
সাপ্তাহিক ‘দেশে-বিদেশে’র আবিষ্কার যুদ্ধশিশু। ‘৯৬ সালের বিজয়-দিবস সংখ্যায় যুদ্ধশিশুর প্রতিবেদন ছাপা হওয়ার পর বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ ২৫ বছর পর জানতে পারে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এ অনুদঘাটিত কাহিনী। ১৯৯৬ সালের পূর্ব পর্যন্ত প্রকাশিত ইংরেজি-বাংলা অভিধানে ‘ওয়ার বেবি’র অর্থ ছিল—’পরিত্যক্ত শিশু’, ‘অবাঞ্চিত শিশু’ ইত্যাদি। ‘যুদ্ধশিশু’ নামটি আমারই দেয়া। এরপর থেকে অভিধানে ‘ওয়ার বেবি’র অর্থ হিসেবে যুক্ত হলো নতুন বাংলা শব্দ—’যুদ্ধশিশু’।
পাকিস্তানিদের নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা ও অমানবিকতার এক ভয়াবহ অধ্যায় ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, নারী নির্যাতন ছিল এই যুদ্ধের অন্যতম ভয়ংকর অস্ত্র। সেই ভয়াবহতার ফলশ্রুতিতে জন্ম নিয়েছিল হাজার হাজার অনাকাঙ্ক্ষিত শিশু। তাদের জন্ম হয়েছিল এক অন্ধকার ইতিহাসের গর্ভে। যুদ্ধশিশুদের সংখ্যা সম্পর্কে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। কিছু সূত্র মতে, প্রায় ২৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ যুদ্ধশিশু জন্মগ্রহণ করেছিল। অন্যদিকে, কিছু গবেষক ও সংস্থা এই সংখ্যা আরও বেশি বলে উল্লেখ করেছেন। ‘যুদ্ধশিশু’—শব্দটি শুধু একটি পরিচয়ের নির্দেশক নয়, বরং একটি রক্তাক্ত ইতিহাসের জীবন্ত স্মারক।
যুদ্ধশিশুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং তাদের আসল পরিচয় তুলে ধরা যে কত কঠিন, কত মর্মান্তিক, কত বড় ঝুঁকি ছিল, তা সাধারণ পাঠকরা শুনলে কিছুটা উপলব্ধি করবেন। আমরা কঠিন বাধা ডিঙিয়ে অবশেষে সে ঝুঁকি নিয়েছিলাম।
১৯৯৬-এর প্রথমার্ধে একদিন ‘দেশে-বিদেশে’র বিশেষ প্রতিনিধি মুস্তফা চৌধুরী খবরটি আমাকে জানান। আমার মুখ দিয়ে এক মিনিট কোনো কথা বের হয়নি। শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছিল। এ কী শুনলাম! ‘৭১-এর যুদ্ধশিশু! বাংলাদেশের ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। এরা বেঁচে আছে। এরা কানাডায় আছে। কোনোরকম নিজেকে সামলে নিয়ে তাঁকে বললাম, এদের যেমন করেই হোক খুঁজে বের করুন, আমরা তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবো।
মুস্তফা চৌধুরী শুরু করলেন অনুসন্ধান। যোগাযোগ করলেন একের পর এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে—যেসব সেবা-প্রতিষ্ঠান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের সহযোগিতায় ছিল। পুরনো পত্রিকা খুঁজে বের করে কিছু দত্তক পিতা-মাতার সন্ধানও পেলেন। কিন্তু মানবিক একটি কারণ আমাদের অগ্রযাত্রার অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল। কারণটি হচ্ছে—এসব শিশুরা জানে না তাদের আসল পরিচয়। এখন কীভাবে বলা যাবে তাদের, “তোমরা যুদ্ধশিশু?” যদি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে! এ আশঙ্কাই জানালেন দত্তক পিতা-মাতারা।
আজ আর তারা কেউ ছোট্ট শিশু নয়। সকলেই ২৫ বছরের তরুণ-তরুণী। গত ২৫ বছর ধরে দত্তক পিতা-মাতার কাছ থেকে একেকজন একেক ধরনের কাহিনী শুনে এসেছে—কেউ জানে তার বাবা-মা জন্মের সময় মারা গেছে, কেউ জানে তার দরিদ্র বাবা-মা তাকে দত্তক দিয়েছেন। এখন হঠাৎ যদি বলা হয় “তুমি যুদ্ধশিশু”—তাদের প্রতিক্রিয়া কী হবে?
