জাতীয়

শেষ সাক্ষাতে মাফ চাইলেন মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অপেক্ষায় থাকা দুই আসামি

ঢাকা, ২৫ জুলাই – রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস তাহের আহমেদ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অপেক্ষায় থাকা দুই আসামি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও জাহাঙ্গীর আলম যেকোনো সময় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষ কিছু জানায়নি।

পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে আজ (মঙ্গলবার) রাতেই ফাঁসি হতে পারে। এর মধ্যে স্বজনেরা স্বজনদের সঙ্গে শেষ সাক্ষাত করেছেন। এছাড়া দুপুরে কারাগারের ভেতরে রাজশাহী জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন, ডিআইজি প্রিজন ও কারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সভা হয়েছে।

বেলা ১১টার দিকে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের স্বজনেরা সাক্ষাৎ করেন। পরে দুপুর পৌনে একটার দিকে আরেক আসামি জাহাঙ্গীর আলমের পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাবা আজিম উদ্দিন ও বড় ভাই সোহরাব আলী, ছোট ভাই মিজানুর রহমানসহ ৪০-৪৫ জন স্বজন সাক্ষাৎ করতে আসেন। সাক্ষাৎ শেষে উভয় আসামির স্বজনেরা নীরবে বেরিয়ে যান। তবে একটি সূত্র জানিয়েছেন, স্বজনদের কাছে মাফ চেয়েছেন দুই আসামী মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও জাহাঙ্গীর আলম।

এ ব্যাপারে আসামি জাহাঙ্গীর আলমের ছোট ভাই মিজানুর রহমান বলেন, গত রোববার কারা কর্তৃপক্ষ আমাদের চিঠি দিয়েছিল। রিট পেন্ডিং থাকায় আমরা তখন দেখা করিনি। রিট নিষ্পত্তি হওয়ার পর আজ আমরা দেখা করেছি। আমাদের পরিবারের প্রায় ৩৫ জন দেখা করতে এসেছিলো।

জাহাঙ্গীর আলমের ফুফু মোসা. মদিরুন বেগম বলেন, যেডি কথা বুলার দরকার সেডি বুললো। কথা কলো। ভালো থাকেন। দুয়া করেন। আমি দুয়া করিছি। বুললো কান্দেন না, কান্নাকাটি করেন না, দুয়া করেন। যতটুকু পারনু দুয়া করনু।

জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই নবাব বলেন, ভাই বলেছে ভালো থেকো। দোয়া করো। এর বাইরে কিছু বলেনি।

জাহাঙ্গীরের এক ভাতিজা বলেন, আমাদের মাঝখানে নেট ছিল। ছুঁয়ে দেখা যায়নি। ক্ষমা চেয়েছে, আর কান্নাকাটি করেছে। হালকা কথাবার্তা হয়েছে।

আরেক স্বজন লতিফা বলেন, কান্নাকাটি করছিল। সবার থেকে মাফ চাচ্ছিল। আর বেশি কথা বলেনি।

প্রসঙ্গত, ২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পশ্চিমপাড়া আবাসিক কোয়ার্টার থেকে অধ্যাপক তাহের নিখোঁজ হন। ওই বাসায় তিনি একাই থাকতেন। কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীর তার দেখাশোনা করতেন। পরদিন বাসার পেছনের ম্যানহোল থেকে অধ্যাপক তাহেরের গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি তার ছেলে সানজিদ আলভি আহমেদ রাজশাহীর মতিহার থানায় অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

অধ্যাপক তাহেরের করা একটি জিডির সূত্র ধরে বিভাগের শিক্ষক মহিউদ্দিন ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি মাহবুবুল আলম সালেহী, কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীর সহ আটজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর ৫ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তারদের মধ্যে তিনজন আদালতে জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে তারা বলেন, অধ্যাপক এস তাহের বিভাগের একাডেমিক কমিটির প্রধান ছিলেন। একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মহিউদ্দিন অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য কমিটির সুপারিশ চেয়ে আসছিলেন। কিন্তু গবেষণা জালিয়াতির কারণে অধ্যাপক তাহের তা দিতে অস্বীকার করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মহিউদ্দিন হত্যার পরিকল্পনা করেন।

বালিশ চাপা দিয়ে খুনের পর বাড়ির ভেতরে থাকা চটের বস্তায় ভরে অধ্যাপক তাহেরের লাশ বাসার পেছনে নেয়া হয়। লাশ গুমের জন্য জাহাঙ্গীরের ভাই নাজমুল আলম ও নাজমুলের স্ত্রীর ভাই আবদুস সালামকে ডেকে আনা হয়। তাদের সহায়তায় বাসার পেছনের ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে তাহেরের লাশ ফেলে দেওয়া হয়। ২০০৭ সালের ১৭ মার্চ শিবির নেতা মাহবুব আলম সালেহীসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। বিচার শেষে ২০০৮ সালের ২২ মে রাজশাহীর দ্রুত বিচার আদালত চারজনকে ফাঁসি ও দুজনকে খালাস দেয়।

দণ্ডিত অন্যরা হলেন-জাহাঙ্গীরের ভাই নাজমুল ও তার স্ত্রীর ভাই সালাম। তবে ছাত্রশিবিরের নেতা সালেহী ও আজিমুদ্দিন মুন্সি বিচারে খালাস পান। পরে দণ্ডিতরা হাইকোর্টে আপিল করেন। হাইকোর্ট মহিউদ্দিন ও জাহাঙ্গীরের রায় বহাল রাখলেও নাজমুল ও সালামের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।

পরে তাদের দণ্ড বৃদ্ধি চেয়ে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। শুনানি শেষে ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের রায়ই বহাল রাখে। এরপর আসামিদের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদনও খারিজ করে সুপ্রিমকোর্ট। এরপর বাকি থাকে কেবল রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন। কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রায় ছয় মাস আগে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেছিলেন আসামিরা। সে আবেদনও নাকচ করেন রাষ্ট্রপতি। গত ৫ জুলাই সেই চিঠি রাজশাহী কারাগারে পৌঁছায়। নিয়ম অনুযায়ী ২৮ জুলাইয়ের মধ্যে ফাঁসি কার্যকর করতে হবে।

সূত্র: বাংলাদেশ জার্নাল
আইএ/ ২৫ জুলাই ২০২৩

Back to top button