ঢালিউড

আকবর হোসেন থেকে নায়ক ফারুক হলেন যেভাবে

ঢাকা, ১৫ মে – বাংলা চলচ্চিত্রের মিয়া ভাই খ্যাত নায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ঢাকা-১৭ আসনের সংসদ সদস্য আকবর হোসেন পাঠান (ফারুক) সোমবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে মারা গেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

অভিনেতা হিসেবে ফারুকের যাত্রা

পুরো নাম আকবর হোসেন পাঠান দুলু। ফারুক নামটি তাকে দেয়া হয়েছিল চলচ্চিত্রের পোশাকী নাম হিসেবে। অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান, পরিচালক এইচ আকবর এবং ফারুক নামে নিজের একজন বন্ধু মিলে তাকে দিয়েছিলেন এ নাম। ছাত্রজীবনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পাড়া-মহল্লায় নাটকে অভিনয় করতেন তিনি।

এইচ আকবর পরিচালিত জলছবি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে ফারুকের অভিষেক ঘটে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তি পায় তার অভিনীত প্রথম ছবি ‘জলছবি’।

চলচ্চিত্রে আসার কারণ হিসেবে এই কিংবদন্তি অভিনেতা বলেন, ছাত্রলীগ করার কারণে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার আমার বিরুদ্ধে ৩৭টি হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করে। এসব মামলা থেকে বাঁচতে বন্ধুবান্ধবের পরামর্শে চলচ্চিত্রে আসি।

নায়ক ফারুকের প্রাথমিক জীবন

আকবর হোসেন পাঠান দুলু ওরফে নায়ক ফারুক জন্ম গ্রহণ করেন ১৯৪৮ সালের ১৮ আগস্ট। ফারুকের জন্ম হয় ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওরে। তিনি মানিকগঞ্জের ঘিওরে জন্ম গ্রহণ করলে ও বেড়ে ওঠেছেন পুরান ঢাকাতে। তিনি পুরান ঢাকার অলিতে গলিতে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন শৈশবে। বাবা আজগার হোসেন পাঠানের ছিল পাচ মেয়ে ও দুই ছেলে। ফারুক ছিলেন ভাইদের মধ্যে সবার ছোট ও ডানপিটে। ফারুক ছোট বেলাতে ছিল খুবই চঞ্চল সভাবের। তিনি সুযোগ পেলেই ছটে যেতেন মাঠে খেলার জন্য।

নায়ক ফারুকের সিনেমার ক্যারিয়ার

নায়াক ফারুকের জলছবি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সিনেমা জগতে প্রবেশ করেন। তার প্রথম ছবিটি পরিচালনা করেন এইচ আকবর ১৯৭১ সালে। তার প্রথম ছবিতে তার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের মিষ্টি মেয়ে বলে খ্যাত কবরী। পরবর্তীতে কবরী ও ফারুক জুটি একসময় খুবই জনপ্রিয় ছিল। তার প্রথম ছবির পর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। উপহার দিয়েছে একের পর এক জনপ্রিয় সিনেমা।

নায়ক ফারুক কাজ করেছেন বাংলাদেশের কিংবদন্তি পরিচালক খান আতাউর রহমান, নারায়ণ ঘোষ মিতা, স্বপন ঘোষ, আজিজুর রহমান, আমজাদ হোসেন সহ আরও গুনী পরিচালকদের সাথে। এইসব গুনী পরিচাকদের হাত ধরেই তিনি উপহার দিয়েছেন অনেক কালজয়ী সিনেমা। যা বাংলার সিনেমা প্রেমিদের মাঝে হিরো ফারুককে চিরস্মরণীয় করে রাখবে। তিনি প্রায় ১০০ সিনেমায় অভিনয় করেছেন। তার মধ্যে বেশিরভাগ সিনেমাই দর্শকদের মন জয় করতে পেরেছিল।

রাজনীতিতে নায়ক ফারুক

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে ছয় দফা আন্দোলনে যোগ দেন ফারুক। ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, সত্তরের নির্বাচন ও ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ডাকে অংশগ্রহণে কোনো রক্তচক্ষু তাকে আটকে রাখতে পারেনি। বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধজাহাজ চালানোর স্বপ্ন দেখতেন ছোটবেলায়। নিজের আদর্শ পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

কয়েক বছর আগে চলচ্চিত্রের ১৮ সংগঠন নিয়ে ঘটিত চলচ্চিত্র পরিবারের আহ্বায়ক তিনি। চলচ্চিত্রে এক সময় যখন ধস নামে তখন সবার আহ্বানে চলচ্চিত্রকে বাঁচাতে তিনি পরিবেশক সমিতির নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং চলচ্চিত্রের অন্য সংগঠনগুলোকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে নানা পদক্ষেপ নিয়ে এই ধস দূর করেন।

তখন দেশে থাকা ৭শত সিনেমা হলকে প্রায় ১৪শতে উন্নীত করেন। এরপর সফলভাবে ক্যাপাসিটি ট্যাক্স প্রবর্তনে ভূমিকা রাখেন। ফারুক হলেন চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। এ সমিতি প্রতিষ্ঠা করলেও নিজে এর সভাপতি না হয়ে নায়করাজ রাজ্জাককে তিনি সভাপতি হতে প্রস্তাব রাখেন।

