সিলেটে নজরুল মিন্টোর ‘উত্তর আমেরিকা চালচিত্র’-এর প্রকাশনা অনুষ্ঠান

বই শুধু পৃষ্ঠার সমষ্টি নয়—তা সময়ের দলিল, অভিজ্ঞতার ছায়াচিত্র, অনুভবের মানচিত্র। আবার কিছু বই থাকে, যেগুলো পাঠককে কেবল গল্প শোনায় না, তাকে নিয়ে যায় জীবনের অভ্যন্তরে—ভাষা,সংস্কৃতি আর সমাজের আন্তরিক পরতে পরতে। এমনই এক বই উত্তর আমেরিকার চালচিত্র, যেখানে লেখক নজরুল মিন্টো রচনা করেছেন উত্তর আমেরিকার প্রেক্ষাপটে প্রবাসী জীবনের বর্ণময় ও বেদনাবিধুর আলেখ্য।
আজ শুক্রবার ৯ই মে ২০২৫ সিলেটের বাতিঘর বুক ক্যাফের আঙিনায় অনুষ্ঠিত হয় নজরুল মিন্টোর উত্তর আমেরিকার চালচিত্র গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসব। এ অনুষ্ঠানটিকে ঘিরে লেখক-পাঠকদের রীতিমত মিলনমেলা ঘটে। সাহিত্যিক কথোপকথনে, আবেগময় স্মৃতিচারণায়, ও হৃদয়গ্রাহী বিশ্লেষণে রূপ নিচ্ছিল এক স্মরণীয় প্রকাশনা উৎসব। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কবি, লেখক, গবেষক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদসহ বহু বিদগ্ধজন।

শুরুতেই গ্রন্থটি নিয়ে দুটি মূল্যায়নধর্মী প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কানাডার অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমীন এবং খ্যাতনামা রবীন্দ্রগবেষক মিহিরকান্তি চৌধুরী।

কবি ও গবেষক অপূর্ব শর্মার সঞ্চালনায় প্রকাশনা অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লেখক, শিক্ষাবিদ ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, প্রিন্সিপাল কবি কালাম আজাদ, ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ভাস্কর রঞ্জন দাশ।
ড. মোহাম্মদ আমীন বলেন, “বইটির শিরোনাম দেখে শুরুতে ভাবা যেতে পারে এটি ইতিহাসনির্ভর প্রবন্ধ সংকলন বা ভ্রমণকাহিনি। কিন্তু পাঠ শেষে বোঝা যায়, এটি একাধিক সাহিত্যিক ধারার সম্মিলনে রচিত অপূর্ব নান্দনিকতায় সজ্জিত একটি অনন্য জীবনীগ্রন্থ।”
রবীন্দ্রগবেষক মিহিরকান্তি চৌধুরী গ্রন্থটিকে অভিবাসী জীবনের এক ‘সার্বিক প্রতিধ্বনি’ আখ্যা দিয়ে বলেন, “বইটির প্রতিটি অধ্যায়ে উঠে এসেছে প্রবাস জীবনের টানাপড়েন, কর্মস্থলে জাতিগত পরিচয়ের দ্বন্দ্ব, সন্তানের ভবিষ্যৎ ভাবনা এবং আত্মীয়স্বজনহীন একাকিত্বের দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু লেখকের ভাষার সংবেদনশীলতা, অন্তর্দৃষ্টি ও রসবোধ এসব অভিজ্ঞতাকে রূপ দিয়েছে এক ভারসাম্যপূর্ণ সাহিত্যিক নির্মাণে।”

অধ্যক্ষ ভাস্কর রঞ্জন দাশ স্মরণ করিয়ে দেন নজরুল মিন্টোর কৈশোরকাল থেকে তার সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক সক্রিয়তার কথা। তিনি বলেন, “প্রবাসজীবনের ব্যস্ততা তাঁকে কলম থেকে বিরত করতে পারেনি।”

অধ্যক্ষ কবি কালাম আজাদ বলেন, “কারও স্বদেশ নেই, কারও বিদেশ নেই—এই দর্শনের বাস্তব রূপই যেন ফুটে উঠেছে মিন্টোর লেখনীতে। পৃথিবীকে যিনি স্বদেশ করে নিতে পারেন, সেই জ্ঞানীর প্রমাণ হয়ে উঠেছে এই বই।”

ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ বলেন, “লেখকের সমাজ বিশ্লেষণের মুন্সিয়ানা, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, দরিদ্র শিশু, যুদ্ধশিশু ও প্রবাসীদের প্রতি গভীর মানবিক দরদ বইটিকে করেছে আলাদা। বিশেষ করে ‘যুদ্ধশিশু’ শব্দটির প্রচলনে তাঁর ভূমিকাও প্রশংসার যোগ্য।”
শেষ পর্বে বক্তব্য রাখেন লেখক নিজে। তিনি জানান, উত্তর আমেরিকার চালচিত্র একটি ‘নন-ফিকশন ন্যারেটিভ’। বইটিতে তাঁর সাংবাদিকতা, সাহিত্য এবং প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা সংলগ্ন হয়ে উঠেছে অনন্য এক প্রামাণ্য কাহিনিরূপে। উপস্থিত পাঠকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি।
২৫৬ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে রয়েছে উত্তর আমেরিকার সমাজ, সংস্কৃতি, প্রকৃতি, অভিবাসন, ইতিহাস ও প্রবাসী জীবনের নানাদিক নিয়ে লেখা ৬৬টি বৈচিত্র্যময় প্রবন্ধ। বইটি শুধু তথ্যনির্ভর নয়—এটি এক হৃদয়স্পর্শী অভিজ্ঞতার বয়ান, যা পাঠকের মনে রেখে যায় দীর্ঘস্থায়ী দাগ।

উত্তর আমেরিকার চালচিত্র প্রকাশ করেছে ‘অভ্র প্রকাশন’। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি হাসিনা বেগম চৌধুরী, কবি পুলিন রায়, ছড়াকার বিধু ভূষণ ভট্টাচার্য, সাংবাদিক রিয়াজ উদ্দিন ইসকা, লেখক হাবিব আহমদ দত্ত চৌধুরী, কবি ধ্রুব গৌতম, কবি মনিরুল টিটো, কাশমির রেজা, সিরাজ উদ্দিন শিরুল, মাসুদা সিদ্দিকা রুহী ও রওশন আরা বাসি প্রমুখ।













