
পূর্ব লন্ডনের আকাশটা সেই বিকেলে ছিল অদ্ভুত রকমের ধূসর। গ্রীষ্মের দিনে এমন বিষণ্ণতা খুব একটা দেখা যায় না। রিভার লি’র পাড়ে ঘাসেরা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল, যেন জানে—কিছু একটা খুব ভুল হতে যাচ্ছে। বাতাসে ছিল একটা চুপচাপ উদ্বেগ, চারপাশ নিঃসাড়, অথচ ভারী।
নদীর জল কেবল বয়ে যাচ্ছিল—না কোনো জোয়ার, না ভাটা—শুধু এক প্রবাহমান শোক যেন শহরের বুক চিরে বহমান। সেই শহরের এক কোণে, ইটের দেয়ালে ধুলোর আস্তরণ মাখা এক পুরনো ফ্ল্যাটের জানালায় পাণ্ডুর পর্দা ধরা ছিল। ভিতরে, পেছনের রুমটায়, সুমা বেগম থাকতেন তার দুই শিশুকে নিয়ে। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই, এক মায়ের নিঃশব্দ আর্তনাদ এখানে প্রতিদিন জমে জমে শ্বাসরুদ্ধ করে তুলেছে দেয়ালের ফাঁকফোকর।
বছরখানেক আগেও গ্রামের পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে টিকটকে হাস্যোজ্জ্বল ভিডিও করতেন। এখানে এসেও প্রযুক্তিই ছিল তার একমাত্র মুক্তির জানালা—টিকটকের এক নীলপর্দা তার জীবনে রঙ তুলেছিল, আবার সে পর্দাতেই ছিঁড়ে গিয়েছিল জীবনের শেষ দৃশ্য।
ঘরের দেয়ালে ঝুলে থাকা বাচ্চাদের ছবি, রান্নাঘরের সিঙ্কে অর্ধেক ধোয়া প্লেট, বিছানায় কাঁথা-মোড়া চার মাসের এক মেয়ে সন্তান, আর কোণার দিকে খেলনা নিয়ে চুপচাপ বসে থাকা দুই বছরের ছেলে—এই ছিল সুমার এক টুকরো পৃথিবী। সে পৃথিবী ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল, অথচ কেউ টের পায়নি।
২০১৯ সালের এক মধ্যরাতে, বাংলাদেশের একটি গ্রামে মোবাইলের আলোয় মুখ উজ্জ্বল করে বসেছিলেন সুমা। মায়ের চোখ এড়িয়ে, বাবার কড়া দৃষ্টির আড়ালে, তিনি ফোনে দিলেন একটি মৌখিক সম্মতি—বিদেশে থাকা একজন রেস্টুরেন্ট কর্মীকে বিয়ে করবেন। ইসলামী নিয়মে ফোনে পড়া সেই কবুল থেকেই তার জীবনের গন্তব্য ঠিক হয়ে গেল।
তাঁর পরিবার খুশি ছিল। “মেয়ে বিদেশে যাবে”—এই একটা বাক্যতেই আত্মীয়রা গর্বে বুক ফুলিয়ে বলেছিল, “সুমার ভাগ্য ভালো।”
২০২০ সালের শুরুর দিকে, কাঁধে ব্যাগ নিয়ে, হাতে পাসপোর্ট ধরে সুমা পা রাখলেন যুক্তরাজ্যে। সেমারসেটের ব্রিজওয়াটারে তখনো বসন্তের শেষ প্রান্তে ঠান্ডা কাঁপছিল। নতুন শহর, নতুন ঘর, নতুন মানুষ। প্রথমদিকে আশা ছিল—ভবিষ্যতের। কিন্তু অল্প সময়েই তিনি টের পান, এই বাড়ি তার নয়।
আমিনান রহমান (৪৬), তার স্বামী, এক রেস্টুরেন্ট কর্মী। প্রথমদিকে কম কথা বলা, নির্লিপ্ত এক মানুষ। ধীরে ধীরে সেই নির্লিপ্ততার নিচে বেরিয়ে আসে সন্দেহ, নিয়ন্ত্রণ, নির্যাতন। সুমার মোবাইল কবে চার্জে দেওয়া হয়, কতক্ষণ কোথায় কথা বলে—সবকিছুতেই ছিল শাসন। ধীরে ধীরে, ভালোবাসার জায়গা দখল নিল নিয়ন্ত্রণ। প্রথমে মোবাইল কেড়ে নেওয়া, তারপর টাকার হিসাব রাখা, তারপর সুমার গলায় চেপে বসা সেই ভয়।

যেখানে বাস্তব নিঃশ্বাস বন্ধ করে, সেখানে ভার্চুয়াল জগৎ হয় আশ্রয়। ২০২১ সালে টিকটকে সুমার পরিচয় হয় শাহিন মিয়ার সঙ্গে— ২৪ বছর বয়সী এক প্রবাসী তরুণ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে কাজ করেন। টিকটক থেকে হোয়াটসঅ্যাপ—তাদের আলাপ গাঢ় হয়, সম্পর্ক গভীর। প্রথমে মন্তব্য, পরে মেসেজ, এরপর ভিডিও কল। এক অদ্ভুত মায়া তৈরি হয়, যার পরতে পরতে ছিল কথা, হাসি, সাহস।
