সম্পাদকের পাতা

মাহমুদা খাতুন ও আমিন মিয়ার একটি অসমাপ্ত সংসার

নজরুল মিন্টো

আমিন মিয়ার বিয়ের দিনের ছবি

লন্ডনের আকাশ তখন ধূসর। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ভিজিয়ে দিচ্ছে ইতিহাসের দেয়াল, ইট-বালির শহরের নীরবতা যেন কিছু-একটা বলে দিতে চাইছে। পূর্ব-লন্ডনের বেথনাল গ্রিনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সাদামাটা ফ্ল্যাটে, কয়েক বছর আগেও ছিল একটি নতুন জীবনের স্বপ্ন-দু’জন মানুষের মিলনের গল্প। কিন্তু সেই স্বপ্ন শেষ হয় এক ছুরির আঘাতে।

বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া মাহমুদা খাতুনের দেশের বাড়ি ছিল সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলায়। মাত্র ছয় বছর বয়সে তাঁর পরিবার যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমায়। পরিবারে বাবা-মা ছাড়াও ছিল দুই ছোট ভাই, যারা ব্রিটেনে জন্মেছে এবং পশ্চিমা জীবনধারায় বেড়ে উঠেছে। মাহমুদার শৈশব কেটেছে পূর্ব-লন্ডনের বাঙালি অভিবাসী সমাজে, যেখানে একদিকে ছিল বাঙালিয়ানা আর পারিবারিক সম্মান-অন্যদিকে ছিল পাশ্চাত্য জীবন। তিনি ছিলেন ঠিক মাঝখানে-একটি পা পূর্বে, আরেকটি পশ্চিমে।

২১ বছর বয়সে মাহমুদাকে পরিবারের পছন্দে বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগে বিচ্ছেদ ঘটে। ২০০৪ সালে ডিভোর্সের পর শুরু হয় তাঁর স্বাধীন জীবন। অপটিশিয়ানের দোকানে কাজ, নিজের ফ্ল্যাটে থাকা, বন্ধুদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা-সব মিলিয়ে তিনি খুঁজে পেতে থাকেন নিজস্ব এক পরিচয়।

এই সময়েই এক সহকর্মীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। হুসেইন ছিলেন এক বাংলাদেশি যুবক, যিনি পশ্চিমা চিন্তাধারায় বিশ্বাসী। তাঁদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে খুব স্বাভাবিকভাবে-কাজের ফাঁকে ফিসফিসে গল্প, একসাথে কফি, চোখে চোখ রাখা। হুসেইনের সঙ্গে মাহমুদার প্রেম তখন তুঙ্গে। কিন্তু পরিবার চায় ভিন্নকিছু।

মাহমুদা খাতুনের কল্পিত ছবি

বাবা-মা চেয়েছিলেন ‘ভদ্রঘরের পাত্র’। মাহমুদা বহু অনুরোধেও ব্যর্থ হয়ে একদিন হুসেইনকে বলেছিল, ‘তুমি কি আমায় নিয়ে পালাবে?’ হুসেইন নীরব ছিল। সমাজের রোষে সে ভীত। মাহমুদার অনুরোধে তার নীরবতা তার ভেতরের দ্বিধা ও দুর্বলতার প্রকাশ ঘটায়। এদিকে মাহমুদার জীবনে পরিবারের ইচ্ছা হয়ে উঠেছিল এক অদৃশ্য শৃঙ্খল, যা তাকে নিজের পছন্দের বিরুদ্ধে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। অবশেষে ২০০৭ সালের জুলাই মাসে মুহাম্মদ আমিন মিয়ার সাথে তার বিয়ে হয়ে যায়।

মুহাম্মদ আমিন মিয়ার শিকড় ছিল সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার এক গ্রামে। তাঁর বাবা ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, মা গৃহিণী। দুই ভাই প্রবাসে থাকেন, বোন আছে দেশে। লন্ডনে আসার পর তিনি রেস্টুরেন্টের চাকরি নেন। শান্তশিষ্ট, পরিশ্রমী এই মানুষটির স্বপ্ন ছিল খুবই সাধারণ-একটি ঘর, একজন সঙ্গিনী, একটু শান্তি।

আমিন মিয়ার দুঃখের কথা, কষ্টের কথা বলার জায়গা ছিল না। তিনি স্থানীয় মসজিদের ইমাম শেখ সাঈদের কাছে একদিন তাঁর দাম্পত্য জীবনের কষ্টের কথা বলেছিলেন-যেখানে বিয়ের শরিয়তি বন্ধন ছিল, কিন্তু কোনো হৃদ্যতা ছিল না। তিনি জানান, তাঁর স্ত্রী তাঁকে স্পর্শ করেন না, তার সাথে একসাথে খেতে চান না, এমনকি একই সোফাতেও বসেন না।

