মুক্তমঞ্চ

ট্রাম্পের অভিশংসন, এরপর কী

আলী রীয়াজ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো অভিশংসিত হয়েছেন। দেশের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো কোনো প্রেসিডেন্ট দুবার অভিশংসিত হলেন, তা–ও ঘটল এক মেয়াদেই এবং ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র সাত দিন আগে। ট্রাম্পের মেয়াদে তাঁর আচরণ এবং অসংখ্য নজিরবিহীন ঘটনার মতোই এই ঘটনাও অভূতপূর্ব। প্রতিনিধি সভা তাঁকে অভিশংসিত করেছে ৬ জানুয়ারি কংগ্রেসে হামলায় উসকানি দেওয়ার জন্য।

অভিযোগে বলা হয়েছে যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দিয়েছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অখণ্ডতাকে (ইনটেগ্রিটি) হুমকি দিয়েছেন, শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে হস্তক্ষেপ করেছেন এবং সরকারের একটি অংশকে বিপন্ন করেছেন। মঙ্গলবার প্রতিনিধি সভায় ২২২ জন ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান পার্টির ১০ জন সদস্য প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন; এতে এই অভিশংসন প্রস্তাব দুই দলের সমর্থনেই পাস হলো।

ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষ থেকে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এই অভিশংসনের ব্যবস্থা নেওয়ার আর কোনো বিকল্প ছিল না। কেননা, আইনের শাসন জারি রাখা, প্রেসিডেন্ট যে আইনের ঊর্ধ্বে নন, সেটা প্রতিষ্ঠা করা; ভবিষ্যতে এ ধরনের আচরণের আশঙ্কাকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করা, সেটা আর অন্যভাবে এতটা স্পষ্ট করা যেত না। যাঁরা সহিংসতায় জড়িত ছিলেন, তাঁদের ও তাঁদের প্রতি সহানুভূতিশীলদের এই বার্তা পাঠানোও এই বিচারের উদ্দেশ্য যে এ ধরনের বিদ্রোহের চেষ্টাকে সাংবিধানিক এবং আইনিভাবেই মোকাবিলা করা হবে। এ ধরনের পদক্ষেপ না নিলে ডেমোক্র্যাটরা এবং যাঁরা এ অভ্যুত্থানপ্রচেষ্টাকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি বলে মনে করেন, তাঁদের নৈতিক দুর্বলতাই প্রকাশিত হতো। কিন্তু এটাও ঠিক যে এই পদক্ষেপের রাজনৈতিক বিপদও আছে।

প্রক্রিয়াগতভাবে এই প্রস্তাব এখন সিনেটে যাওয়ার কথা এবং সেখানে বিচার অনুষ্ঠানের কথা, কিন্তু সিনেট এখন ছুটিতে, আবার অধিবেশনে বসবে ১৯ জানুয়ারি। সিনেটের বিদায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা রিপাবলিকান পার্টির নেতা মিচ ম্যাককনেল বলেছেন, প্রস্তাবটি ২০ জানুয়ারির পর বিবেচিত হবে। যুক্তি হিসেবে তিনি বলছেন যে দেশের জন্য এখন নতুন প্রশাসনের ক্ষমতা গ্রহণ প্রাধান্য পাওয়া দরকার। এটা স্পষ্ট যে মিচ ম্যাককনেল অভিশংসনের ব্যাপারে অনুৎসাহী না হলেও এই মুহূর্তেই ট্রাম্প–সমর্থকদের বিরাগভাজন হতে রাজি নন। অন্যদিকে ২০ তারিখের পর যিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হবেন—ডেমোক্র্যাট চাক শুমার—তিনি বলেছেন, আজ হোক কী কাল, বিচার হবেই।

বিচারে ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করতে দরকার হবে ৬৬ জন সিনেটরের সমর্থন। মনে করা হচ্ছে যে মেয়াদ শেষে ক্ষমতা থেকে ট্রাম্প চলে যাওয়ার পর অনেক রিপাবলিকান সিনেটর তাঁর বিচারের এবং দোষী সাব্যস্ত করার পক্ষে ভোট দিতে পারেন। তিনি দোষী সাব্যস্ত হলে সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটেই তাঁকে রাজনীতিতে এবং সরকারি কোনো পদে অযোগ্য বলে ঘোষণা করা যায়। ইতিমধ্যেই মিচ ম্যাককনেল এবং একাধিক রিপাবলিকান সিনেটর ইঙ্গিত দিচ্ছেন, তাঁরা চাইছেন যে দলকে ট্রাম্পের প্রভাবমুক্ত করতে। ফলে এই মুহূর্তে সিনেটে বিচার না হলেও ভবিষ্যতে সিনেটে যে ট্রাম্পের বিচার হবে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

