জাতীয়

অগ্নিঝুঁকিতে রাজধানীর ১৩০০ বিপণিবিতান

ইউসুফ সোহেল

ঢাকা, ৭ এপ্রিল – পুরান ঢাকার নিমতলীর পর চুড়িহাট্টা, সিদ্দিকবাজারে ক্যাফে কুইন ভবন থেকে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে অগ্নিকাণ্ড। এর মাঝে আরও প্রায় অর্ধশত অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে খোদ রাজধানীতে। একের পর এক এসব অগ্নিকাণ্ডে ঝরেছে শত শত প্রাণ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। কিন্তু যেসব কারণে সংঘটিত হচ্ছে অগ্নিকাণ্ড, সেই সমস্যাগুলো সমাধান হচ্ছে না। আগুনের ঝুঁকি প্রতিরোধে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) ও অগ্নি আইন (২০০৩) অনুযায়ী ৩০টির বেশি নিয়ম মেনে ভবন নির্মাণ করার কথা। কিন্তু কেউ এসবের তোয়াক্কা করছে না। এ অবস্থায় ফায়ার সার্ভিস এক জরিপে জানিয়েছে, রাজধানীর ১ হাজার ৩০০টি বিপণিবিতান অগ্নিঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে ৬২২টি মার্কেট ও শপিংমল।

জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে প্রতিষ্ঠানগুলোর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা কেমন তার তালিকা করে। সেই তালিকা অনুযায়ী খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে একাধিকবার চিঠি ও চূড়ান্ত নোটিশ দিলেও তা কর্ণপাত করছে না কেউ। ফলে এ ধরনের ভবন ও বিপণিবিতানগুলোতেই ঘটছে বেশির ভাগ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। যার সর্বশেষ উদাহরণ বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের অগ্নিকাণ্ড। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে এই ভবনটিতে ১০ বার নোটিশ পাঠানো হলেও আমলে নেয়নি কেউ। ফলে গত মঙ্গলবার ওই কমপ্লেক্সে আগুন লেগে পুড়ে ছাই হয়ে যায় কমপ্লেক্সের ৫ হাজার দোকান। ঝরে যায় ১৫ হাজার মানুষের স্বপ্ন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকার অধিকাংশ মার্কেটই রয়েছে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে। এগুলোতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, পানি ও ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম নেই। কিছু কিছু শপিংমল ও মার্কেটগুলোতে অক্সিজেন সিলিন্ডার, পানির রিজার্ভ ট্যাংক, বালুভর্তি বালতি ও রেসকিউ সিঁড়িসহ অন্যান্য অগ্নিনির্বাপণ সামগ্রীও নেই। এসব নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতারা কিছুটা শঙ্কিত হলেও অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়ে মালিক সমিতি এবং ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (রাজউক) বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও বিদ্যুৎ বিভাগ যেন একেবারেই উদাসীন।

ফায়ার সার্ভিসের সর্বশেষ জরিপ বলছে, রাজধানীর ১ হাজার ৩০০টি বিপণিবিতান রয়েছে অগ্নিঝুঁকিতে। মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে ৬২২টি মার্কেট ও শপিংমল। এই তালিকায় ছিল বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে ভূস্মীভূত মার্কেটগুলোও। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সরেজমিন রাজধানীর ১ হাজার ৩০৫টি বিপণিবিতান পরিদর্শন করে এ তথ্য পেয়েছে ফায়ার সার্ভিস। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের পর ফের জরিপে নামে কর্তৃপক্ষ।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ফায়ার সার্ভিস, ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (এনএসআই) ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা পরিদপ্তরের (জিজিএফআই) একটি সমন্বিত দল রাজধানীর গাউছিয়া মার্কেট পরিদর্শন শেষে পরিদর্শক দলের প্রধান বলেন, রাজধানী সুপারমার্কেট, গাউছিয়া মার্কেট, নিউমার্কেট, চকবাজার, ঠাঁটারীবাজারের কয়েকটি মার্কেটসহ রাজধানীর প্রায় সব কটি মার্কেটই অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছে।

এর আগে গত বুধবার ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মাইনুদ্দিন রাজধানী সুপার মার্কেট, গাউছিয়া মার্কেটসহ রাজধানীতে বেশ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। এসব মার্কেটে সার্ভে চালানোর কথাও জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার উদাসীনতায় প্রায় প্রতিদিনই অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে চলেছে। ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (রাজউক) বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও বিদ্যুৎ বিভাগের উদাসীনতার কারণে জন্ম নিচ্ছে একের পর এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। অগ্নিনিরাপত্তার দিক থেকে রাজধানীর শপিংমল ও মার্কেট সম্পূর্ণ অনিরাপদ অবস্থায় থাকায় যে কোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে আরও বড় দুর্ঘটনা।

বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে গাউছিয়া মার্কেটে অগ্নিনিরাপত্তা পরিদর্শন শেষে পরিদর্শক দলের প্রধান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ঢাকা সদর জোন-১-এর উপসহকারী পরিচালক মো. বজলুর রশিদ বলেন, আমরা এখানে এসেছি নিয়মিত পরিদর্শন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে। বঙ্গবাজারে আগুনের সঙ্গে এই পরিদর্শনের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে ঢাকার সব মার্কেটেই কিছু না কিছু ঝুঁকি রয়েছে। কারণ কেউ ফায়ার সার্ভিসের নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তাই আমাদের দৃষ্টিতে বেশির ভাগ মার্কেটই ঝুঁকিপূর্ণ।

গাউছিয়া মার্কেটের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাপনার সার্বিক বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের এই উপসহকারী পরিচাল জানান, আগুন নির্বাপণের জন্য বা দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযান পরিচালনার জন্য যেসব সাজসরঞ্জাম প্রয়োজন, এই মার্কেটে সেসব ব্যবস্থাপনা অপ্রতুল। গাউছিয়া মার্কেটে ছয়টি সিঁড়ি আছে। সিঁড়ির কার্নিশে দোকান রয়েছে। এ সিঁড়িগুলো সরাতে হবে। ২০২০ সালের শেষের দিকে এখানে ফায়ার সার্ভিস মহড়া করেছিল। এ মার্কেটে ফায়ার এক্সটিংগুইশার ছাড়া যা যা থাকা দরকার, তা নেই। তিনি বলেন, এখানে আগুন লাগলে তা নেভাতে প্রতিবন্ধকতা আছে। পানির উৎস নেই। ঘাটতিগুলো সমাধানে সুপারিশ দ্রুতই মার্কেট নেতাদের কাছে দেওয়া হবে।

এ সময় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ইন্সপেক্টর মো. আল মাসুদ, গাউছিয়া মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার বিশ্বাসসহ দোকান মালিক সমিতির বিভিন্ন নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

গাউছিয়া মার্কেট মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ কামরুল হাসান বাবু বলেন, দুই বছর আগে ফায়ার সার্ভিস যে নির্দেশনা দিয়েছে, তা পরিপূর্ণ করেছি। আমাদের ফায়ার সার্টিফিকেট আছে। এ ছাড়া সব ভবনেই কিছু ত্রুটি থাকে, আমাদের এখানে আউটডোরসহ যে ত্রুটি আছে, তা দু-একদিনের মধ্যে সমাধানের চেষ্টা করব।

জরিপ-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন অনুযায়ী দুর্ঘটনা রোধে মার্কেটের অবস্থান, ব্যবহৃত ফ্লোরের আয়তন, সাধারণ সিঁড়ির প্রশস্ততা, অগ্নিনির্বাপণ কাজে সিঁড়ির ব্যবস্থা, জরুরি প্রস্থানের সিঁড়ির সংখ্যা, প্রতি তলায় সেফটি লবির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা রয়েছে। তা ছাড়া ছাদে ওঠার একাধিক সিঁড়ি রাখা, ছাদের দরজা খোলা রাখা, বহির্গমনে পর্যাপ্ত দরজা রাখা, ৫০ হাজার গ্যালনের আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার রিজার্ভ ট্যাংক রাখা, ১০ হাজার গ্যালনের ওভার হ্যাড ওয়াটার ট্যাংক থাকা বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক তারে কনসিল ওয়্যারিং থাকা, বৈদ্যুতিক মেইন সুইচ বক্স ও ডিমান্ড বক্সের নিরাপদ অবস্থানে থাকা, প্রতি পয়েন্টে ৫ কেজি পরিমাণের সিওটু ফায়ার এক্সটিংগুইশার সংরক্ষণ করা, ধোঁয়া ও তাপ শনাক্তকরণ যন্ত্র রাখা এবং মার্কেটের ব্যবসায়ী ও কর্মীদের নিয়মিত অগ্নিদুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রশিক্ষণ করানোর কথা রয়েছে। কিন্তু এসব নিয়ম অধিকাংশ কর্তৃপক্ষ না মানলেও প্রয়োগ নেই আইনেরও।

