
শীত কেবল একটি ঋতু নয়—সে এক অনুভব, এক নিঃশব্দ আবেগ, এক কুয়াশায় মোড়ানো অন্তর্লীন কাব্য। আর এই কাব্যের প্রকৃত রূপ মেলে সিলেটের অরণ্যঘেরা, নদীস্নাত জনপদ ফেঞ্চুগঞ্জে।
সিলেটের শীত ঢাকার চেয়ে ঢের গাঢ়, আরও ঘনীভূত। বিশেষত পাহাড়ঘেরা এলাকায় সকাল ১১টার আগে সূর্যের দেখা পাওয়া যেন ভাগ্যের ব্যাপার। ভোরের পর পরই নদীর কোল ঘেঁষে বয়ে আসে হিমেল হাওয়া, কুশিয়ারা নদী ধীরে ধীরে জেগে ওঠে কুয়াশার চাদর গায়ে মেখে।
রাস্তার ধারে ছোট ছোট চায়ের দোকানে উনুনের আগুনের পাশে বসে থাকা লোকজনের গায়ে থাকে চাদর, কানঢাকা টুপি, আর হাতে থাকে ধোঁয়ায় ভরা চায়ের কাপ। এ যেন গ্রামবাংলার সেই চিরচেনা দৃশ্য, যা সময়ের ফ্রেমে আটকে রাখা কোনো চিত্রকলার মতো।

সিলেটের বুকে অবস্থিত এক অনন্য জনপদ—ফেঞ্চুগঞ্জ। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে নদী—মধ্যভাগে সবুজে ঢাকা কৃষিজমি আর বিস্তৃত বাগান। এর বুক চিরে বয়ে চলেছে কুশিয়ারা নদী, যার ঢেউয়ে গল্প করে সময়। নদীর তীরে গড়ে উঠেছে শতাব্দীর পুরনো জনবসতি, যেখানে মানুষ ও প্রকৃতি যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি বেঁচে আছে সহাবস্থানের এক আশ্চর্য সুরে।
এই অঞ্চলে বিভিন্ন ধর্মের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বাস। পাহাড়ের কোলে বিস্তৃত চা বাগান ও পানপুঞ্জিগুলো শুধু প্রাকৃতিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যেরও প্রতিচ্ছবি। বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃতাত্বিক গোষ্ঠীর ঐতিহ্য মিলে এখানে গড়ে ওঠেছে এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিসর।
শীতের এই নিবিড় আবেশ শুধু আবহাওয়ায় সীমাবদ্ধ নয়, সে মিশে থাকে মানুষের চালচলনে, সম্পর্কের উষ্ণতায়, আর সাংস্কৃতিক আয়োজনে। এই সময়টাতেই বাড়িতে বাড়িতে শুরু হয় পিঠা তৈরির ধুম। সিলেটের মানুষের শীত যেন অপূর্ণ থেকে যায় পিঠার ঘ্রাণ ছাড়া, আর পিঠার রাজ্যে যার নাম সবার আগে আসে, তা হলো—চুঙ্গা পিঠা।

