার’। অথবা তিনি ঘুমিয়েই ছিলেন। কিন্তু একরামের নিথর দেহকে আর কেউ টেনে তুলতে আসেনি।
ভোর সাতটায় প্রতিবেশীর ৯১১ এ কল। পুলিশ এসে দেখে ফেলে তুষার-আচ্ছাদিত বাড়ির ভেতরে জমে আছে মৃত্যু। একরাম আর নেই। রক্তে ভেজা তাঁর পোশাক, ছিন্ন মাথা, নিঃশব্দ মুখ—সব কিছু বলে দেয় এক নির্মম হত্যার গল্প।
পাশের ঘর থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে কার্লোসকে। তখনো তার চোখ লাল, মুখ থেকে আসে অ্যালকোহলের তীব্র গন্ধ। পুলিশ জানায়, সে ঘটনাকালে অত্যন্ত মদ্যপ ছিল। জিজ্ঞাসাবাদে সে আংশিকভাবে স্বীকার করে নেয় নিজের অপরাধ। পুলিশ জানায়, সে একজন পুরাতন অপরাধী, যার বিরুদ্ধে আগে থেকেই মাদক ও সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে।
২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখেন একরাম। প্রথমদিকে টিকে থাকার সংগ্রাম ছিল তীব্র। রাজনৈতিক কারণে তিনি অ্যাসাইলাম কেস ফাইল করেন এবং কয়েক বছরের মধ্যে ওয়ার্ক পারমিট পেয়ে যান। এরপর শুরু হয় তাঁর পরিশ্রমের পালা। কাজ করেন বিভিন্ন জায়গায়, অবশেষে ফিলাডেলফিয়া ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে হুইলচেয়ার সুপারভাইজার হিসেবে স্থায়ী হন।
কোনোদিন বিদেশি জীবনকে বিলাসিতা ভাবেননি একরাম। স্ত্রী জাহানারা বেগম এবং একমাত্র মেয়ে সুমাইয়ার (১৯) মুখের দিকে তাকিয়ে জীবন কাটিয়েছেন সৎভাবে। এতোগুলো বছর হয়ে গেছে দেশে ফিরতে পারেননি, কিন্তু ফোন করতেন প্রতিদিন। পাঠাতেন টাকা, মেয়ে বড় হোক, লেখাপড়া করুক—এই ছিল তাঁর স্বপ্ন।
গত বছর নিজের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে এনগোরা টেরাসে একটি তিন বেডরুমের বাড়ি কেনেন। নিজে থাকতেন একটিতে, বাকি দুটো ভাড়া দিতেন। কার্লোস ছিল তার ভাড়াটিয়াদের একজন—দেখতে শান্ত, কিন্তু ভিতরে আগুন জ্বলছিল।
কার্লোস রামোসকে প্রথম ডিগ্রি মার্ডারের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাস একরামের মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। যে মানুষটি দুদিন পর দেশে ফিরতে চেয়েছিলেন মেয়ের বিয়ের জন্য, তিনি এখন কফিনে ফিরছেন!
একটা মানুষ, যিনি দুই দশক প্রবাসে কাটিয়ে একটা বাড়ি কিনেছিলেন, স্বপ্ন দেখছিলেন, সেই মানুষটির মৃত্যু হলো এমন নির্মমভাবে।
ফিলাডেলফিয়ার শীতে বরফ পড়ে চলেছে। আর তার নিচে চাপা পড়ে আছে এক নিঃসঙ্গ মানুষ, যার মুখে ছিল হাসি, আর বুকে ছিল বাংলাদেশের ছবি।
চট্টগ্রামের হামজারবাগের সন্ধ্যায় এখন বাতাসে ভেসে আসে কান্না। কোনো এক বালিকা হয়তো আজও বাবার ছবি জড়িয়ে কাঁদছে, কোনো স্ত্রী হয়তো নীরবে অজস্র প্রশ্ন করছে আকাশের দিকে তাকিয়ে।









