
টাওয়ার হ্যামলেটস, স্টেপনি – একসময় কুখ্যাত ডক শ্রমিকদের এলাকা, আজ এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রাণকেন্দ্র। পুরনো ব্রিটিশ দালানগুলোর গায়ে লেগে থাকা ইট-সুরকির গন্ধ, রাস্তার ধারে সারি সারি বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ, কাঁচাবাজার আর ছোটখাটো গার্মেন্টসের দোকান – সব মিলিয়ে যেন এক খণ্ড বাংলাদেশ। এখানেই একসময় বসবাস করতেন রেহানা বেগম।
লন্ডনের পূর্বাঞ্চলের এই এলাকায় ১৯৭০-এর দশকে আসা প্রথম প্রজন্মের বাংলাদেশিরা মূলত ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের কৃষক ও কারিগর শ্রেণির মানুষ। সময়ের সাথে সাথে তারা নিজেদের কঠোর পরিশ্রমে গড়ে তুলেছেন বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য – কেউ চালিয়েছেন রেস্টুরেন্ট, কেউবা রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন, আবার কেউবা টেক্সটাইল শিল্পের সঙ্গে নিজেদের সংযুক্ত করেছেন। স্টেপনির রাস্তাগুলোতে আজ বাংলাদেশি গ্রোসারি দোকান, হালাল মাংসের দোকান, বুটিক শপ, এমনকি বিভিন্ন আইটি ব্যবসাও দেখা যায়। একদিকে পুরনো ঐতিহ্যের সাথে জড়িয়ে থাকা, অন্যদিকে আধুনিক ব্রিটেনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলা – এই দ্বৈত সত্ত্বার মধ্যেই গড়ে উঠেছে এখানকার বাংলাদেশি কমিউনিটি।
রেহানা বেগমের জন্ম হয়েছিল সুনামগঞ্জের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। বাবা ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা, মা ছিলেন গৃহিণী। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে রেহানা ছিলেন চতুর্থ। পড়াশোনা শেষে তার পরিবার সিদ্ধান্ত নেয়, তাকে লন্ডনে প্রবাসী আত্মীয়দের মাধ্যমে বিয়ে দেওয়া হবে। সেই সূত্রে তার বিয়ে হয় আব্দুল কাদিরের সঙ্গে, যিনি আগে থেকেই স্টেপনিতে ব্যবসা করতেন। তাদের সংসার ছিল টাওয়ার হ্যামলেটসের এক আবাসিক এলাকায়, যেখানে বেশিরভাগই বাংলাদেশি পরিবার বসবাস করত। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ব্যস্ত ছিলেন ব্যবসা এবং পরিবার নিয়ে।
রেহানার স্বামী কাদির মূলত রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। ধীরে ধীরে তিনি অর্থনৈতিকভাবে বেশ স্বচ্ছল হয়ে ওঠেন। কিন্তু তার এই উন্নতির খবর বাংলাদেশেও পৌঁছায়, আর সেখান থেকেই শুরু হয় সমস্যার সূত্রপাত। পরিবারের কিছু আত্মীয়, বিশেষত কাদিরের চাচাতো ভাইয়েরা মনে করতেন, এই ধন-সম্পদের একটি অংশ তাদেরও পাওয়া উচিত।

রেহানা যখনই বাংলাদেশে যেতেন, তখন তার কিছু আত্মীয় নানা অজুহাতে টাকা চাওয়ার চেষ্টা করত। তিনি একাধিকবার তাদের সাহায্য করেছেন, কিন্তু তা কখনোই যথেষ্ট মনে হয়নি তাদের কাছে। এসব বিষয়ে কাদিরের আত্মীয়দের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে। কিছু আত্মীয়ের ধারণা জন্মায়, কাদিরের ব্যবসার আসল অর্থের উৎস লুকানো এবং তারা এ থেকে কোনো অংশ পাচ্ছে না।
শেষবারের মতো রেহানা বেগম বাংলাদেশে আসেন তার মা ও ভাই-বোনদের দেখতে। সাথে ছিলেন তার স্বামী ও একমাত্র ছেলে রাকিব। কিন্তু এ সফর যে তার জীবনের শেষ সফর হবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি কেউ।
শুক্রবার দুপুর। সুনামগঞ্জের পাতলী গ্রামে এক খোলা পুকুরের ধারে পরিবারের সবাই বসে। রাকিব সাঁতার কাটছিল, আর তাকে দেখে হাসছিলেন রেহানা। কিন্তু সেই মুহূর্তেই ঘটে এক অবর্ণনীয় নৃশংস ঘটনা। হঠাৎই আত্মীয়দের একটি দল মাচেটি হাতে এসে চড়াও হয় রেহানার ওপর। তার বোন রুফিয়া চিৎকার করে ওঠেন, ওদেরকে থামতে বলেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা!
রেহানা পালানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু পা পিছলে পড়ে যান। তারপরেই ঝাঁপিয়ে পড়ে খুনিরা। তাদের হাতের ধারালো অস্ত্র একের পর এক আঘাত হানতে থাকে রেহানার শরীরে। পাশের ১৫ বছরের ভাগ্নি সোনিয়া দৌড়ে এসে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তার ডান হাত কেটে ফেলা হয়। ছোট্ট রুমন আর রাবিয়াও আহত হয় তাকে বাঁচাতে গিয়ে। চারদিকে শুধু চিৎকার আর রক্তের স্রোত।
রেহানার নিথর দেহ পড়ে থাকে কাদির পরিবারের উঠোনে, আর তার ১২ বছরের ছেলের চোখের সামনে মা-কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশে। বাংলাদেশি পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং পরদিনই কাদিরের এক আত্মীয় বশির মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। বাকিরা পালিয়ে যায়।
লন্ডনের বাংলাদেশি কমিউনিটি এই ঘটনায় শোকাহত। কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।
রেহানার স্বামী আব্দুল কাদির, শোকে স্তব্ধ। তার একমাত্র ছেলে রাকিবের মানসিক অবস্থা বিপর্যস্ত।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ব্যক্তিগত শোকগাথা নয়, এটি অভিবাসী বাংলাদেশি পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নতি এবং পারিবারিক লোভ-সংক্রান্ত এক নির্মম বাস্তবতা।









