সম্পাদকের পাতা

গ্রাহাম বেলের টেলিফোননামা

নজরুল মিন্টো

পৃথিবীতে যত বিস্ময়ের জন্ম হয়েছে, তার অনেকগুলোর পেছনে রয়েছে মানুষের কথা বলার তীব্র আকাঙ্খা। যতটা না প্রযুক্তি, তার চেয়েও বেশি এটি ছিল মানবিক সংযোগের এক অনবদ্য প্রয়াস। দূরের মানুষকে কাছে টানার, হৃদয়ের কথা এক সেকেন্ডেই পৌঁছে দেওয়ার এই যন্ত্র বদলে দিয়েছে সভ্যতার গতি। যন্ত্রটির নাম টেলিফোন। এক বিস্ময়কর আবিষ্কার।

গল্পের শুরুটা হয়েছিল ১৮৭৬ সালে, কানাডায়। আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল নামের এক গবেষক হঠাৎ বলে ওঠেন, “Mr. Watson, come here, I want to see you.” তাঁর সহকারী টমাস ওয়াটসনের দিকে এই প্রথমবারের মতো পাঠানো শব্দ পৌঁছে যায় তারের মাধ্যমে। এ ছিল ইতিহাসের প্রথম টেলিফোন কল- মানব যোগাযোগের এক নতুন যুগের সূচনা।

সেই যন্ত্রটি আজকের তুলনায় ছিল অতি সাদামাটা। কিন্তু তার মধ্যেই ছিল ভবিষ্যতের ছায়া। টেলিফোনের তারে বাধা হলো পৃথিবীর দিগন্ত। সময়ের সাথে সাথে এ যন্ত্রটি বদলাতে থাকে। ১৮৯১ সালে এল রোটারি ডায়াল। ১৯৬৩ সালে বোতামচাপা টাচ-টোন ফোন। কিন্তু বড় ঢেউ এলো ১৯৭৩ সালে। ড. মার্টিন কুপার, মটোরোলার বিজ্ঞানী, হাতে ধরলেন এক অদ্ভুত বাক্স- মোবাইল ফোন! রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতেই ফোন করলেন। তখনও কেউ ভাবতে পারেনি, এই ছোট বাক্স একদিন কোটি মানুষের হাতের মণি হয়ে উঠবে।

১৯৯২ সালে পাঠানো হয় প্রথম SMS: “Merry Christmas.” তারপর তো ইতিহাস- ২০০৭ সালে iPhone এসে সবকিছুর ধারণা বদলে দেয়। আজ স্মার্টফোন আমাদের বন্ধু, ক্যামেরাম্যান, এমনকি চিকিৎসকের মতো পাশে থাকে।

২০২৪ সালের তথ্য অনুসারে, বিশ্বে প্রায় ৫.৬ বিলিয়ন মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০%। এর মধ্যে প্রায় ৪.৮ বিলিয়ন মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহারকারী। তবে সক্রিয় মোবাইল সংযোগ বা সাবস্ক্রিপশন সংখ্যা ৮.৫ বিলিয়নের বেশি, কারণ অনেকেই একাধিক সিম বা ডিভাইস ব্যবহার করেন।

সেই আদিম টেলিফোনেই একদিন গ্রাহাম বলেছিলেন, “আমি তোমাকে চাই।” আজ সেই চাওয়া অনেক রকম। কেউ চায় সাহায্য, কেউ নিরাপত্তা। আর তাই তৈরি হয়েছে ‘জরুরি কল’ নম্বর।

১৯৩৭ সালে ব্রিটেনে চালু হয় ৯৯৯। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৬৮ সালে চালু হয় ৯১১। কানাডায় প্রথম ৯৯৯ চালু হয় উইনিপেগে ১৯৫৯ সালে, পরে ১৯৭২ সালে পরিবর্তন করে করা হয় ৯১১। তিনটি ডিজিট- কারণ সহজে মনে থাকে এবং এটি অন্য নম্বরের সঙ্গে মিশে না।