শাহিনের সঙ্গে সম্পর্ক যখন গভীর, তখন রহমানের সন্দেহ হয়। তিনি জেনে গিয়েছিলেন সুমা এখন আর কেবল তার স্ত্রী নন, তিনি কাউকে ভালোবাসেন। সেই জানার মধ্যেই জমে উঠছিল রাগ, অপমান, ঈর্ষা।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে, এক রাতে তিনি সুমাকে আক্রমণ করেন। গলায় আঁচড়ের দাগ, চোখে আতঙ্ক। সুমা সেই দৃশ্য রেকর্ড করেন—গলায় আঁচড়ের দাগ, কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “সে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিয়েছিল… আমাকে গলায় ধরে মেরে ফেলতে চেয়েছিল।” শাহিন সেই ভিডিও সযত্নে রেখে দেন। কিন্তু কেউ জানত না, সেই ভয়াবহ দৃশ্যই একদিন স্থায়ীভাবে রূপ নেবে।
২৯ এপ্রিল ২০২৩। রাত গভীর। সুমা বিছানায় বসে ফোনে কথা বলছেন শাহিনের সঙ্গে। সন্তানদের পাশেই বিছানায় বসেছিলেন সুমা। রহমান হঠাৎ এসে ফোন ছিনিয়ে নেন, শুরু হয় তর্ক, চিৎকার। ভিডিও কলে সব দেখছেন শাহিন—সুমা চিৎকার করছেন, রহমান বলছেন, “তুমি পালাতে চাও? আমি তোমাকে শেষ করে দেব।”
তিনবার চিৎকার। তারপর ভিডিও জমে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার শাহীনের কাছে কল আসে। রহমান বলেন, “দেখো, আমি তাকে মেরে ফেলেছি। এখন তুমি প্রস্তুত হও।”
মৃতদেহ তখন শুয়ে ছিল মেঝেতে। একটি নিঃশ্বাসহীন দেহ—দুই সন্তানের সামনে নিথর হয়ে পড়ে ছিল মা। রহমান ঠাণ্ডা মাথায় সুমার লাশ একটি স্যুটকেসে ভরে ফেলেন। পরে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মধ্যরাতে এক হাতে স্যুটকেস টেনে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। গন্তব্য—রিভার লি।

নদীর পাড়ে পৌঁছে স্যুটকেস জলে ফেলে দেন রহমান। তিনি ভেবেছিলেন নদী সব গিলে খাবে অথবা ভাসিয়ে নেবে। কিন্তু না। ১০ দিন পর, এক এক মাডলার (নদীঘাটে কাদা খোঁজার মানুষ) স্যুটকেসটি নদীর কিনারে দেখতে পান। ভেতরে খুলে দেখেন পচাগলা একটি দেহ। শুরু হয় পুলিশি তদন্ত।
শাহিনের ভিডিও, সিসিটিভি ফুটেজ, আগের রেকর্ডিং —সব মিলিয়ে আমিনান রহমানের বিরুদ্ধে মামলা চলে। আদালতে সাক্ষ্য দেন শাহিন। জুরি ৪ ঘণ্টা ২৭ মিনিট পর সর্বসম্মতিতে রায় দেয়—আমিনান রহমান দোষী।
জুলাই ৩১, ২০২৪—রহমানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়, কমপক্ষে ২২ বছর। বিচারপতি বেনাথান রায়ে বলেন, “সুমা ছিলেন এক প্রাণবন্ত তরুণী, এক স্নেহময়ী মা। তুমি তার স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছো। এই আদালতে অনেক স্ত্রী হত্যার মামলা আসে, কিন্তু তুমি যা করেছো, তা আরও নৃশংস।”
দুই শিশু এখন রাষ্ট্রীয় হেফাজতে। একটি ছোট মেয়ে, যার মায়ের মুখের স্পর্শের স্মৃতি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। ছেলেটি এখন পুরুষদের কাছাকাছি গেলেই আঁতকে উঠে। তারা এখনো কিছুই বুঝতে পারছে না। তারা জানে না, কীভাবে এক রাতে তাদের পৃথিবী বদলে গেছে।
নদীর পাড়ে কেবল বাতাসের শব্দে শোনা যায়, কারো শ্বাসরুদ্ধ আর্তনাদ। কেবল নদী জানে সেই গল্প।









