সম্পাদকের পাতা

কানাডার সিঙ্গেল পেরেন্টদের গল্প!

নজরুল মিন্টো

শহরের বুকজুড়ে যখন আলো ঝলমলে আলো, তখন অন্ধকার গায়ে মেখে কোনো এক কোণায় কাঁদে এক শিশু—খিদের জ্বালায় নয়, মায়ের চোখের জল দেখে। কানাডার মতো উন্নত দেশের প্রাণকেন্দ্র টরন্টোতে যেখানে মানুষ চাঁদের দেশে বসতি গড়ার স্বপ্ন দেখে, সেখানে একই শহরের বুকে খালি পেটে ঘুমিয়ে পড়ে একরত্তি শিশু। কেউ তাকে দেখে না। কেউ শুনে না তার বুকফাটা কান্না। রাষ্ট্রের হিসাবের খাতায় সে কেবল একটি সংখ্যা—সিঙ্গেল পেরেন্ট পরিবারের শিশু।

এই সভ্যতা, এই আধুনিকতার চাপে, সম্পর্ক হয়ে গেছে ঠুনকো। বিয়ের আগে সহবাস, বিয়ের পরে বিচ্ছেদ, সম্পর্কের মাঝে ক্লান্তি, আর সন্তানের কাঁধে ভারী বিষাদ। যারা সম্পর্ক বাঁচাতে পারেনি, তারা হয়তো ঘৃণা করে না, কিন্তু দায়িত্ব এড়ায়। আর বাকি জীবন পিঠে আর কোলে বাচ্চা নিয়ে একা লড়েন এক মা। যার মুখে হাসি নেই, চোখে ঘুম নেই।

মানবিক সংকট
স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা ২০২১ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, কানাডায় প্রায় ১৯% পরিবার এখন সিঙ্গেল পেরেন্ট দ্বারা পরিচালিত, যার ৭৮%-এর বেশি হলো মায়ের দ্বারা পরিচালিত পরিবার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু একটি সামাজিক ট্রেন্ড নয়—এটি একটি মানবিক সংকট।

টরন্টো চাইল্ড পোভার্টি রিপোর্ট ২০২৩ বলছে, মেট্রো টরন্টোতে প্রতি তিনটি শিশুর মধ্যে একজন দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। এর মধ্যে অধিকাংশই সিঙ্গেল মাদারের অধীনে বেড়ে ওঠা। এদের জীবনে নেই পর্যাপ্ত খাদ্য, নিরাপদ বাসস্থান কিংবা মানসিক সহায়তা।

যে গল্প ভোলার নয়!
এক সন্ধ্যায়, প্রতিবেশীর দানকৃত পুরনো জামার ব্যাগগুলো সলভেশন আর্মির কনটেইনারের সামনে রাখা ছিল। রাতের অন্ধকারে সেগুলো চুপিচুপি নিয়ে আসেন টনি নামের এক সিঙ্গেল মাদার এবং তার তিনটি সন্তান। তিনি জানান, “আমি জানি এটা চুরি। কিন্তু আমার সন্তানদের গায়ে দেওয়ার মতো কাপড় ছিল না।”

টনির এগারো বছরের পুত্র এলিয়ট জানায়, ‘স্কুলে যখন অন্যান্য ছাত্ররা আমাকে পুরোনো কাপড় পরতে দেখে, তখন আমাকে নিয়ে তারা হাস্যকৌতুক করে। আমার ইচ্ছে করে না আর স্কুলে যেতে।’

টনির দুই কন্যা, পাঁচ বছরের কেলি এবং তিন বছরের আনা, তাদের পরিবারের আর্থিক সংকটের কথা এই বয়সে উপলব্ধি করতে পারে না।

কিন্তু এলিয়ট ভালোভাবেই বোঝে। সে জানে, তার পরিবারের আর্থিক সঙ্গতি নেই, তবু তার ইচ্ছা করে আইসক্রিম খেতে, তার বোনদের জন্য চুলের রিবন কিনে দিতে, কিংবা স্কুলের টিফিনে কিছু খেতে।

এলিয়ট আরও জানায়, ‘কিছুদিন এমনও হয়, যখন গ্রোসারি কেনার জন্য আমার মায়ের কাছে অর্থ থাকে না। ওইদিন আমি লাঞ্চে কিছু খেতে পারি না, লাঞ্চরুমে গিয়ে এক কোনে চুপচাপ বসে থাকি। এই সময় সহপাঠীরা কেউ দয়া করে তাদের খাবারের অংশবিশেষ দেয়, হোক সেটা উচ্ছিস্ট।’

