অভিমত/মতামত

স্কাউটিং যাত্রা যেভাবে শুরু হয়েছে…

এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন

আজ ২২ শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৪। আজকের এই দিনে আমরা পেয়েছি এক নেতাকে। যে নেতার কারণে যুবকরা তারা তাদের অনুপ্রেরণা জাগিয়ে দিয়ে চলে গেছে। তিনি যুবককে বেঁচে থাকার পদ্ধতি শিখে গেছেন। তার জন্য আজ পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা যাকে বি. পি নামে চিনে। যার জন্য যুবকরা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছে, সে আর কেউ না, স্কাউট আন্দোলন প্রতিষ্ঠাতা, ব্যাডেন পাওয়েল। তার জন্য আজ স্কাউট আন্দোলন পুরোপুরিভাবে সক্রিয়।

তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন ১৮৫৭ সালে ২২ ফেব্রুয়ারিতে লন্ডনে। তার বাবা এইচ. জি ব্যাডেন পাওয়েল, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি অধ্যাপক ছিলেন। তার মা হেনেরিটা গ্রিস স্মিথ, গৃহিণী ছিলেন। তার পুরো নাম রবার্ট স্টিফেনসন স্মিথ লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল অব গিলওয়েল। তার ছোটবেলা ছিলো খুবই রোমাঞ্চকর। তিনি প্রায় জঙ্গলে বাস করতেন। সেখানে তিনি দড়ির কাজ শিখতেন, গাছের গুঁড়ি নিয়ে খেলাধুলা করতেন ও নতুন নতুন জায়গায় যেতেন। জঙ্গলে রাত্রিযাপনের জন্য তিনি ট্রি হাউস তৈরি করতেন। এসব কার্যক্রম কারণে তিনি খুব সহজে সেনা জীবনে উত্তীর্ণ করতে পেরেছেন।

১৮৭৬ সালে সেনাবাহিনীতে সাব লেফটেন্যান্ট পদে নিয়োগের মাধ্যমে তার সেনা জীবন শুরু হয়। তিনি থার্টিন হুসার্স দলের তার প্রথম পোস্টিং। তারপর ১৮৮০ সালে মায়ওনাড যুদ্ধে মানচিত্র অঙ্কনের দ্বায়িত্ব পান। পরে বিভিন্ন যুদ্ধে সাফল্যতার সাথে জয় লাভ করেন। তার জীবনে শেষ যুদ্ধ ছিলো ম্যাফেকিং (আফ্রিকার একটি শহর) যুদ্ধ। সেখানে তিনি ২১৭ দিন অবরুদ্ধ ছিলেন। এই ম্যাফেকিং যুদ্ধের সময় তিনি ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্ব ধারণা লাভ করেন। ম্যাফেকিং যুদ্ধের জয়ের পর তিনি মেজর জেনারেল পদে উত্তীর্ণ হন।

১৯০৭ সালে ২০ জন বালকে ব্রাউন সি দ্বীপে প্রথম পরীক্ষা মূলক ক্যাম্পের মাধ্যমে স্কাউট আন্দোলন শুরু হয়েছিলো৷ পরে ১৯০৮ সালে ব্যাডেন পাওয়েল লেখা বই “Scouting for Boys”। এই বইয়ের মাধ্যমে ছড়িয়ে গিয়েছিলো স্কাউটিং। পরে ১৯০৯ সালে সিঙ্গাপুর, চিলি, আমেরিকা, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জাপান ইত্যাদিতে ছড়িয়ে পড়েছিলো। ১৯২২ সালে তিনি ওলিভ সোমেজরকে বিয়ে করেন। পরে ১৯১০ সালে সেনাবাহিনীতে থেকে অবসর নেন।পরে ১৯১৬ সালে ১১ বছরের নিচে শিশুদের জন্য “কাব স্কাউট” তৈরি করেন। ১৯১৮ সালে ১৮ বছরের যুবকদের জন্য রোভারিং শুরু করেছেন। এভাবে স্কাউটিং সম্প্রসারণ শুরু হয়।

১৯২০ সালে ইংল্যান্ডে অলিম্পিয়াতে প্রথম বিশ্ব স্কাউট জাম্বুরী অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ব স্কাউট সংস্থা। পরে ১৯২২ সালে তিনি লর্ড উপাধিতে ভূষিত হন। পরে তার শেষ বয়সে তিনি কেনিয়াতে বসবাস করতেন। ১৯৪১ সালে ৮ ই জানুয়ারি কেনিয়াতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

বাংলা উপমহাদেশে স্কাউটিং শুরু হয়েছিলো ১৯১০ সালে, তবে সেটা ছিলো ইংরেজদের জন্য। ১৯১৯ সালে সেটা সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ১৯৩৮ সালে ভারত বয় স্কাউট সমিতি বিশ্ব স্কাউট সংস্থা স্বীকৃতি লাভ করে।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৪৭ সালে ১লা ডিসেম্বর করাচিতে পাকিস্তান বয় স্কাউট সমিতি গঠিত হয়। সে সময় বাংলাদেশ ছিলো পাকিস্তানের প্রদেশ নাম পূর্ব পাকিস্তান। সেখানে গঠিত পূর্ব পাকিস্তান বয় স্কাউট সমিতি।

