
এমন কোনো ব্যক্তি যিনি কোনো সামাজিক বা ব্যক্তিগত কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত না হয়েও সেখানে উপস্থিত হন, তাকে বলা হয় ‘Party Crasher’।
এই সংস্কৃতি মূলত উত্তর আমেরিকায় আলোচনায় আসে বড় বড় সেলিব্রিটি ইভেন্ট, বিবাহ, কর্পোরেট গালা, ফান্ডরেইজিং ডিনার—এবং হালের ইনফ্লুয়েন্সার পার্টিগুলোর মাধ্যমে। আমেরিকায় একদল ‘Professional Party Crashers’ আছে যারা হলিউড ইভেন্ট ক্রাশ করে Instagram বা TikTok-এ লাইভ দেয়।
২০০৯ সালে হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ওবামার স্টেট ডিনারে এক দম্পতি ‘মাইক ও তার স্ত্রী তাহেরা সালাহী’ নিমন্ত্রণ না পেয়েও ঢুকে পড়েছিলেন—এটা ছিল বিরাট কেলেঙ্কারি।
তারা রেড কার্পেট পেরিয়ে ঢুকে গেলেন, রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে কোলাকুলি করলেন, জো বাইডেনের পাশে দাঁড়িয়ে হাসলেন, ফটোশুট করলেন ওবামার সঙ্গে, এমমনকি ফেসবুকে ছবিও পোস্ট করলেন—“A beautiful evening at the White House.”
পরের দিন সিক্রেট সার্ভিস কপাল চাপড়াতে লাগল—“এরা কারা? এরা তো লিস্টেই ছিল না!” বিস্ময়ের ঢেউ হোয়াইট হাউস থেকে কংগ্রেস পর্যন্ত পৌঁছাল। আমেরিকার ইতিহাসে এটিই ছিল সবচেয়ে ‘Hi-Profile Party Crashing’—যেখানে কেউ রাষ্ট্রপ্রধানের নিরাপত্তা ভেঙে ঢুকে যায় শুধুমাত্র একটি সেলফি তোলার জন্য।
২০১৮ সালে প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কেলের রাজকীয় বিয়েতে আমন্ত্রিত অতিথির সংখ্যা ছিল সীমিত, এবং নিরাপত্তা ছিল বলয়ের মতো। তবুও এক মার্কিন তরুণ এসে হাজির হয় শেরওয়ানী পরে। গেট সিকিউরিটির সামনে আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলে: ‘I’m the groom’s yoga teacher from California.’
সে ঢুকে পড়ে ক্যাম্পাসে, খাবার খায়, ছবি তোলে। তার প্রোফাইলে পরে পাওয়া যায় একটি ছবি যেখানে প্রিন্স হ্যারিকে পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে দেখা যাচ্ছে—ক্যাপশন: ‘My brother from another mother, walking into a new life!’ পরে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডে এই কাণ্ড উঠে আসে: ‘The man who married into history—for one afternoon only.’
আমাদের কমিউনিটিতে আজকাল পার্টি ক্রাশারদের অত্যাচারে অনেকে অতিষ্ট। ভুক্তভোগি কয়েকজনের সাথে আলাপ করে জানা গেলো, এমন অনেক লোক আমাদের সমাজে আছে যাদের নিমন্ত্রণ দিতে হয় না, আমন্ত্রণও দিতে হয় না; তারা নিজ উদ্যোগে অনুষ্ঠানস্থলে চলে আসে। তাদের কোনো আসন নম্বর লাগে না, টেবিল নম্বর লাগে না এবং তাদের অন্য কোনো খরচপাতিও নেই। অনেক সময় এদের নিয়ে আয়াজকরা বিব্রতবোধ করেন। না পারেন বের করে দিতে, না পারেন আসন দিতে। আর এদের বেশিরভাগ কমিউনিটির চেনা মুখ।
এ ধরনের বেশ কিছু চেনা মুখকে চরম গরমের মধ্যেও স্যুট-টাই পরে ঘুরতে দেখা যায়। প্রায় সব ধরনের অনুষ্ঠানে সস্ত্রীক তাদের অনাকাঙ্খিত উপস্থিতি বিব্রতকর এবং চরম বিরক্তিকর। আপনি কনফিউজড হয়ে যাবেন তাদের আন্তরিকতা দেখে।
বিয়ের অনুষ্ঠানে দেখবেন একবার তারা ছেলেপক্ষের লোকের সাথে কথা বলছে, আবার কিছুক্ষণ পর দেখবেন মেয়েপক্ষের লোকের সাথে কথা বলছে। বুঝার উপায় নেই যে তারা কোন পক্ষের!
কোনো নির্দিষ্ট জেলার পিকনিক হোক অথবা কোনো পেশাজীবী সংগঠনের ডিনার হোক, তারা ঠিকই ফিট হয়ে যায়। খুব খোশ মেজাজে থাকে তারা। আপনার বাড়ি, আপনার প্রতিবেশি, আপনার আত্মীয়-স্বজন সকলকেই তারা চেনার ভান করে অথবা খুঁজে বের করার চেষ্টা করে।
আবার কোনো রাজনৈতিক অথবা কোনো সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের অনুষ্ঠান, বিশেষ করে যেখানে ভোজনের ব্যবস্থা আছে সেখানে গিয়েও তারা আগেভাগে উপস্থিত হয় এবং খাবারের সময় সকলের আগে আগে আগে থাকে। তারা আপনাকে প্লেট এগিয়ে দেবে, লাইনে তাদের সামনে আপনাকে জায়গা করে দেবেে। সর্বেপরি তাদের আচার-ব্যবহারে মনে হবে তারাই ঐ অনুষ্ঠানের আয়োজক।
রমজান মাসে তারা ইফতার করার জন্য একেক দিন একেক মসজিদ ভিজিট করে। কেবল একা যায় না; অতিরিক্ত সওয়াব হাসিলের জন্য স্ত্রীকেও সঙ্গে করে নিয়ে যায়। পবিত্র মসজিদে উদর পূর্তি করে তারা পোটলা ভরে অতিরিক্ত খাবার বাসায় নিয়ে আসে। পোটলা বাঁধার জন্য তারা আপনাকেও উৎসাহ দেবে।
পার্টি ক্রাশারদের না তো লজ্জা আছে, না ভয়। নিমন্ত্রণ তাদের লাগে না, কারণ তারা মনে করে—জন্মসূত্রেই তারা সব দাওয়াতের মালিক। আপনাকে শুধু একবার হাসিমুখে বলবে—’ভাই, আপনি চিনেন না আমাকে, কিন্তু আমি তো আপনাকে বহুদিন ধরে চিনি!’
অনেকে মনে করেন পার্টি ক্রাশাররা আছে বলেই আমাদের সভা, সমাবেশ তথা অনুষ্ঠানগুলোতে প্রাণ আছে।