গত বছর কেলির কিন্ডারগার্টেন ক্লাসের সকল ছাত্রছাত্রী যখন ম্যাকডোনাল্ডসে খেতে যায়, তখন সে যেতে পারেনি। কারণ অংশগ্রহণের জন্য যে অর্থের প্রয়োজন ছিল, তা তার মা দিতে পারেননি। ওইদিন তার এক বন্ধু তার অর্ধেক হ্যামবার্গার কেলির জন্য রেখে দেয়। কেলি সেই খাবার বাসায় নিয়ে এসে আনন্দে দৌড়ে মাকে দেখায়। টনি বলেন, “সেদিন আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল। ওর হাসিটা আমার সব কষ্ট ছাপিয়ে গিয়েছিল।” উল্লেখ্য, এই হাসির পেছনে যে হ্যামবার্গার ছিল, তার দাম মাত্র ২.৫০ ডলার—কিন্তু কেলির চোখের সেই খুশি ছিল অমূল্য।

স্কুলজীবন ও অপূর্ণ স্বপ্ন
টরন্টোর স্কুলগুলোতে শিশুদের স্বপ্ন আছে—চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা বা খেলাধুলা। কিন্তু এসবেই অংশ নিতে পারে না অনেক শিশুই, কারণ তাদের কাছে নেই অংশগ্রহণের ফি, নেই প্রজেক্ট তৈরির সামগ্রী, নেই নিজের জুতো। স্কুলে কেউ যখন জন্মদিনে কেক আনে, কেউ যখন নতুন জ্যাকেট পরে আসে, তখন সিঙ্গেল মায়ের শিশুটি ক্লাশে চুপ করে বসে থাকে।

রায়ারসন ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানী মারভিন নোভিক বলেন, “আমাদের সমাজ ভারসাম্য হারাচ্ছে। অনেক পরিবার এখন একটি বই কেনার সামর্থ্যও হারিয়েছে। শিক্ষার মৌলিক অধিকার অনেক শিশুর কাছেই বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

বিশ্বাস করুন বা নাই করুন!
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, টরন্টোতে শিশু দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২২ সালে, শহরের ২৫.৩% শিশু নিম্ন-আয়ের পরিবারে বসবাস করছিল, যা ২০২০ সালের ১৬.৮% থেকে ৮.৫ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধির ফলে, ২০২২ সালে টরন্টোতে প্রায় ১,১৭,৮৯০ শিশু দারিদ্র্যের মধ্যে ছিল, যা ২০২০ সালের তুলনায় ৩৬,৭১০ বেশি।

এই পরিসংখ্যান টরন্টোকে কানাডার প্রধান শহরগুলোর মধ্যে শিশু দারিদ্র্যের ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানে রেখেছে। উইনিপেগে এই হার ২৩.৮%, যা টরন্টোর পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। জাতীয়ভাবে, কানাডার শিশু দারিদ্র্যের হার ১৮.১%, এবং অন্টারিও প্রদেশে এটি ১৯.৫%।

শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে দারিদ্র্যের হার ভিন্নতা প্রদর্শন করে। উদাহরণস্বরূপ, টরন্টো সেন্টারে শিশু দারিদ্র্যের হার ৩৬.৬%, যা শহরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া, স্কারবরোর চারটি ওয়ার্ডসহ মোট নয়টি ওয়ার্ডে ৩০% বা তার বেশি শিশু দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে।

ডেইলি ফুড ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, তাদের খাবার নিতে আসা লোকদের অর্ধেক এখন শিশু। এগুলোর বেশিরভাগই সিঙ্গেল পিতামাতার সন্তান। তারা নিজেরাই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, ছোট্ট হাতে একটি ব্যাগ ধরে, যেটা হয়তো আজ রাতে তাদের একমাত্র খাবারের উৎস।

শুনতে যতটা চমকপ্রদ, বাস্তবে ততটাই বিভ্রান্তিকর—মেট্রো টরন্টোতে প্রতি তিনটি পরিবারের মধ্যে একটি পরিবারের গড় আয় এখন ৯৭,০০০ ডলারের কাছাকাছি। এই সংখ্যাটি দেখলে মনে হতে পারে সবাই স্বাচ্ছন্দ্যে আছে, কিন্তু সংখ্যার নিচে চাপা পড়ে যায় সেই ১৩.২% পরিবার, যারা এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। তাদের কারও বার্ষিক আয় ৩০,০০০ ডলারও নয়, বরং ৭,০০০ ডলারের নিচে নেমে গেছে। সরকার যদিও “নিম্ন আয়ের পরিবার” নির্ধারণে বছরে প্রায় ২৯,০০০ ডলারকে সীমা ধরে, কিন্তু বাস্তবে এ আয় দিয়ে টরন্টোর মতো শহরে বেঁচে থাকা
এক রকম অসম্ভব। একজন সিঙ্গেল মায়ের মাস শেষে যখন হাতটা খালি থাকে, তখন সে কীভাবে ছেলের জুতো কিনবে? কেমন করে মেয়ের স্কুল ফি দেবে? তখন টেবিলের ওপর ভাতের বদলে নুডলস, আর স্বপ্নের জায়গায় ভেসে থাকে দায়িত্বের পাথর।

সিস্টেমের ব্যর্থতা
বর্তমানে কানাডায় ওবিবাহিত ‘কমন-ল’ দম্পতির সংখ্যা বিবাহিত দম্পতির তুলনায় ১৬ গুণ হারে বাড়ছে। তারা সন্তান জন্মের পরেও অনেক সময় সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারে না। ফলে শিশুরা বেড়ে ওঠে সিঙ্গেল পিতা বা মাতার ছায়ায়।