২০০৭ সালের ৯ আগস্ট। এদিন মুহাম্মদ আমিন মিয়ার ২৮তম জন্মদিন। মাহমুদা একটি বোরখা পরে ফ্ল্যাটে আসেন-যা তাঁর জন্য অস্বাভাবিক পোশাক। বোরখার নিচে লুকিয়ে নিয়ে আসেন একটি ধারালো ছুরি। সিসিটিভির চোখ যেন তাঁকে চিনতে না পারে, প্রতিবেশীরাও যেন ঠাহর না করতে পারে সেজন্যে তিনি এ বেশ ধারণ করেন।

দরজা খোলেন মুহাম্মদ আমিন। তাঁর জন্য সেটি হয় জীবনের শেষ দরজা। ঠিক বুকবরাবর ছুরিকাঘাত। একবারেই। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ঘটনাস্থলেই।

জানা যায়, মাহমুদা ঘটনার পর পুলিশের কাছে ফোন করে জানান যে তিনি দরজায় তালা দেখতে পান এবং চিঠিপত্রের খোপ দিয়ে রক্ত দেখতে পান। তিনি বলেন, তিনি বাইরে ছিলেন, লিভারপুল স্ট্রিটে এক রেস্টুরেন্টে ছিলেন, বন্ধুর সঙ্গে দেখা করেছেন, মাকে ফোন করেছেন। কিন্তু মোবাইল ফোন রেকর্ড তাঁর গল্পকে মিথ্যে প্রমাণ করে।

তদন্তকারীরা দেখেন, বিয়ের আগের দুই সপ্তাহে মাহমুদা এবং তাঁর প্রেমিক হুসেইনের মধ্যে হয়েছিল ১৬৬টি কল ও মেসেজ-প্রায় প্রতিদিন ১০ বার। এমনকি বিয়ের দিন এবং হানিমুনের সময়ও তিনি প্রেমিকের সাথে যোগাযোগ রেখেছেন।

ওল্ড বেইলির কোর্টরুমে দাঁড়িয়ে মাহমুদা বলেন, এই হত্যাকান্ড একটি দুর্ঘটনা। ঝগড়ার সময় স্বামীকে ছাড়তে চাইছিলেন, তখন ‘দুর্ঘটনাবশত’ ছুরিকাঘাত হয়।

কিন্তু বিচারক ব্রায়ান বার্কার তাঁর বক্তব্য মানেননি। তিনি বলেন: ‘তোমার বক্তব্যের কোনো যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা নেই। তুমি নিজের স্বামীকে হত্যা করেছ, আর নিজেকেও ধ্বংস করেছ। এই পরিকল্পনায় আমি কোনো দুর্ঘটনার আভাস পাই না। বরং আমি দেখি এক নির্মমতা।’
২০০৮ সালে মাহমুদাকে আজীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়। কমপক্ষে ১৭ বছর কারাভোগের নির্দেশ দেওয়া হয়।

২০১০ সালে মাহমুদার আইনজীবী ব্যারিস্টার কিম হলিস কিউসি লন্ডনের আপিল কোর্টে বলেন, এটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যা ছিল না, বরং এটি মানসিক চাপের ফলাফল। মেয়েটাকে জোর করে বিয়ে দিয়েছিল ওর বাবা-মা। দাবি করা হয়, এটি অনিচ্ছাকৃত হত্যা। কিন্তু আদালত এই আপিল প্রত্যাখ্যান করে। সাজাও বহাল থাকে।

স্থানীয় মসজিদের ইমাম, শেখ সাঈদ বলেন, ‘আমিন ভাই কাঁদছিলেন আমার সামনে। বলেছিলেন, হুজুর, আমি শুধু একটা সংসার চাই।’

২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাহমুদা খাতুন এখনও হিজ মাজেস্টির কারাগারে বন্দি। তাঁর মুক্তির সম্ভাব্য তারিখ ২০২৫ সালে অর্থাৎ এ বছরের যেকোনো সময়ে তাঁর মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মুহাম্মদ আমিন মিয়ার মৃত্যু শুধু একটি হত্যাকান্ড ছিল না-তা ছিল বিশ্বাসের মৃত্যুও। আর মাহমুদা খাতুনের কারাবরণ শুধু শাস্তি নয়, ছিল আত্মার অন্তর্দ্বন্দ্বের প্রতিফলন।


Back to top button
🌐 Read in Your Language