চুঙ্গা পিঠা কেবল খাদ্য নয়—এটি অত্র এলাকার ভূগোল, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সম্পর্কের উষ্ণতার এক আন্তরিক প্রতিচ্ছবি। এটি শীতকালের গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত এক ঐতিহ্য, যা পাহাড়ি-সমতল জনপদের প্রকৃতি, জনজীবন ও সাংস্কৃতিক রুচির এক অপূর্ব মিলন ঘটায়। কাঁচা বাঁশের নল আর বিন্নি ধানের চাল মিশে যখন আগুনে ঝলসে ওঠে, তখন শুধু ধোঁয়া নয়—উঠে আসে এক রন্ধন-রূপকথা, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পৌঁছে গেছে পরিবার থেকে পরিবারে।
ঐতিহ্যবাহী এই চুঙ্গা পিঠা এখন আর কেবল সিলেটের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়; এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও। আর সেই খ্যাতির পথ ধরেই শুরু হয়েছে নতুন এক স্বপ্নযাত্রা—চুঙ্গা পিঠাকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি এনে দেওয়ার প্রয়াস।
পাহাড়ি বাঁশে রন্ধনরসের রূপকথা:
চুঙ্গা পিঠা তৈরির পদ্ধতি যতটা সরল, স্বাদে ততটাই গভীর—যেন এক অনন্য রন্ধনচমক। প্রথমে সংগ্রহ করা হয় বিশেষ এক ধরনের কাঁচা পাহাড়ি বাঁশ—যাকে বলা হয় ‘চুঙ্গা’।
প্রথম ধাপে বাঁশের ভিতর ঢোকানো হয় বিন্নি চালের গুঁড়া অথবা সরাসরি ধুয়ে রাখা চাল। কেউ কেউ নারিকেল কোরানো ও সামান্য লবণ মিশিয়ে দেয়, কেউ বা গুড়।
দ্বিতীয় ধাপে বাঁশের মুখ বন্ধ করে ধানের খের-এর আগুনে পুড়িয়ে নিতে হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চুঙ্গার গায়ে ভাজা ভাজা দাগ পড়ে, ভিতরে বাষ্পে সেদ্ধ হয় চাল।
তৃতীয় ধাপ অর্থাৎ চূড়ান্ত ধাপে চুঙ্গার তাপ একটু কমে গেলে হাতে হাতে চামড়া ছিলে বের করা হয় ধোঁয়া ওঠা গরম পিঠা।
চুঙ্গা পিঠার এমন অনন্য প্রস্তুতিপদ্ধতি একদিকে যেমন পরিবেশবান্ধব, অন্যদিকে তেমনি প্রাকৃতিক ও প্রথাগত। এই পিঠায় নেই কৃত্রিম রঙ বা স্বাদবর্ধক উপাদান—থাকে শুধু প্রকৃতির উপহার: বাঁশ আর চাল।

চুঙ্গা পিঠা তৈরির সময় গ্রামের উঠানে চারপাশে জড়ো হয় নারীরা, কিশোরীরা, বয়স্করা। কেউ বাঁশ কাটে, কেউ চাল ভরে, কেউ আগুনের তাপ দিয়ে চুঙ্গা পুড়ে। যেন একটি মিলিত সাংস্কৃতিক রন্ধনশালা। সন্ধ্যা গড়ালেই শুরু হয় পুঁথি পাঠ, বাউল গান, ধামাইল নৃত্য—সব মিলে তা এক ঐতিহ্যবাহী শীত উৎসবে পরিণত হয়।
পুরো সিলেট বিভাগেই চুঙ্গা পিঠা জনপ্রিয়। এছাড়া ভারতের আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ের পাহাড়ি অঞ্চলেও এর প্রচলন রয়েছে। খাসিয়া-জৈন্তিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে এটি একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসেবে বিবেচিত। তবে উপকরণ, স্বাদ, ও পরিবেশন ভঙ্গিতে সিলেটের চুঙ্গা পিঠার তুলনা চলে না। এখানকার জলবায়ু, মাটি, ও বাঁশের জাত বিশেষভাবে প্রভাব ফেলে পিঠার স্বাদে।

সিলেটের শতবর্ষের ঐতিহ্য ‘চুঙ্গা পিঠা’ এবার পা রাখছে বিশ্বমঞ্চে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় এর স্থান করে দিতে শুরু হয়েছে আনুষ্ঠানিক যাত্রা। কানাডা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম ‘দেশে বিদেশে’-র উদ্যোগে এই আবেদনের প্রাথমিক প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। শীতের কুয়াশা পেরিয়ে এখন চুঙ্গা পিঠার ধোঁয়া উড়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্মান ও স্বীকৃতির আকাশে।
সেই দিন আর দূরে নয়—যখন কোনো প্রবাসী শিশুর স্কুল প্রজেক্টে লেখা থাকবে, “My cultural heritage is ‘Chunga Pitha’—steamed in bamboo, born in the hills of Sylhet, and blessed by the river Kushiyara.”