চলচ্চিত্রের পাশাপাশি রাজনীতিতেও সমানভাবে সক্রিয় তিনি। ১১তম সংসদ নির্বাচনে ঢাকা ১৭ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকটি অঙ্গ সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন তিনি। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ও ছিলেন তিনি।

নায়ক ফারুকের পুরস্কার ও সম্মাননা

বাংলা চলচ্চিত্রের মিয়া ভাই খ্যাত নায়ক ফারুক প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায় ১৯৭৫ সালে। নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত বিখ্যাত লাঠিয়াল সিনেমায় অভিনয় করার কারণে শ্রেষ্ঠ পার্শ্বচরিত্র ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।

লাঠিয়াল সিনেমাটি ছিল মিয়া ভায়ের সবচেয়ে ব্যবসা সফল সিনেমার একটি। চলচ্চিত্রে সামগ্রিক অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার আজীবন স্মমাননা প্রধান করে থাকে। ২০১৮ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা অর্জন করেন। জাতীয় পুরস্কার ছাড়াও বাচসাস-সহ অগণিত গুরুত্বপূর্ণ সম্মাননায় ভূষিত হন মিয়াভাই ফারুক।

ফারুকের সুপারহিট সিনেমা

১৯৭৩ সালে মুক্তি পায় খান আতাউর রহমান পরিচালিত ‘আবার তোরা মানুষ হ’। ১৯৭৫ সালে মুক্তি পায় নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘লাঠিয়াল’। এ ছবিতে ফারুকের চরিত্র ছিল বেশ গভীর। এতে তাকে জাতীয় পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে চূড়ান্ত করা হলেও তৎকালীন বঙ্গবন্ধু-পরবর্তী সরকার জোর করে তাকে পার্শ্বঅভিনেতার পুরস্কার দেয়।

১৯৭৫ সালে মুক্তি পাওয়া আরেকটি ছবি তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ছবিটি হলো ‘সুজন সখী’। গ্রামীণ পটভূমির গল্প। মেলোড্রামাটিক ছবি। এ ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র গ্রামীণ তরুণ সুজনের ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয় করেন ফারুক। এ ছবিতে অভিনয়ের সুবাদেই আমাদের চলচ্চিত্রে গ্রামীণ যুবকের চরিত্রে ফারুক স্থায়ী আসন গড়ে তোলেন।

১৯৭৬ সালে মুক্তি পাওয়া আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমণি’ ছবিটির বাণিজ্যিক সাফল্য ফারুককে নায়ক হিসেবে আরও প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। ১৯৭৮ সালে ‘সারেং বৌ’ মুক্তি পায়। শহীদুল্লাহ কায়সারের কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে আবদুল্লাহ আল মামুন নির্মিত এ ছবিটির ‘কদম সারেং’ চরিত্রে জীবনঘনিষ্ঠ অভিনয়ের জন্য ক্ল্যাসিক অভিনেতা হিসেবে গণ্য হন।

সে বছরই আমজাদ হোসেনের ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ছবিতে মিলন চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেন ফারুক। বিশেষ করে মৃত্যুর দৃশ্যে তার অভিনয় দর্শককে কাঁদায়।

১৯৭৯ সালে ফারুক হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান নায়ক। সে বছর তার অভিনীত ৩০টির বেশি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। বিশেষ করে গ্রামীণ তরুণের আইকন হয়ে যান তিনি। আজিজুর রহমান নির্মিত ‘জনতা এক্সপ্রেস’ ছবিতে নিজের শিশু সন্তানকে বলি দিয়ে ট্রেনযাত্রীদের জীবন বাঁচিয়েছেন এমন এক ট্রেনচালকের ভূমিকায় অসামান্য অভিনয় করেন ফারুক।

‘মিয়াভাই’ ছবিটি সাফল্য পাওয়ার পর দর্শকমহলে তার ‘মিয়াভাই’ নামটি জনপ্রিয়তা পায়। নব্বই দশকের শেষে কয়েকটি চলচ্চিত্রে চরিত্রাভিনেতা হিসেবে দেখা যায় ফারুককে।

ফারুকের সংক্ষিপ্ত বিবরণী

পুরো নাম. আকবর হোসেন পাঠান দুলু, ডাকনাম. দুলু, মিয়া ভাই। স্ত্রীর নাম ফারজানা পাঠান। ছেলের নাম. রওশন হোসেন, মেয়ে. ফারিহা তাবাসসুম পাঠান। বাবার নাম আজগার হোসেন পাঠান। জন্ম ১৯৪৮ সালের ১৮ আগস্ট। প্রথম সিনেমা. জলছবি। অভিনীত চলচ্চিত্র. ১০০+। পেশায় চলচ্চিত্র অভিনেতা, প্রযোজক, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ। রাজনীতির দল. আওয়ামী লীগ। জাতীয়তা. বাংলাদেশী। বড় অর্জন: একজন বীর মুক্তিযুদ্ধা। সম্মাননা: বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

এম ইউ/১৫ মে ২০২৩

Back to top button