সম্পাদকের পাতা

নাজিয়ার অসমাপ্ত স্বপ্ন

নজরুল মিন্টো

মোহাম্মদ আনহার আলী ও নাজিয়া বেগম

পূর্ব লন্ডনের বো এলাকা। একটি পুড়তে থাকা শহরের হৃদয়, যেখানে বহু অভিবাসী আশ্রয় খুঁজেছে, স্বপ্ন গড়েছে, আবার সেই স্বপ্নই কোথাও ধুলোয় মিশে গেছে। ছোট ছোট টেরেসড হাউজ, দুপাশে রঙিন পর্দা টাঙানো জানালা; এখানে দিনের আলো এসে ছুঁয়ে যেত জানালার কাঁচ, আর সন্ধ্যায় কোনো মা তার মেয়েদেরকে গল্প শোনাতে বসতেন। এখানেই ছিল নাজিয়া বেগমের বাসস্থান।

এই অঞ্চলে গড়ে ওঠা বাংলাদেশি কমিউনিটি যেন ছোট এক টুকরো সিলেট। গ্রোসারি, মসজিদ, বাংলা স্কুল আর হালাল মাংসের দোকান-সবই মিশে আছে এই এলাকাবাসীর জীবনের ছন্দে। কিন্তু এই বাহ্যিক রঙের পেছনে অনেক অন্ধকারও জমে থাকে, যেগুলো কখনো প্রকাশ পায় না।

নাজিয়া ছিলেন এই কমিউনিটির এক সদা হাস্যোজ্জ্বল তরুণী। সদ্য কৈশোর পেরোনো এক মুখ, চোখে ভরপুর স্বপ্ন।
২০১৫ সালে তার বিয়ে হয় মোহাম্মদ আনহার আলীর সঙ্গে, যিনি তখন শিক্ষার্থী হিসেবে বাংলাদেশ থেকে এসে যুক্তরাজ্যে পা রাখেন। ঘরজামাই হিসেবে ওঠেন নাজিয়াদের বাসায়। আনহার ছিলেন গম্ভীর প্রকৃতির, আর নাজিয়া ছিলেন প্রাণবন্ত, স্বাধীনচেতা। দুজনের এই পার্থক্যই এক সময় অদৃশ্য শৃঙ্খলে রূপ নেয়।

বিয়ের কিছুদিন পরেই নাজিয়া বুঝতে পারেন, আনহার একজন অন্যরকম মানুষ। তার পোশাক, কথাবার্তা, চলাফেরা-সবকিছুতেই ছিল প্রশ্ন, সন্দেহ আর শাসনের ছায়া। ভালোবাসার জায়গাজুড়ে যেন শাসন, নিয়ন্ত্রণ আর দৃষ্টির অসহ্য ভার জমে উঠছিল। এই অসহনীয় নিয়ন্ত্রণের ভার আর যেন বইতে পারছিলেন না নাজিয়া। তিনি আনহারের কাছ থেকে মুক্তি পেতে চান। অর্থাৎ তালাক।

আনহার আলী অভিযোগ করেন, স্ত্রীকে ‘ঝাড়ফুঁক’ বা ‘এক্সরসিজম’ করতে হবে। স্ত্রী তালাক চেয়েছেন-এটুকু তার জন্য ছিল অমার্জনীয়। ২০১৭ সালের শেষনাগাদ তাদের সম্পর্ক চূড়ান্তভাবে ভেঙে পড়ে। আনহার বাড়ি ছেড়ে চলে যান।

২০১৬ সালে প্রথম কন্যার জন্ম, তারপর ২০১৮ সালে দ্বিতীয় কন্যা। অল্প বয়সে বিয়ে, দ্রুত গর্ভধারণ, ও একের পর এক সাংসারিক দায়িত্ব-নাজিয়ার জীবন যেন এক টান টান দড়ির ওপর দাঁড়িয়ে যাওয়া। তারপরও তার সন্তানেরা যেন মানুষ হয়ে উঠতে পারে-এটাই ছিল তার আরাধ্য।

নাজিয়া নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করছিলেন। মেয়েদের স্কুলে আনা-নেওয়া, বাসার সব কাজ সামলানো, আর স্থানীয় একটি কেয়ার হোমে পার্ট-টাইম কিচেন অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করে তিনি সংসার চালাতেন। প্রতিদিন সকালে মেয়েদের নাশতা বানিয়ে স্কুলে পাঠিয়ে নিজে কাজে যেতেন-সেখানে বৃদ্ধদের জন্য রান্না করতেন, থালা বাসন পরিষ্কার করতেন, মাঝে মাঝে হাসিমুখে কাউকে এক কাপ চা দিতেন। ক্লান্ত শরীর নিয়ে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে আবার মেয়েদের পড়াশোনা, খাওয়াদাওয়া সামলাতেন। সেই নিরলস পরিশ্রমের মাঝেও তিনি খুঁজছিলেন একটু সম্মান, একটু প্রশান্তি। কিন্তু আনহার এই পরিবর্তন মেনে নিতে পারেননি। তার চোখে এটি ছিল অবাধ্যতা ও অপমান।

২০১৮ সালের ২১ অক্টোবর। আনহার আলী সন্তানদের দেখার জন্য আসেন তার শ্বশুরবাড়ি। এসময় তিনি স্ত্রীকে বলেন-‘আমি তোমার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি।’ কিন্তু সেটি ছিল এক অভিনয়ের ভেতর চলা প্রতিশোধের সূচনা।

পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সেদিন সন্ধ্যায় যখন নাজিয়া ও তার দুই মেয়ে বাইরে ছিলো তখন চুপিচুপি ফ্লাটে ঢুকে আনহার লুকিয়ে থাকেন নাজিয়ার ঘরের আলমারিতে। তার হাতে ছিলে দুটি ছুরি, বৈদ্যুতিক তার, আর একটি ওড়না। দশ ঘণ্টা অপেক্ষার পর, যখন দুই শিশু ঘুমিয়ে পড়ে, তিনি বেরিয়ে এসে প্রথমে ঘুষি মারেন নাজিয়ার মাথায় ও পাঁজরে। তারপর ওড়না দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন নাজিয়াকে। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে যায়, ঘড়ির কাঁটা থমকে যায়।

একটা ভিডিও মেসেজ ঠিক তার আগে নাজিয়া পাঠিয়েছিলেন বোনকে-‘তুমি আমাকে আর দেখতে পাবে না।’ সেই ভিডিও এখন এক নীরব সাক্ষ্য-একজন নারীর শেষ আর্তনাদ।

তারপর আলী তার স্ত্রীর নিথর দেহটি একটি সাদা চাদর দিয়ে ঢেকে সন্তানদের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়েন। সকালে পুলিশের কাছে ফোন করে বলেন, ‘Hello. I accidentally strangled my wife with a scarf.’

পুলিশ তার বাড়িতে এসে দেখে তিনি সোফাতে বসে তখন চা খাচ্ছেন। তিনি নিজেই দেখিয়ে দেন স্ত্রীর নিথর দেহ। সাদা চাদরে ঢাকা সেই শরীরকে দেখে বোবা হয়ে যান সবাই।

খবর ছড়িয়ে পড়ে পূর্বলন্ডনের বাংলাদেশি পাড়ায়। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই স্তম্ভিত। এক প্রতিবেশী বলেন, ‘নাজিয়া তো সেই মেয়ে, যে সবার জন্য দোয়া করতো। নিজের জন্য কিছু চাইতো না। মায়া ছিল তার চোখে, সাহস ছিল তার কণ্ঠে।’

নাজিয়া ছিলেন একজন স্বপ্নবতী মা। তিনি প্রতিদিন মেয়েদের নিয়ে পরিকল্পনা করতেন-‘একজন ডাক্তার হবে, আরেকজন লেখক। তিনি মেয়েদের রাতের ঘুমে চুলে বিলি কেটে কেটে বলতেন, ‘তোমরা চিন্তা করোনা, মা আছি পাশে।’

নাজিয়া বেগম হত্যার পরপরই লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের হোমিসাইড ও মেজর ক্রাইম কমান্ড বিভাগ তদন্ত শুরু করে। আনহার আলীকে গ্রেপ্তার করা হয় ঘটনাস্থল থেকেই, যেখানে তিনি নিজের অপরাধ স্বীকার করে বলেন, ‘আমি ভুল করে আমার স্ত্রীকে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে হত্যা করেছি।’

২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে শুরু হয় এই চাঞ্চল্যকর মামলার বিচারকার্য। স্থান: ঐতিহাসিক ওল্ড বেইলি আদালত। জনাকীর্ণ কোর্টরুমে যখন আনহার আলী কাঠগড়ায় দাঁড়ান, তখন এক ভয়ার্ত নীরবতা নেমে আসে। আদালতের দেয়ালে যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল এক বাঙালি নারীর অপ্রকাশিত কান্না।

আনহার আলী দাবি করেন তিনি ইচ্ছাকৃত হত্যা করেননি। কিন্তু প্রসিকিউশন পক্ষ তার পূর্বপরিকল্পিত লুকিয়ে থাকা, অস্ত্র ও গলায় প্যাঁচানো ওড়না, এবং হত্যার পর শান্তভাবে চা খাওয়া ইত্যাদি প্রমাণ তুলে ধরে বলেন-‘এটা ছিল এক নির্মম ও উদ্দেশ্যমূলক খুন।’ ২০১৯ সালের ১৭ এপ্রিল আনহার আলীকে ২৬ বছরের কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়।

নাজিয়ার মা জানাহারা বেগম বলেন: ‘আমার নাতনিরা প্রতিদিন জিজ্ঞেস করে, ‘মা কবে বেহেশত থেকে ফিরে আসবে?’ আমি কীভাবে বোঝাব-তাদের মা আর কখনো আসবে না?’ ‘আমি তো এই ছেলেকে ঘরে এনেছিলাম, জামাই করে-সে-ই আমার মেয়েকে খুন করলো!’

নাজিয়ার হত্যাকান্ড ও এই মামলার খবর প্রকাশ পায় ব্রিটেনের প্রধান সব সংবাদমাধ্যমে-BBC, The Guardian, Daily Mail, সহ দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায়ের স্থানীয় পত্রপত্রিকায়।

পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশী এবং সাধারণ মানুষ এই ঘটনায় সোচ্চার হন। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে #JusticeForNazia হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে প্রতিবাদ জানান।

একদিন পূর্ব-লন্ডনের সেই খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে, নাজিয়া মেয়েদের বলেছিলেন-‘তোমরা একদিন নিজেকে নিয়ে গর্ব করবে।’ আজ সেই মায়ামাখা কথাগুলো ঘরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়-নীরবে, অবিরাম।


Back to top button
🌐 Read in Your Language