
উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশ কমিউনিটি দিন দিন বড় হচ্ছে। নিউইয়র্ক, টরন্টো, মনট্রিয়লসহ বিভিন্ন শহরে যেসব বাঙালি দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন তাদের ছেলেমেয়েরা এখন বড় হয়ে গেছে। দ্বিতীয় প্রজন্ম বড় হয়ে ওঠার সাথে সাথে বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। অনেক অভিভাবক এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। আগে ছেলে বা মেয়ে উপযুক্ত হলে অভিভাবকরা দেশে নিয়ে যেতেন। প্রথম কারণ ছিল এসব দেশে পাত্র-পাত্রির অভাব এবং দ্বিতীয় কারণ ছিল দেশে গিয়ে আত্মীয়-স্বজন পরিবেষ্টিত নিজস্ব রীতি-নীতি অনুযায়ী বিয়ের অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন করা।
সময় বদলেছে। এসব দেশে এখন উপযুক্ত পাত্র-পাত্রীর অভাব নেই। উপরন্ত পরিবার-পরিজন নিয়ে দেশে গিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান করার চাইতে এখানে সম্পন্ন হলে আর্থিক সাশ্রয়ও ঘটে।
বিয়ে—শুধু একটি সামাজিক অনুষ্ঠান নয়, একটি সংস্কৃতি, একটি ধারা, একটি স্বপ্নের জোড়া লাগা। প্রবাসে এই বিয়ে নতুন রূপ পায়, বদলায় এর ধরন, রীতি, আর ধ্যান-ধারণা। উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ আকাশে ছড়িয়ে আছে নতুন প্রজন্মের গল্প—যেখানে বিয়ের পাত্র-পাত্রী শুধু মানুষ নয়, বরং সময়, সংস্কৃতি আর অভ্যাসের বন্ধনেও জড়ানো।
সম্প্রতি বেশ কয়েকটি বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে বরপক্ষ এবং কনে পক্ষের সাথে আলাপ আলোচনার প্রেক্ষিতে কথাগুলো বললাম। আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয় যে, দেশে যেখানে বরপক্ষ এবং কনেপক্ষ আলাদা পার্টি দিয়ে থাকেন প্রবাসে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুই পক্ষ মিলে একটিই পার্টি দিয়ে থাকেন। এটা আমার কাছে একটা ভাল দিক বলে মনে হয়। পাত্র-পাত্রী উভয়েই পরিচিত হলে এবং দুই পক্ষ থেকে দুটো পার্টির আয়োজন করা হলে অনেক সময় উভয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। এদিক দিয়ে যৌথ আয়োজনে একটি পার্টি
সময়োপযোগী।
বর্তমানে ড্রোন ফটোশুট, থিম ওয়েডিং, ডেস্টিনেশন ওয়েডিং -এর ট্রেন্ড। অনেকে আবার ভার্চুয়াল বা হাইব্রিড বিয়ে করেন। এছাড়া প্রবাসে বাংলাদেশি এবং অন্য জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে আন্তঃবিয়েও বেড়েছে।
সাম্প্রতিককালে উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশ কমিউনিটিতে বিয়ের ধুম! প্রতি সপ্তাহে প্রায় দুইটা/তিনটা বিয়ে! বাড়তি অনুষ্ঠান হিসেবে থাকছে গায়ে হলুদ। আজকাল বিয়েতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করা কঠিন! বেশ খরচ! যেখানে না গেলেই নয়, সেখানে যাই। একটা সময় ছিল যখন দোকান থেকে উপহার কিনে রেপিং পেপার দিয়ে মোড়ে বিয়ের অনুষ্ঠানে অতিথিরা যেতেন। ঐ রীতি উঠে গেছে। এখন উপহার হিসেবে একটা এনভেলাপের ভেতর গিফট কার্ড কিংবা নগদ অর্থ দিতে হয়। এতে সুবিধাটা হলো নবদম্পতি তাদের প্রয়োজনীয় জিনিষটি কিনে নিতে পারে।
বর্তমান সময়ের Smart Wedding Culture-এ Amazon Wedding Registry এবং Zola.com একটি যুগান্তকারী ও খুবই ব্যবহারিক পদ্ধতি—যেখানে নবদম্পতি নিজের প্রয়োজনমতো উপহারের তালিকা তৈরি করতে পারে, আর অতিথিরা সহজেই সেখান থেকে উপহার দিতে পারেন।
আজকের যুগে গিফট রেজিষ্ট্রি শুধু স্মার্ট নয়—এটি সময়, খরচ ও ঝামেলা কমানোর একটি কার্যকর পন্থা। আরেকটা সুবিধা হলো– অতিথি কেউ একটি আইটেম কিনলে, সেটা রেজিস্ট্রি থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘Taken’ দেখাবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা না করলেই নয়। আমরা সকলে জানি, উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপে আজকাল বিয়ের অনুষ্ঠানের খরচ অনেক। ভাল একটি ব্যাঙ্কুয়েট হলে বিয়ের আয়োজন, খাওয়া-দাওয়া সব মিলিয়ে পার্টি ভেদে একেকজন অতিথির পেছনে খরচ হতে পারে ৮০ থেকে ১৫০ ডলার বা তারও বেশি। আপনি গিফট কার্ড দিন বা নগদ অর্থ দিন, হিসেব করেই আপনাকে দিতে হবে।
যে কোনো ওয়েডিং রিসিপশনে পরিবারের তিনজন গিয়ে যদি ১০০ ডলার দিয়ে আসেন তাহলে এটা যথার্থ হবে না। নিদেন পক্ষে আপনার ৩০০ ডলার দেয়া উচিত। মনে রাখতে হবে, আপনাদের তিনজনের জন্য আয়োজকদের খরচ হয়েছে প্রায় ২৪০ ডলার। যাদের আশীর্বাদ করতে গেছেন তারা তাহলে কি পেলো?
আরেকটা কথা। আমাদের অনেকেই বিয়ের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে অবশেষে রক্ষা করি না। এ প্র্যকটিস ঠিক নয়। আপনি যদি না যেতে পারেন আগে থেকে বলে দিন। আর যদি একেবারে শেষ সময়ে আকস্মিক কোনো অসুবিধা হয়ে যায় ফোন করে সাথে সাথে জানিয়ে দিন।
আমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত না হলে, আয়োজক পরিবার তবুও আপনাকে মাথায় রেখে প্রস্তুতি নেয়—খাবার থেকে শুরু করে আসন অবধি। আপনি না গেলে সেই জায়গায় হয়তো আর কাউকে নিমন্ত্রণ করা যেতো—তাই দায়বদ্ধতা ও সৌজন্যবোধের জায়গা থেকে আমন্ত্রণ গ্রহণের আগে একটু ভেবে নেয়াই ভদ্রতা।
বিয়ে আজ শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, একধরনের সৃজনশীল ব্যবস্থাপনা, সামাজিক স্মার্টনেস আর সংস্কৃতির রূপান্তর। উত্তর আমেরিকার প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে বিয়ের যে নতুন ধারা গড়ে উঠেছে, তা আমাদের চিন্তায়, রীতিতে ও আচরণে আধুনিকতা এবং দায়িত্বশীলতার অনন্য মিলন ঘটিয়েছে। আমরা যদি আনন্দের পাশাপাশি ভাবনার দিকেও মন দিই—তবে এই নতুন ধারার বিয়েগুলো কেবল স্মরণীয়ই নয়, অর্থবহও হয়ে উঠবে। সম্পর্ক, সম্মান ও সংস্কার—এই তিনের ভারসাম্যই হোক প্রবাসের বিয়ের আসল সৌন্দর্য।









