নওগাঁ

রাতে ওয়ার্ড বয় দিনে ডাক্তার; মানবিক বিভাগে এইচএসসি পাস করেই এমবিবিএস ডিগ্রী!

নওগাঁ, ১২ অক্টোবর- নওগাঁর বদলগাছীর পাহাড়পুর একিয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকের বিরুদ্ধে অভিনব কায়দায় দিনে ডাক্তার ও রাতে ওয়ার্ড বয় পরিচয়ে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে।

তথ্য সংগ্রহকালে জানা যায়, পাহাড়পুর একিয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক জাহিদুল ইসলাম মানবিক বিভাগে ১৯৯৮ সালে মাধ্যমিক ও ২০০০ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ২০০৪ সালে কলকাতা থেকে নিয়েছেন এমবিবিএস বলে সবার কাছে বলে বেড়ান। কিন্তু তার রয়েছে গ্রাম ডাক্তারের সনদপত্র। নিজেকে তিনি অভিজ্ঞ ডাক্তার বলে পরিচয় দেন। রোগী দেখার নিয়মিত বিরতীতে নিজেই করছেন আলট্রাসনো, ইসিজি এবং এক্সরে। তার একই স্বাক্ষর রয়েছে ব্যবস্থাপত্রের পাশাপাশি এসব প্রতিটি রিপোর্টে।

জাহিদুল ইসলাম নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার উত্তর রামপুর গ্রামের সুবিদ আলীর ছেলে। জাহিদুল পার্শ্ববর্তী জয়পুরহাট জেলা সদরের রওশন ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এমএলএসএস পদমর্যাদার একজন ওটি বয় (অপারেশন থিয়েটারে সাহায্যকারী) হিসেবে কর্মরত। এখানে তিনি রাতের বেলা ডিউটি করেন। দিনের বেলা ডাক্তার হলেও রাতে তিনি ওর্যাড বয়। প্রায় পাঁচ বছর ধরে অবৈধভাবে ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি চালিয়ে আসছে তিনি।

পাহাড়পুর ইউনিয়ন পরিষদের পাশেই একিয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অবস্থান। প্রতিষ্ঠানটির মালিক জাহিদুল ইসলামের নিকট প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, রাতে তিনি জয়পুরহাটের একটি ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ওটি বয় হিসেবে কাজ করেন। তার নামের আগে ডাক্তার শব্দটি ব্যবহার করেন না বলে তিনি দাবি করেন। তবে উপস্থিত রোগীদের কাছে নিজেকে ডাক্তার হিসেবে পরিচয় দেওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি নিরুত্তর থাকেন।

আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জ-১ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিলেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়

এইচএসসিতে কোন কোন সাবজেক্ট ছিল এমন প্রশ্নে বাংলা এবং ইংরেজি ছাড়া অন্যগুলি তিনি মনে করতে পারেননি। ভারতের শিয়ালদহ স্টেশন সংলগ্ন ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব অল্টারনেটিভ মেডিসিন কলকাতা থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি নিয়েছেন বলে দাবি করলেও বলতে পারেননি এমবিবিএস এর পুরো অর্থ। মানবিক বিভাগের ছাত্র হয়ে এমবিবিএস বা ডাক্তারি পড়া যায় কি না? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ওটা আমার ভুল হয়েছে’।

বিধি মোতাবেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরীক্ষাগার হতে হবে ৫৭৬ বর্গফুটের। কালেকশন রুম, স্টোর রুম এবং প্যাথলজিস্ট রুম হতে হবে কমপক্ষে ১৫০ বর্গফুটের হতে হবে যা সেখানে নেই। এ বিষয়ে জাহিদুল ইসলাম অকপটে স্বীকার করেন, তার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো ডাক্তার বা প্যাথলজিস্ট কিংবা সনোলজিস্ট নেই। সবাই অনকলে আসেন অথবা অনলাইনে রিপোর্ট দেখে দেন।

অনলাইনে রিপোর্ট দেখা সম্ভব হলেও তাদের স্বাক্ষর কিভাবে নেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তারা আগেই স্বাক্ষর করে রাখেন। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের রিপোর্ট দেখা এবং স্বাক্ষরের কথা বললেও এখানকার ইসিজি, এক্সরে এবং আলট্রাসনোগ্রামের প্রত্যেকটিতে তিনি নিজেই স্বাক্ষর করেন। নিয়ম অনুযায়ী টেকনোলজিস্ট এবং ডাক্তার না থাকাসহ অন্যান্য বিষয় স্বীকার করে তিনি বলেন, আশপাশের জেলা ও উপজেলার সকল ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো এভাবেই চলে।

তিনি জানান, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রেজিস্ট্রেশন নবায়নের সময় তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে আবেদন করেন। মিথ্যা তথ্য দিয়ে কিভাবে কাজটি করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা আছে।

নওগাঁর সিভিল সার্জন ডা. এবিএম আবু হানিফ বলেন, একিয়া ডায়াগনিস্টিক সেন্টারের বিষয়ে বদলগাছী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কানিস ফারহানাকে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রবিবার সকাল ১০টায় উপজেলা পরিষদ হলরুমে আইন শৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি আলোচনা হয়। উক্ত সভায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কানিজ ফারহানা বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবগত করার পর নির্দেশনা মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সূত্র : কালের কণ্ঠ
এন এইচ, ১২ অক্টোবর

Back to top button