কেউ কেউ এ রকম পরামর্শ দিচ্ছেন যে এই বিচার বাইডেন প্রশাসনের ১০০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর করার জন্য। জো বাইডেন এই অভিশংসনের প্রেক্ষাপটে সিনেটকে ‘সাংবিধানিক দায়িত্ব’ পালন এবং তাঁর মনোনীত মন্ত্রিসভার সদস্যদের অনুমোদনের কাজ করতে অনুরোধ করেছেন। তিনি চাইছেন না যে সিনেট এই বিচারকাজে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ুক যে তাঁর মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেতে দেরি হোক।

সিনেটে মন্ত্রিসভা অনুমোদন এবং নতুন প্রশাসন ১০০ দিনের কাজ শেষ করার পর বিচার অনুষ্ঠানের যাঁরা বিরোধিতা করছেন তাঁদের যুক্তি হচ্ছে, এতে এ বিষয়ের যে জরুরি গুরুত্ব অবসিত হবে; ট্রাম্প এবং তাঁর সমর্থকেরা একে ডেমোক্র্যাটদের ব্যর্থতা বলেই উপস্থাপন করতে সক্ষম হবেন এবং সব মিলিয়ে বিষয়টি জনমতকে প্রভাবিত করবে।

অভিশংসনের বিরূপ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কাও আছে। রিপাবলিকান পার্টির একাংশ এখন এটাই বলার চেষ্টা করছে যে ট্রাম্পকে অভিশংসন করে সহিংসতার পথ খুলে দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মঙ্গলবার টেক্সাসে দেওয়া ভাষণে অভিশংসন আরও ক্ষোভ এবং সহিংসতা তৈরি করবে বলে যে মন্তব্য করেছেন, তা তাঁর সমর্থকদের উদ্দেশে একধরনের ইঙ্গিত। ৬ জানুয়ারির হামলা বিষয়ে পাওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে যে এই হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছে অনেক দিন ধরে। ফলে এই গোষ্ঠী ৬ জানুয়ারির ব্যর্থ চেষ্টার পর পিছিয়ে পড়বে, এমন মনে করার কারণ নেই। সহিংস হামলার পরিকল্পনাকারীরা আগেই কংগ্রেসের কোনো কোনো সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং এ ধরনের সমাবেশের প্রস্তুতির বিষয়ে তাঁরা জানতেন বলেও কিছু প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এফবিআই সারা দেশ থেকে যাঁদের আটক করছে দেখা যাচ্ছে যে তাঁরা সমাবেশে যোগ দিতে নয়, কংগ্রেস ভবনে হামলার প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলেন।

আরো পড়ুন:  আমাদের আয়শা আপা

ইতিমধ্যেই দেশের প্রতিটি রাজ্যের সংসদ ভবনে হামলার আশঙ্কার কথা এফবিআই বলেছে। জো বাইডেনের শপথ গ্রহণের আগে ও ২০ জানুয়ারি আরও সহিংসতার আশঙ্কায় সারা দেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

আশু সহিংসতার উদ্বেগের পাশাপাশি ভবিষ্যতে ট্রাম্প–সমর্থক গোষ্ঠী কী আচরণ করবে, সেটাও বড় বিষয়। দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের উগ্র সহিংস গোষ্ঠীগুলো বিকশিত হয়েছে, কিন্তু তাদের প্রতি গোয়েন্দারা নজর দেয়নি, সমাজের ভেতরে বিরাজমান ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে তারা সংগঠিত হয়েছে এবং গত কয়েক মাসে তাদের মিথ্যা বলে এমনভাবে প্রভাবিত করা হয়েছে যে এখন এই ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে একটা বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা, সহিংস সংগঠন ও ট্রাম্পের মতো বিষাক্ত নেতৃত্বের উপস্থিতি এবং রিপাবলিকান পার্টির এক বড় অংশের সমর্থন অব্যাহত থাকা সামনের দিনগুলোতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট।

আর/০৮:১৪/১৬ জানুয়ারি

Back to top button