১৯৫৮ সালে পাকিস্তান বয় স্কাউটের দ্বিতীয় জাতীয় জাম্বুরী ৩৫০০ স্কাউট সদস্য নিয়ে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান বয় স্কাউটের পঞ্চম জাতীয় জাম্বুরীতে মৌচাকে অবস্থিত পূর্ব পাকিস্তান বয় স্কাউট এর নতুন ট্রেনিং সেন্টারের মাঠ ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়, ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে এর নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ বয় স্কাউট অ্যাসোসিয়েশন করা হয়। পিয়ার আলী নাজির নিযুক্ত হন প্রথম প্রধান জাতীয় কমিশনার।

১৯৭২ সালের ৮-৯ এপ্রিল সারাদেশের স্কাউট নেতৃবৃন্দ ঢাকায় এক সভায় মিলিত হয়ে গঠন করেন বাংলাদেশ স্কাউট সমিতি। ঐ বছরের ৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ১১১ নং অধ্যাদেশ বলে উক্ত সমিতি সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে।

১৯৭৪ সালে বিশ্ব স্কাউট সংস্থা বাংলাদেশ বয় স্কাউট সমিতিকে ১০৫ তম সদস্য হিসেবে স্বীকৃত লাভ করে।

১৯৭৮ সালে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় “বাংলাদেশ স্কাউটস”। এভাবে বাংলাদেশে স্কাউটিং প্রসার হতে থাকে। ঐ একই বছরে প্রথম জাতীয় স্কাউট জাম্বুরী অনুষ্ঠিত হয়। এখন সংখ্যাগত দিক বিশ্বের বাংলাদেশ স্কাউটসের অবস্থান ৫ম।

স্কাউটিং একটি অরাজনৈতিক সংগঠন, যেখানে লক্ষ্য হলো শারীরিক, মানসিক, আত্মিক উন্নয়নের মাধ্যমে দ্বায়িত্ব নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। সমগ্র বিশ্বের ভ্রাতৃত্বের আদর্শ প্রচার করে এই স্কাউটিং। দেশের প্রতি দ্বায়িত্ব সচেতন হতে স্কাউটিং শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের স্কাউটরা বিভিন্ন সরকারি কাজে সহযোগিতা করে থাকে। যেমন: হজ্জ ক্যাম্প, বিভিন্ন সরকারি দিনগুলো যেমন: বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, শোক দিবস ইত্যাদি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্কাউটরা তাদের কার্যক্রম যথাযথভাবে পালন করে আসে।

ঈদের যাত্রা সময় যাত্রীদের অসুবিধা না হয় সেজন্য স্কাউটরা কার্যক্রমে যোগ দেয়। ফলে এতে ঈদের সময় যাত্রীদের চাপের পরিমাণ অনেকাংশ কমে যায়।

বন্যা বা যেকোনো দূর্যোগের সময় স্কাউটরা সবসময় পাশে থাকে। তারা তাদের নিজস্ব অর্থয়ানে ত্রাণ বিতরণ করে৷ শুধু এটাও না, দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় গিয়ে ২৪ ঘন্টা মানুষকে সেবা দিতে থাকে এবং দূর্যোগ থেকে মানুষকে রক্ষা করে। স্কাউটরা অবদানের কারণে এলাকাবাসীরা রক্ষা পায়।

বিভিন্ন আইসিটি প্রোগ্রামে স্কাউটদের অংশগ্রহণ খুবই প্রশংসনীয়। তারা মানুষকে সাইবার অপরাধে সচেতনতা সৃষ্টি করতে সহায়তা করে। স্কাউটরা বিভিন্ন যকন্টেন্ট, ফটোগ্রাফি, ভিডিও এডিটিং, কম্পিউটার বিভিন্ন কার্যক্রম পারদর্শী। ফলে ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপান্তরিত করতে তাদের অবদান প্রশংসনীয়।

বিভিন্ন স্কাউটের আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে স্কাউটদের অংশগ্রহণ প্রশংসনীয়। আমাদের দেশের স্কাউটদের অংশগ্রহণ ও কার্যক্রম যথাযথ ভাবে পালন করা দেখে বিশ্ব স্কাউট সংস্থা বাংলাদেশ স্কাউটসকে অনেক প্রশংসা করেছে।

স্কাউটিং মাধ্যমে তরুণ-তরুণীদের চরিত্র গঠনের মাধ্যমে তারা দেশের সুনাম ধরে রাখতে পেরেছে। এই আন্দোলনের মাধ্যমে তারা সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে এবং একজন যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে পরবর্তীতে দেশের নেতৃত্ব দিতে পারবে। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্কাউটিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

তবে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে অনেকে স্কাউটিং ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। এটা খুবই দূর্ভাগ্যের বিষয়। এতে যে নতুন জ্ঞান, নতুন দক্ষতা শিখতে পারতো সেটা তারা আর পারছে না। তবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার।

ব্যাডেন পাওয়েল স্কাউটদের উদ্দেশ্য একটি শেষ বার্তা দিয়েছিলেন,

“পৃথিবীকে যেমন পেয়েছে, তার চেয়ে আর একটু সুন্দর করে যেও।”

নাম: এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন।
দলের নাম: ২১৪ নং আমরা স্কাউট গ্রুপ, ঢাকা।
জেলা: বাংলাদেশ স্কাউটস, ঢাকা জেলা রোভার।


Back to top button
🌐 Read in Your Language