ভ্যানিয়ের ইনস্টিটিউট অফ ফ্যামিলির মুখপাত্র উবলো বলেন, “বিয়ের ওপর আস্থা হারিয়েছে মানুষ। অনেকেই চার্চ বা আইনগত বিয়ে নয়, সহজ ও দায়মুক্ত সহবাসে আগ্রহী। কিন্তু এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা।”

সরকারি উদ্যোগ ও অপ্রতুল সহায়তা
কানাডার মতো উন্নত দেশে সিঙ্গেল পেরেন্টদের জন্য সরকারি সহায়তা পর্যাপ্ত নয়। ১০ ডলারের চাইল্ড কেয়ার প্রোগ্রাম ফেডারেল সরকারের অন্যতম উদ্যোগ হলো “$10-a-day” চাইল্ড কেয়ার প্রোগ্রাম, যা ২০২১ সালে চালু হয়। এর লক্ষ্য—ডে কেয়ারের ব্যয় কমিয়ে আনা, বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এই প্রকল্প অনুযায়ী, নির্দিষ্ট অনুমোদিত ডে কেয়ারগুলোতে শিশুপ্রতি দৈনিক মাত্র ১০ ডলারে সেবা পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। টরন্টো চাইল্ড কেয়ার রিসোর্স অ্যান্ড রিসার্চ ইউনিট বলছে, “উচ্চ চাহিদা ও সীমিত আসনের কারণে অধিকাংশ পরিবারই সুবিধাটি পায় না।” সিঙ্গেল মায়েরা ডে কেয়ার খুঁজে পেতে হিমশিম খায়। অনেকে ৬ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত অপেক্ষার তালিকায় থাকেন। অথচ তাদের চাকরি করা দরকার বেঁচে থাকার জন্য।

চাইল্ড বেনিফিট
২০১৬ সাল থেকে চালু হওয়া Canada Child Benefit (CCB) হচ্ছে মাসিক আর্থিক সহায়তা, যা ১৮ বছরের নিচে শিশুদের অভিভাবকদের দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের সর্বশেষ নীতিমতে, যেসব পরিবারের বাৎসরিক আয় কম, তারা প্রতি শিশুতে সর্বোচ্চ ৭,৪৩৭ ডলার (প্রতি মাসে প্রায় $620) পর্যন্ত পেতে পারেন।

তবে এই সহায়তা নির্ভর করে ট্যাক্স ফাইলিংয়ের উপর। অনেক সিঙ্গেল পেরেন্ট সময়মতো ট্যাক্স জমা দিতে পারেন না বা সঠিক কাগজপত্র না থাকায় সুবিধা পান না।

স্যাবসিডাইজড হাউজিং
টরন্টোতে স্যাবসিডাইজড হাউজিং পেতে গড়ে ৮–১২ বছরের অপেক্ষা। ফলে বহু পরিবার বেসমেন্টে ঠাসাঠাসি করে থাকে, যেখানে নেই ঠিকমতো আলো, নেই নিরাপত্তা। আবেদন করতে গিয়ে পিতামাতারা হারিয়ে ফেলেন সময়, ধৈর্য, এবং কখনো কখনো আশা।

অন্তিম সত্য হলো—প্রোগ্রাম আছে, ঘোষণা আছে, কিন্তু মানুষের জীবনে সেই সুবিধাগুলো পৌঁছায় খুব কম। যারা সবচেয়ে অসহায়, তারাই সবচেয়ে বেশি বাদ পড়ে যান এই সিস্টেম থেকে।

কানাডিয়ান কাউন্সিল অফ সোশ্যাল ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ডেভিড রস বলেন, “শিশুরা যেন সুন্দরভাবে তাদের জীবনের প্রথম অংশ শুরু করতে পারে, এটা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।”

সিঙ্গেল পেরেন্টের শিশুরা কাঁদে—কিন্তু সেই কান্না কেউ শোনে না। তারা স্বপ্ন দেখে, শুধু একটি রঙিন জামা, একটি আইসক্রিম, কিংবা স্কুল প্রজেক্টে একটা অংশগ্রহণ।

আমরা যদি সমাজের এই অসহায় শিশুদের পাশে না দাঁড়াই, তবে আমাদের সভ্যতা উন্নত হলেও মানবিক নয়। একটি শিশুর ম্যাকডোনাল্ডসের অর্ধেক বার্গার নিয়ে বাসায় দৌড়ে যাওয়া শুধু ক্ষুধা নয়, তা একটি সমাজব্যবস্থার চরম ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

একটি শিশুর রিবনহীন চুল আমাদের চেতনা নাড়িয়ে দিক। একটি শিশুর লাঞ্চ না খেয়ে চুপ করে বসে থাকা আমাদের বিবেক জাগিয়ে তুলুক।


Back to top button
🌐 Read in Your Language