রাজধানীর ‘খুবই ঝুঁকিপূর্ণ’ মার্কেট : জানা গেছে, রাজধানীতে ‘খুবই ঝুঁকিপূর্ণ’ তালিকার মধ্যে রয়েছে কাপ্তান বাজার কমপ্লেক্স ভবন-২, বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স আদর্শ ইউনিট, বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স (যা ইতোমধ্যে পুড়ে গেছে), বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স গুলিস্তান ইউনিট, বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স মহানগর, মহানগর বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন লিমিটেড, ঢাকা ট্রেড সেন্টার, গুলশান শপিং সেন্টার, এম প্রেজ প্লাজা, জব্বার টাওয়ার, রহমানিয়া সুপার মার্কেট, ভূইয়া ম্যানশন, পিংক সিটি শপিং কমপ্লেক্স, বিদিশা সুপার মার্কেট, সাবেরা টাওয়ার মার্কেট, বাইশ বর সুপার মার্কেট, ল্যান্ড মার্ক শপিং সেন্টার, বনানীর গোলাম কিবরিয়া ম্যানশন, বাংলাদেশ ইউএস মৈত্রী কমপ্লেক্স, বাড্ডার ফুজি ট্রেড সেন্টার, আবেদ আলী মার্কেট, আর এ এস প্লাজা, লুৎফুন টাওয়ার, রিজভ্যালী শপিং সেন্টার, হাকিম টাওয়ার শপিং কমপ্লেক্স, বসুন্ধরার ভাই ভাই সুপার মার্কেট, হাজী আ. লতিফ ম্যানশন, আমীর ড্রিম কমপ্লেক্স, ফরাজী টোলা কাঁচাবাজার, ভাটারার আব্দুল লতিফ মার্কেট, বারিধারার নতুন বাজার দোকান মালিক সমিতি মার্কেট, মহাখালীর জননী ভবন মার্কেট, শাহীন ম্যানশন, মহাখালী প্লাজা, জেবা টাওয়ার, কারওয়ান বাজারের শাহ আলী টাওয়ার, নিক্য পেপার অ্যান্ড স্টেশনারি, মগবাজারের বাটা বাজার, বেঙ্গল টাওয়ার, আড়ং প্লাজা, বিশাল সেন্টার শপিংমল, রাজ্জাক প্লাজা শপিং কমপ্লেক্স, আহম্মেদ পরিবার মার্কেট, আলহাজ শামছুদ্দিন ম্যানশন, সিরাজ ম্যানশন মার্কেট, তেজগাঁওয়ের সেন্টার পয়েন্ট ও বে-এম্পোরিয়াল মার্কেট।

‘ঝুঁঁকিপূর্ণ’ তালিকায় রয়েছে- উত্তরার কেসি টাওয়ার, টপটেন শপিংমল, ১৩ নম্বর ফার্নিচার মার্কেট, উত্তরা বাজার সুপার মার্কেট, আকতার ফার্নিচার, এ কে টাওয়ার, ওয়েসটেস লিমিটেড, ওরিয়ন ফুটওয়ার, মি অ্যান্ড মম, ফ্যাশন প্যারাডাইজ, তেজগাঁওয়ের আহমেদ মার্কেট, তোহা মিয়া মার্কেট, শেখ প্লাজা, মগবাজার প্লাজা, সাউদিয়া সুপার মার্কেট, রহমান ম্যানশন, আয়শা মঞ্জিল, হাজী মোতালেব মার্কেট, গুলশান টাওয়ার, জব্বার টাওয়ার শপিংমল, পুলিশ প্লাজা, রহমানিয়া সুপার মার্কেট, গুলশান-১ নম্বরে ডিএনসিসি মার্কেট, কাওরান বাজার ২ নম্বর সুপার মার্কেট, কাওরান বাজার কিচেন মার্কেট, কাওরান বাজার কামার পট্টি, হাসিনা মার্কেট, কাব্যকস সুপার মার্কেট, ব্র্যাক আড়ং, বনানী-বারিধারা-ডিএনসিসি বনানী সুপার মার্কেট, সাদ মুসা সিটি সেন্টার, মেহেদী মার্কেট, প্রগতি সরণির হাজী জমির উদ্দিন সুপার মার্কেট, ফজিলা শপিং সেন্টার, ওয়ারীর মুক্ত বাংলা হকার্স মার্কেট, কাপ্তানবাজার কমপ্লেক্স ভবন-১, খন্দকার ইলেকট্রনিক মার্কেট, শাহবাগের আজিজ কো-অপারেটিভ সুপার মার্কেট, নবাবপুরের আ. রহিম মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ার, মজনু হার্ডওয়ার মার্কেট; পল্টনের বায়তুল মোকাররম মার্কেট, পলওয়েল সুপার মার্কেট, সিটি ভবন, জাহাঙ্গীর শপিং কমপ্লেক্স, রমনা ভবন মার্কেট, মওলানা ভাসানী স্টেডিয়াম মার্কেট, ভলিবল মার্কেট, গুলিস্তানের এনএক্স টাওয়ার, সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেট, ঢাকা ট্রেড সেন্টার দক্ষিণ, ফুলবাড়িয়া সিটি সুপার মার্কেট-২, বঙ্গবন্ধু স্কয়ার পাতাল মার্কেট, বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম মার্কেট, ডন প্লাজা, নবাব প্লাজা, পীর ইয়ামেনী মার্কেট, বংশালের জাকের সুপার মার্কেট, রোজলীন ভিসতা শপিং কমপ্লেক্স, মিরপুরের মিরপুর টাওয়ার নার্সিং মার্কেট, ডাসুরা টাওয়ার, সিটি ক্লাব মার্কেট, ইকবাল কমপ্লেক্স, চৌরঙ্গী মার্কেট, হাজী গণি মোল্লা মার্কেট, সৈকত প্লাজা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জামে মসজিদ কমপ্লেক্স।

সূত্র: আমাদের সময়
আইএ/ ৭ এপ্রিল ২০২৩

Back to top button