অভিমত/মতামত

অজয় পাল : সিলেটের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, ৫০ বছরের দীর্ঘ পরিক্রমা

দীপক ধর অপু

সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠ এবং সত্যনিষ্ঠতাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সিলেটের যে সকল সাংবাদিক অগ্রণী ভূমিকা পালন করে সিলেটের শতাধিক বর্ষের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার গৌরবোজ্জল ইতিহাসকে মহিমান্বিত করেছেন, সিলেটের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শ্রদ্ধাভাজন অজয় পাল অন্যতম। সাংবাদিকতা জীবনে সমাজের সকল অসঙ্গতি, অন্যায়-অবিচার সহ সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর স্বপক্ষে কলম ধারণ করে নির্ভীকতার সাথে এই পেশাকে তিনি এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর সাহস , সততা ও নির্ভীকতা পেশাগত দায়িত্ব পালনে সঞ্জীবনীর মতো কাজ করেছে। ফলশ্রুতিতে ললাটে জুটেছে ব্যাপক পরিচিতি এবং ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা। বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী অজয়দার সাথে কিছুদিন আগে দীর্ঘ আলাপচারিতায় জানলাম, চলতি ডিসেম্বর মাসে তার সাংবাদিকতার ৫০ বছর পূর্ণ হবে।

সত্তরের দশকে সাংবাদিকতা শুরু করার সময় থেকেই আমার প্রয়াত পিতা “দেশ বার্তা” সম্পাদক হিমাংশু শেখর ধরের ভীষণ অনুরক্ত ছিলেন অজয় পাল। সেই সুবাদে আমাদের পরিবারের সাথেও তাঁর এক মধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই তখন থেকেই খবর- পাগল এই মানুষটিকে যত বৈরী পরিবেশই হোক না কেনো, নিরন্তর খবরের পেছনে ছুটতে দেখেছি। কোনো প্রতিবন্ধকতা তাঁর গতি কখনো রুখতে পারেনি। আশির দশক থেকে তাঁর সাথে সার্বক্ষণিক ছিলেন সিলেটের বরেণ্য চিত্রগ্রাহক আতাউর রহমান আতা। অজয়দা’র রিপোর্ট আর আতাউর রহমানের ছবি মানেই ছিল অনুপম যুগলবন্দি উপস্থাপনা। সেই সময় থেকেই তাঁর বিরামহীন পথ চলা। এমন এক কলম সৈনিক বর্তমানে বিরল বলা চলে। সত্তরের কাছাকাছি বয়সে এখনো তিনি কলম ছাড়েননি। যেকোনো মাধ্যমেই হোক ,লিখছেন তো লিখছেনই।

সাংবাদিকতায় ৫০বছর পূর্তিতে এই মানুষটিকে কেবল আমিই নই, আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকেও জানাই প্রাণঢালা অভিনন্দন .।

সত্তরের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে প্রেরিত অজয়দার প্রথম রিপোর্টটি ছাপা হয় আমিনুর রশীদ চৌধুরী সম্পাদিত সাপ্তাহিক “যুগভেরী”পত্রিকায়। এটাকে যদি সাংবাদিকতার গোড়াপত্তন হিসেবে বিবেচনা করা হয়,তাহলে এই ডিসেম্বরে সাংবাদিকতায় তাঁর ৫০বছর পূর্তি। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের আগরতলা থেকে প্রকাশিত দৈনিক “জাগরণ” পত্রিকায়ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখালেখি করেন। ৫০ বছরের এই দীর্ঘ পরিক্রমায় সিলেটের স্থানীয় ও জাতীয় এবং প্রবাস থেকে প্রকাশিত অগণন সংবাদপত্রে কাজ করার গৌরব অর্জন করেন। জাতীয় দৈনিকের মধ্যে বাংলার বাণী, দৈনিক সংবাদ ,দেশবাংলা ও বাংলাবাজার পত্রিকা ছাড়াও সিলেটের স্থানীয় দৈনিক সিলেটবাণী পত্রিকায়ও কাজ করেন কিছুদিন। আর সাপ্তাহিকের মধ্যে যুগভেরী, সিলেট সমাচার, দেশবার্তা ও সিলেটধ্বনি পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন বহুদিন। শুরুর দিকে সুনামগঞ্জ থেকে প্রকাশিত “সূর্যের দেশ” পত্রিকায়ও কিছুদিন সিলেট প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করেন। যুক্ত ছিলেন লন্ডন থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সুরমা, জাগরণ, পত্রিকা, দেশবার্তা ,পূর্বদেশ ও কানাডা থেকে প্রকাশিত বাংলা নিউজ পত্রিকার সাথে।

২০০৮ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত মাসিক “হৃদয়ে বাংলাদেশ” ম্যাগাজিনের ছিলেন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক।বাংলাবাজার পত্রিকা টানা দু’বছর তাঁকে দেশের শ্রেষ্ঠ সাংবাদিকের মর্যাদায় অভিষিক্ত করে। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি গীতিকার ও ছড়াকার হিসেবে খ্যাতি অর্জনের পাশাপাশি দু’বছর সিলেট বেতার কেন্দ্রে স্থানীয় সংবাদও পাঠ করেন। সাংবাদিকতার সুবাদে ২০০১ সালে অজয়দা কিউবার হাভানায় অনুষ্ঠিত inter-parliamentary কনভেনশনে বাংলাদেশ সংসদীয় দলের সাথে সাংবাদিক প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮০ সালে দৈনিক সংবাদে কর্মরত থাকাকালীন সিলেটের স্থানীয় একজন এমপির গাড়ি পোড়ানোর মিথ্যে মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৯৬ সালের ভোটার বিহীন নির্বাচনের দিন বিশ্বনাথের একটি ভোট কেন্দ্রে ইলিয়াস বাহিনীর সন্ত্রাসীদের হামলায় গুরুতর আহত হন। দুই দুবার অজ্ঞাতনামা জঙ্গিরা উড়ো চিঠির মাধ্যমে তাঁকে প্রাণনাশেরও হুমকি প্রদান করে। দু’বার সিলেট প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি ও একাধিকবার ক্রীড়া সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন অজয় পাল।

আমি আমাদের এই প্রিয় সাংবাদিক, গীতিকার ও ছড়াকারের শতায়ু কামনা করছি। অজয়দা, আপনি লিখে যান আমৃত্যু। আপনার লেখা আমাদের প্রাণশক্তি যোগাক চিরকাল।

লেখক: দীপক ধর অপু
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি
বাংলাদেশ প্রেসক্লাব মন্টিয়ল, কানাডা।

Back to top button