মুস্তফা চৌধুরীর ঘুম হারাম। আমিও নিরুপায়। প্রতিদিনই দু’জনের কথা হয়, কিন্তু পথ খুঁজে পাই না।
অবশেষে খোঁজ পাওয়া গেল—ন্যায়াগ্রার ক্যাসিনোতে কর্মরত যুদ্ধশিশু ল্যারা জরিনার।
জন্মভূমি থেকে যখন তাকে কানাডায় আনা হয়েছিল, তখন তার নাম ছিল কেবল ‘জরিনা’। বিদেশে এসে তার জীবনে যোগ হলো নতুন পরিচয়—‘ল্যারা’। কানাডিয়ান সমাজে বড় হওয়া এক আত্মপরিচয়হীন তরুণী, যার চোখে হয়তো নিজের শেকড়ের ছবি কখনওই ছিল না স্পষ্ট।
মুস্তফা চৌধুরী তার সঙ্গে দেখা করলেন। উত্তেজনায় কথার খেই হারিয়ে ফেললেন। বলেই ফেললেন, “তুমি বাংলাদেশের যুদ্ধের সময় জন্ম নিয়েছো এবং আমরা তোমার কাহিনী পত্রিকায় প্রকাশ করতে চাই।” জরিনা চুপ। কোনো বিস্ময়, কোনো উষ্মা নয়—বরং মনে হলো সে খুশি হয়েছে।
সেদিন আর কোনো কথা এগোয়নি। পরে টেলিফোনে আরও কিছু কথা হয়। ছবি চাইলে সে ক্যুরিয়ারে কিছু ছবি পাঠিয়ে দেয়। ‘ফ্যামিলিজ ফর চিলড্রেন’ নামের প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাকে চট্টগ্রামের এক জাহাজের খোলে পাওয়া গিয়েছিল।
জরিনা বাংলাদেশে ফিরে যায়। মিশনারিজ অব চ্যারিটি—মাদার টেরিজার প্রতিষ্ঠানে গিয়ে নিজের নাম রেজিস্ট্রি খাতায় দেখে আসে। সেখানে জন্ম তারিখ লেখা ১৯৭১ সালের অক্টোবর, অথচ অন্যত্র লেখা আছে জুলাই মাসে। ইতিহাসের খেরোখাতায় এমন দ্বৈততা নতুন নয়।
একই সময়ে আমরা যোগাযোগ করি যুদ্ধশিশু বাতুলের সঙ্গে। তার কাহিনী আরও করুণ, আরও বেদনাবিধুর।
যখন সে জানতে পারে নিজের প্রকৃত পরিচয়, তখন আর স্থির থাকতে পারে না। ছুটে যায় বাংলাদেশে। মিশনারিজ অব চ্যারিটিতে গিয়ে দেখে—জন্মতারিখ লেখা আছে, কিন্তু নেই মায়ের নাম, নেই বাবার নাম। এক বৃদ্ধা সেবিকা জানালেন—তার মায়ের বাড়ি বরিশাল। বাতুল ছুটে যায় বরিশালে, কিন্তু কে তার মা? কোথায় তিনি? কীভাবে খুঁজবে?
হতাশায় ভেঙে পড়া বাতুল ফিরে আসে ঢাকায়। বাংলাদেশকে সে ভালোবেসে ফেলে। পালক পিতাকে ই-মেইলে জানায়—এখানেই সে কিছু করতে চায়।
বাতুলের কাহিনী মুস্তফা চৌধুরী যখন লিখে আমাকে দিলেন, তখন চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। আমিও পারিনি। কানাডায় প্রাচুর্যের মাঝে বড় হওয়া এক ছেলে ২৫ বছর পর খুঁজছে তার জন্মদাত্রীকে। এটা কোনো কল্পকাহিনী নয়। এটা ইতিহাসের এক রক্তমাখা সত্য, যা আমাদের বিবেকে প্রশ্ন তোলে।
একটি যুদ্ধ বাতুলের মাকে ছিনিয়ে নিয়েছে। সে জানে না, মা বেঁচে আছেন কিনা। বেঁচে থাকলেও হয়তো আর কখনও তাকে খুঁজে পাবে না। এমন কত বাতুল, জরিনা ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে, আমরা জানি না তাদের প্রকৃত সংখ্যা।
আমরা এসব যুদ্ধশিশুর জন্য কী করতে পারি, তা জানি না। শুধু একটি লক্ষ্য সামনে রাখি—তাদের সকলকে খুঁজে বের করবো। বাংলাদেশের মানুষ বলুক—তারা কীভাবে এই সন্তানদের গ্রহণ করবে। মুক্তিযুদ্ধকে যারা হৃদয়ে ধারণ করে, তারা নিশ্চয়ই এই প্রশ্নে নিরুত্তর থাকবে না।
এই বিষয় নিয়ে এখন লেখালেখি হচ্ছে। সর্বশষ নতুন একটি বিষয় জানলাম—সব যুদ্ধশিশু যে পাকিস্তানি হানাদারদের ঔরসজাত, তা নয়। যুদ্ধকালীন অনেক মা নবজাতক শিশুকে রেখে পালিয়েছেন প্রাণ বাঁচাতে। কেউ বা সমাজের ভয়ে, কেউ হয়তো অসহায় নিরুপায় হয়ে শিশুকে তুলে দিয়েছিলেন মিশনারিজ অব চ্যারিটির হাতে। জরিনা কিংবা বাতুল হয়তো তেমনই একজন।
আজ এই ইতিহাসকে নতুন আলোয় দেখা দরকার। শুধু সাংবাদিকতা নয়, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় এই ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লিখতে হবে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি রাজনৈতিক সংগ্রাম নয়, এটি ছিল এক বিশাল মানবিক বিপর্যয়ও। যুদ্ধশিশুরা তারই এক নীরব সাক্ষী।
২৮ ডিসেম্বর ১৯৯৭









