মুক্তমঞ্চ

ইংরেজি নববর্ষের শঙ্কা ও প্রত্যাশা

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

একটা নতুন বছরের যাত্রা শুরু হলো। গতায়ু বছরটি বিশ্বের সকল মানুষের জন্য রেখে গেছে এক ভয়াবহ মৃত্যুর থাবা। সেই থাবা থেকে নতুন বছর আমাদের মুক্তি দেবে কিনা আমরা জানি না। একটি মাত্র সুসংবাদ, আমেরিকা এবং ব্রিটেন দু’দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানীরাই এই কভিড-১৯-এর প্রতিষেধক ভ্যাকসিন তৈরি করেছেন। এর কার্যকারিতা কতটা, শিগগিরই তা বোঝা যাবে। ব্রিটেনে এই টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। আমেরিকাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও এই টিকাদানের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশও এই ভ্যাকসিন কেনা এবং সকল মানুষকে তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এই ভ্যাকসিন কেনার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তাও চেয়েছেন। আশা করা যায়, এই নতুন বছরে বাংলাদেশেও এই টিকাদান শুরু হবে। কথা হলো, এই টিকা গ্রহণ করার আগেই সারাবিশ্বে আরও কত লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটবে, তা অনুমান করতে কষ্ট হয় না। সম্প্রতি ব্রিটেনে এক দিনেই নয়শ’ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

আরো পড়ুন:  হঠাৎ এই পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটার কারণ কী?

লন্ডনসহ বিভিন্ন শহরে কঠোর লকডাউন প্রবর্তন করা হয়েছে।এই লকডাউনের মধ্যে মানুষ আর কতকাল বাস করবে? তাদের অবস্থা এখন প্রাগৈতিহাসিক যুগের আদিম গুহাবাসী মানুষের মতো। খাদ্যের সন্ধানে একবার সতর্কভাবে বাইরে বেরিয়ে তারপর হিংস্র জীবজন্তুর ভয়ে দ্রুত গুহায় ফিরে আসা। বর্তমান গুহাবাস বা লকডাউনে মানুষ দীর্ঘদিন বন্দিদশায় থেকে দিশেহারা। তার পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে ভাঙন ধরেছে। অর্থনেতিক জীবনে এক মহামন্দার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। গত শতকের অর্থনৈতিক মন্দা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ডেকে এনেছিল। এবারের মহামন্দা পৃথিবীর জন্য আবার কী মহাদুর্যোগ ডেকে আনে, তা ভেবে অনেকেই শঙ্কিত।

এই শঙ্কা ও প্রত্যাশা নিয়েই সারাবিশ্বের মানুষ নতুন বছর ২০২১-কে বরণ করেছে। সকলের মনেই প্রত্যাশা- ব্যাপকভাবে টিকাদান শুরু হলে করোনা থেকে একেবারে মুক্তি না হোক, কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যাবে। টিকাদান যত দ্রুত হচ্ছে, কভিডের আক্রোশও তত দ্রুত বাড়ছে। সন্দেহ নেই, এটা ন্যাচার এবং হিউম্যানিটির লড়াই। চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। কখনও ঝড়-বন্যা-সাইক্লোনের বেশে; কখনও দুর্ভিক্ষ, মন্বন্তর, মহামারির বেশে প্রকৃতির নিরন্তর মানুষ তথা প্রাণিজগৎকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আসছে।

এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করেই প্রাণিজগৎ বেড়ে উঠেছে। প্রকৃতিকে বহুবার মানুষের বৈজ্ঞানিক প্রতিভা পরাজিত করেছে। একেকটি রোগ একেক সময় মহামারি রূপে এসেছে। এক সময় ম্যালেরিয়ায় বাংলাদেশে বছরে ৫০ লাখ লোকের মৃত্যু হতো। মৃত্যু হতো কলেরা, বসন্ত ও যক্ষ্ণায়। এসব রোগ মানুষের চিকিৎসাবিজ্ঞান পরাভূত করেছে। ক্যান্সারকেও পরাভূত করতে চলেছে। সন্দেহ নেই, কভিড-১৯ চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের কাছে পরাভূত হবে। তবে এই পরাজয়ের আগে কভিড আরও কত লাখ মানুষের প্রাণ হরণ করবে- সেটিই হলো প্রশ্ন।

এই নতুন বছরে বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা, কভিডের মরণ ছোবল থেকে তারা রাতারাতি মুক্তি না পাক, তাকে প্রতিরোধের শক্তি পাবে। এই শক্তি ভ্যাকসিন। চীন এবং রাশিয়াও তাদের নিজস্ব ভ্যাকসিন বের করেছে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা বুঝতে আগামী শীতকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এই সতর্কবাণী সত্ত্বেও মানুষের অদম্য প্রাণশক্তি কভিডকে অগ্রাহ্য করে তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবন পুনর্গঠনে আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

আমেরিকায় করোনার মহাবিপর্যয় সত্ত্বেও গত বছর নভেম্বর মাসে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবার সর্বাধিক ভোটার ভোটদানে অংশগ্রহণ করেছেন। ট্রাম্পের সমর্থকরা বিভিন্ন শহরে কভিডকে উপেক্ষা করে বড় বড় র‌্যালি করেছেন। ট্রাম্প নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরও তারা আমেরিকায় বড় বড় প্রতিবাদ মিছিল করেছেন। ট্রাম্প ভোটে বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হওয়া সত্ত্বেও পরাজয় মানতে চাচ্ছেন না। বরং হুমকি দিয়েছেন, তিনি আমেরিকায় সামরিক শাসন প্রবর্তন করতে চান। যদিও তার ইচ্ছা পূরণ হবে না, তথাপি গতায়ু বছরটির বৈশিষ্ট্য হলো, গণতান্ত্রিক বিশ্বের নেতা বলে কথিত মহাশক্তিধর আমেরিকাতেই এবার সামরিক শাসন প্রবর্তনের হুমকি শোনা গেল।

