জাতীয়

দেশে ডলার সংকট থাকবে কতদিন

জিয়াদুল ইসলাম

ঢাকা, ১৮ জানুয়ারি – নানা পদক্ষেপ সত্ত্বেও ডলারের সংকট কাটছে না। এখনো দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রার সংকট হচ্ছে; প্রতিদিনই দেশি-বিদেশি ২০টিরও বেশি ব্যাংক ডলার সংকটে পড়ছে। এ কারণে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পণ্য আমদানি করতে হিমশিম খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো। ব্যাহত হচ্ছে অতি আবশ্যকীয় জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ আমদানি। উপরন্তু রমজান মাস যত এগিয়ে আসছে, ডলারের সংকট ততই প্রকট হয়ে উঠছে। ডাল, তেল, খেজুর, চিনিসহ রমজানে বাড়তি চাহিদাসম্পন্ন ভোগ্যপণ্যের এলসি খুলতেও প্রয়োজনীয় ডলার পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া কয়েক মাস ধরে শিল্প স্থাপনের মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানির এলসি খুলতে অনাগ্রহ দেখিয়ে আসছে ব্যাংকগুলো। ফলে এসব পণ্যের এলসি খোলাও তলানিতে নেমেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিল্পের উৎপাদন, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে রপ্তানিতে তথা রপ্তানি আয়ে।

এমতাবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, আমদানি নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে ডলারের চাপ অনেকটাই কমে এসেছে। এ ছাড়া পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিদিন রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করা হচ্ছে।

গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় আসন্ন রমজান উপলক্ষে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিনি, ভোজ্যতেল, খেজুর, ছোলা, মোটর, ডাল, মসলা, পেঁয়াজÑ এই ৮টি পণ্যের এলসি খোলার নির্দেশ দেন গভর্নর। এরপর সার্কুলার জারি করে এসব পণ্যের এলসি ন্যূনতম মার্জিনে খোলার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ডলার সংকটের কথা বলে রমজানের নিত্যপণ্য আমদানির এলসি খুলতেও অনীহা প্রকাশ করছে ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও প্রয়োজনীয় ডলার দিয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে না। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট মো. মাহবুবুল আলম বলেন, ডলার সংকটের কথা বলে ব্যাংকগুলো অনেক পণ্যের এলসি খুলতেই অনীহা দেখাচ্ছে বলে আমাদের কাছে অভিযোগ আসছে। বিলাসী পণ্যের এলসি খোলা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির এলসি খুলতে চাইছে না। এমনকি রমজানের নিত্যপণ্যের এলসিও সব ব্যাংক খুলছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ, সার এবং আসন্ন রমজানের অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করার জন্য রিজার্ভ থেকে ডলার দিয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় যৎসামান্য। ১০০ মিলিয়ন ডলারের চাহিদা এলে দেওয়া হচ্ছে ৫০ মিলিয়ন ডলার। ফলে বাজার স্থিতিশীল হচ্ছে না। এ কারণে আন্তঃব্যাংক ডলারের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন রেটে কোনো পার্থক্য থাকছে না। গতকালও আন্তঃব্যাংক ডলারের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন রেট ছিল ১০৭ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর অর্থাৎ প্রথম ছয় মাসে বাজারে ৮০০ কোটি ডলারের মতো বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নেমে এসেছে সাড়ে ৩২ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ২৫০ কোটি ডলারে।

একদিকে করোনাপরবর্তী বৈশ্বিক চাহিদা বৃৃদ্ধি, অন্যদিকে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ডামাডোলে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ সব ধরনের পণ্যের মূল্য ও জাহাজ ভাড়া বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যোগ হয় ডলারের উচ্চমূল্য। এসব কারণে গত অর্থবছরে আমদানি খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। একই কারণে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে পড়ে। অন্যদিকে করোনাপরবর্তী সবকিছু খুলে যাওয়ায় হুন্ডি তৎপরতা ব্যাপকভাবে বেড়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ নিম্নমুখী হয়ে পড়ে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার আয় ও ব্যয়ে পার্থক্য বেড়ে দেশে ডলারের সংকট তৈরি হয়। গত বছরের এপ্রিল থেকে এ সংকট ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপে বছরের শেষদিকে আমদানি ব্যয়ে কিছুটা লাগাম টানা গেলেও ব্যাংকগুলোর ডলার সংগ্রহের উৎসে ভাটা এখনো কাটেনি। ফলে প্রতিদিন বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের সংকট হচ্ছে, ডলারের ঘাটতিতে পড়ছে ২০-২৪টি ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত ১৫ জানুয়ারি দিনের শুরুতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলারের ঘাটতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৫৫ মিলিয়ন ডলার। আর সার্বিক বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি ছিল ২৭১ কোটি ৭৮ মিলিয়ন ডলার। এর মানে তার আগের কার্যদিবস ১২ জানুয়ারি (১৩ ও ১৪ জানুয়ারি ছিল শুক্র ও শনিবার) দিনশেষে ব্যাংকগুলো এই পরিমাণ ডলার ও বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতিতে ছিল। ওইদিন দেশি-বিদেশি অন্তত ২৪টি ব্যাংকের ডলারসহ অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি ছিল। ওইদিন সর্বোচ্চ ১২৭ মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতিতে ছিল পূবালী ব্যাংক। এর পর পর্যায়ক্রমে ১০৩ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল সিটি ব্যাংকের; ৯৪ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল ওয়ান ব্যাংকের; ৮৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি ঘাটতি ছিল অগ্রণী ব্যাংকের। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, গত ১৪ নভেম্বর থেকে ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর দিনের শুরুর অনুমোদিত লিমিট ছিল ১ হাজার ৭০৫ মিলিয়ন ডলার। এর বিপরীতে প্রতিদিনই বৈদেশিক মুদ্রার নিট পজিশন ঘাটতিতে ছিল। এর মধ্যে ৪৯১ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল ১২ ডিসেম্বর। গত ১০ জানুয়ারি ঘাটতি ছিল ৩৪০ মিলিয়ন ডলার। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্যÑ আমদানি কমায় ডলারের চাপ কমে এসেছে।

গত ১৫ জানুয়ারি মুদ্রানীতি ঘোষণাকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার বলেন, ডলার সংকট প্রবল হয়ে উঠেছিল কয়েক মাস আগে। তাই প্রথম টার্গেট ছিল আমদানি কমানো। আমদানি যেন রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের সমান হয়। এ টার্গেট পূরণে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিং হয়েছে কিনা, যাচাই করে
দেখা হয়। এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা করা হয়। ফলে আমদানি কমে এসেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, আমদানির তুলনায় রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বেশি এসেছে। ফলে ডলারের যে চাপ ছিল, তা অনেকটা কমে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বিভিন্ন পণ্যের এলসি খোলা কমেছে প্রায় সাড়ে ২২ শতাংশ। এর মধ্যে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি খোলা কমেছে ৬৫ শতাংশেরও বেশি। শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্যের এলসি খোলা কমেছে ৩৩ শতাংশ। শিল্পের কাঁচামালের এলসি খোলা কমেছে ২৭ শতাংশ। এ ছাড়া চাল, গম তেলসহ ভোগ্যপণ্যের এলসি খোলা কমেছে সাড়ে ১৪ শতাংশ।

সূত্র: আমাদের সময়
আইএ/ ১৮ জানুয়ারি ২০২৩

Back to top button