টরন্টোয় যেসব নম্বরে ডায়াল করে সেবা পাওয়া যায় সেগুলো হলো-কমিউনিটি সার্ভিসেস-২১১ (ডে কেয়ার সার্ভিস এবং নির্যাতিতা নারীদের সহযোগিতার জন্য সপ্তাহের সাতদিন ২৪ ঘন্টা এ নম্বরটির মাধ্যমে সেবা দেয়া হচ্ছে)।

ডাইরেক্টরী সহযোগিতার জন্য ৪১১, যারা কানে কম শুনতে পান তাদের জন্য ৫১১, সর্বশেষ ৩১১ নম্বরটি টরন্টোসহ পাঁচটি নগরীর (টরন্টো, ক্যালগ্যারি, হ্যালিফ্যাক্স, গাটিনিউ এবং হালটন অঞ্চল) নন-ইমার্জেন্সী সার্ভিসেস-এর জন্য যোগ হয়েছে।

রাস্তার লাইট নষ্ট হয়ে গেছে, বেসমেন্ট-এ পানি ঢুকছে, গার্বেজ বিন উপচে পড়েছে, পানির লাইন ফেটে গিয়েছে, ম্যানহোলের ঢাকনা উধাও, পোষা প্রাণী হারিয়ে গেছে, রাস্তার ধারে বা বাড়ির সামনে পরিত্যক্ত গাড়ি পড়ে আছে, কোলাহল বা হট্টগোল, বাড়ির দেয়ালে লিখন বা পোস্টার লাগানো ইত্যাদি বিষয়ক অভিযোগ জানানোর জন্য এ নম্বরটি ব্যবহার হচ্ছে।

আগে এসব ব্যাপারে নাগরিকরা সাধারণত ৯১১ ডায়াল করতেন এবং এতে এই নম্বরটির উপর অতিরিক্ত চাপ পড়তো।

শিকাগো শহর ১৯৯৯ সাল থেকে ৩১১ ব্যবহারে এতটাই সাড়া ফেলেছিল যে হার্ভার্ড থেকে পুরস্কারও পেয়েছে। ৫০০+ ধরনের সেবা এক নম্বরে- যেন এক ম্যাজিক!

আজ ব্লুটুথ ছাড়া কি ভাবা যায়? অনেকেই রাস্তায় হেঁটে বা গাড়ি চালাতে চালাতে কথা বলেন। কিন্তু এ যেন আনন্দ ও বিপদের দুই সীমানা। অন্টারিও সরকার নতুন আইন করেছেÑ গাড়ি চালানোর সময় ফোনে কথা, টেক্সট বা ইমেইলÑ সবই নিষিদ্ধ। ধরা পড়লে জরিমানা হতে পারে ৬১৫ ডলার পর্যন্ত, সঙ্গে ডিমেরিট পয়েন্ট এবং লাইসেন্স সাসপেনশনের শাস্তিও রয়েছে। আইন শুধু শাস্তি নয়, সচেতনতাও।

এই গল্পের শুরু এক ডাক দিয়ে। সেই ডাক ছড়িয়ে গেছে মহাকাশ পর্যন্ত। গ্রাহাম বেলের টেলিফোন এখন আর কেবল যন্ত্র নয়, তা হৃদয়ের সংযোগ। তারের মাঝে লুকিয়ে থাকা শব্দেরা আজ আমাদের জীবনের সুর হয়ে উঠেছে।

প্রতিদিন আমরা অসংখ্য কল করি- অফিসে, বাড়িতে, ভালোবাসার মানুষকে, বন্ধুকে। কখনো সে কল হয় অভিমান ভাঙানোর, কখনো আনন্দ ভাগাভাগির। এই যে প্রতিটি “হ্যালো”- তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে একশ বছরের বেশি সময়ের ইতিহাস।

টেলিফোনের এই গল্প চলবে, রূপ বদলাবে, প্রযুক্তি পাল্টাবে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের সংলাপ- সেটিই রয়ে যাবে অমলিন, অবিনাশী।


Back to top button
🌐 Read in Your Language