কথায় বলে, ‘তুমি যার জন্য গর্ত খুঁড়বে, সেই গর্তে তোমাকেই পড়তে হবে।’ আমেরিকা এ যাবৎ পৃথিবীর সদ্য স্বাধীন দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক শাসন উচ্ছেদ করে রক্তাক্ত পথে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠায় সাহায্য জুগিয়ে এসেছে। বিধির কী বিধান। আজ সেই আমেরিকাতেই সামরিক শাসন প্রবর্তনের হুমকি শোনা যাচ্ছে। এই হুমকিকে এখনই অবশ্য ভয় করার কিছু নেই। কিন্তু আমেরিকার সুপার পাওয়ার স্টেটাস এবং বিশ্ব নেতৃত্ব কতটা বজায় থাকবে, তা নির্ভর করছে নতুন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট জো বাইডেন কতটা দ্রুত আমেরিকার সামরিক ও রাজনৈতিক জীবনকে অশুভ, ফ্যাসিবাদী ও বর্ণবাদী ট্রাম্পইজমের কবল থেকে মুক্ত করতে পারেন এবং নতুন আমেরিকা গড়তে পারেন তার ওপর। আর বাইডেনের এই প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে, তা বোঝা যাবে এই নতুন ২০২১ সালেই।

বাংলাদেশে ২০২০ সালটি ছিল একটি মহাপ্রতীক্ষিত বছর। এটা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী পালনের বছর। বছরটি ঘোষিত হয়েছিল মুজিববর্ষ হিসেবে এবং কভিডের মরণ ছোবল শুরু হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের মানুষ নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্মরণ করেছে এবং শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে জাতির পিতাকে। বিশ্বজুড়েই মুজিববর্ষ পালিত হয়েছে। ২০২০ সালটি যেমন ছিল মুজিববর্ষ পালনের উন্মাদনার বছর, তেমনি এই বছরেই করোনার পাশাপাশি সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতাকে আবার বাংলাদেশের বিষাক্ত ফণা তুলতে দেখা গেছে।

এই ধর্মান্ধতা গতায়ু বছরে দুঃসাহস দেখিয়েছে জাতির পিতার ভাস্কর্য ভাঙার কাজে হাত দিয়ে। এই অপকর্ম থেকে তাদের নীরত করা হয়েছে। কিন্তু তাদের বিষদাঁত এখনও ভাঙেনি। কী করবে হাসিনা সরকার? জনগণের শক্তিকে সংহত করে একাত্তরের মতো লড়াকু ভূমিকা গ্রহণ করবে, না আপসের চোরাবালিতে পা রাখবে, তা স্পষ্ট হবে এই নতুন বছর ২০২১ সালে। এই সালটি শুধু বিশ্ববাসীর জন্য নয়, বাংলাদেশের মানুষের জন্যও একটি ক্রান্তিকালের বছর। বাংলাদেশ হাসিনা সরকারের আমলে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করেছে। কিন্তু এখন দেশের অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক অস্তিত্বের ওপর যে আঘাত এসেছে, এই সরকার পারবে কি সচেতনভাবে সেই আঘাতকে প্রতিহত করতে? এ ব্যাপারে সরকারের সক্ষমতার ওপর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

আজ থেকে একশ বছর আগের ১৯২১ সালটিও ছিল বিশ্ব এবং উপমহাদেশের জন্য একটি ক্রান্তিকাল। প্রথম মহাযুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে। পরাধীন উপমহাদেশ গর্জাচ্ছে স্বাধীনতার জন্য। অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে অবিভক্ত বাংলাসহ সারা উপমহাদেশে। ওই বছরে ভবিষ্যতে যিনি হবেন একটি স্বাধীন বাঙালি জাতির স্থপতি, সেই শেখ মুজিবুর রহমান তখন এক বছরের শিশু। উপমহাদেশের রাজনীতিতে তিনি গান্ধীর অহিংস অসহযোগ ও নেতাজি সুভাষের সশস্ত্র সংগ্রামের আদর্শের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে এক ইতিহাস তৈরি করে গেছেন। সামরিক শাসনের দানবকে রুখেছেন। তার সেই পন্থায় একশ বছর পর ২০২১ সালে সাম্প্রদায়িকতার দানবকে রোখার জন্য কোনো শক্তি সাহসের সঙ্গে দাঁড়ায় কিনা তা এখন দেখার রইল।

নানা শঙ্কা সত্ত্বেও বিশ্বাবাসী আজ নতুন প্রত্যাশা নিয়ে নতুন বছরকে বরণ করেছে। প্রকৃতি ও মানবতার মধ্যে এবারের মহাযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তৈরি হবে মানুষের নতুন সমাজ। সমাজ পাল্টাবে, রাজনীতি পাল্টাবে, পাল্টাবে অর্থনীতিও। কভিডের ভয়াবহ অভিশাপের আড়ালে হয়তো একটি আশীর্বাদ অপেক্ষা করছে, তা হলো হিংস্র পশ্চিমা ক্যাপিটালিজমেরও হয়তো এবার কবর তৈরি হবে।

আর/০৮:১৪/২ জানুয়ারি

Back to top button