জাতীয়

ডোনাল্ড লুর সফর নিয়ে বিএনপিতে অস্বস্তি

নজরুল ইসলাম

ঢাকা, ১৮ জানুয়ারি – কয়েক দিন ধরে দেশের রাজনীতিতে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী (দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক) ডোনাল্ড লু’র বাংলাদেশ সফর। তার সফরের আগে, বিশেষ করে গত মাসে নিখোঁজ বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বাসায় যান ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস। সেখানে তাকে ঘিরে ধরে স্মারকলিপি দেওয়ার চেষ্টা করে ‘মায়ের কান্না’ নামের একটি সংগঠন। এতে তিনি নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন। এ নিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র পাল্টাপাল্টি বিবৃতিও দেয়।

এ অবস্থার মধ্যে আলোচনায় আসে ২০১৮ সালে ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটের গাড়িতে ভাঙচুরের বিষয়টি। এ ঘটনায় সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বাদী হয়ে ২০১৮ সালের ১০ আগস্ট মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেছিলেন। সম্প্রতি সেই মামলারও অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয় ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. শহীদুল ইসলাম।

আগে থেকেই আলোচনায় ছিল ২০২১ সালে র‌্যাব ও তাদের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। গুজব ছড়িয়ে পড়ে র‌্যাবের পর পুলিশের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এ নিয়ে সরকারও বেশ সতর্ক ছিল। ডোনাল্ড লু’র সফরের আগে গত ৯ জানুয়ারি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস উচ্চ আদালতের নির্দেশে জামিনে মুক্তি পান। এর মধ্যে লু’র সফর নিয়ে বাংলাদেশের বিরোধী শিবিরে এক ধরনের ‘বড় প্রত্যাশা’র জায়গা তৈরি হয়। বিরোধী শিবিরের সবার মাঝে ধারণা ছিল, সরকারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সফরকালে লু বড় ধরনের একটা বার্তা দেবে। এ অবস্থায় গত শনিবার সন্ধ্যায় ২৪ ঘণ্টার জন্য বাংলাদেশ সফরে আসেন ডোনাল্ড লু।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন লু। বিএনপির সঙ্গে দৃশ্যমান কোনো বৈঠক হয়নি। এ সময়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস হাসপাতালে ভর্তি হন। এ নিয়ে নানা নেতিবাচক কথাও বলতে থাকেন সমালোচকরা।

এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, ‘আমার জানা মতে মহাসচিব মির্জা ফখরুল কারাগার থেকে বের হওয়ার পরপরই স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে ভর্তির কথা ছিল। কিন্তু দলের কাজে ব্যস্ত থাকায় তিনি সময় করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের পরামর্শে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হতে বাধ্য হন। চিকিৎসা নিয়েও যারা সমালোচনা করেন, তারা মানসিক রোগী।’

গত রবিবার বাংলাদেশ ত্যাগের পর ডোনাল্ড লু’র সফর নিয়ে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মাঝে এক ধরনের অস্বস্তি দেখা যায়। দলের গুরুত্বপূর্ণ তিন নেতা বলেন, তারা যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানেই লু’র সফরের বিষয়টি আলোচনায় আসছে। লু’র সঙ্গে কেন বিএনপির বৈঠক হলো না, তা দলীয় ফোরামে আলোচনা হবে। এখানে দলের কোনো ব্যর্থতা আছে, নাকি কোনো রকম সুযোগ ছিল নাÑ এসব বিষয় পরিষ্কার করা হবে। কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করতে হলেও কাজটি করতে হবে।

দলের একজন ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, লু’র বাংলাদেশ সফরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ভূরাজনীতির বিষয়টি। হয়তো সামনে দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ‘গত ৭ ডিসেম্বরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশের হামলা, কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, একজন নিহত এবং অনেকেই আহত হয়েছেন। এ অবস্থায় বিএনপির সঙ্গে লু’র বৈঠক হলো না। এতে সরকারই লাভবান হয়েছে। তারা এখন ফুরফুরা। বিএনপি নেতাকর্মীদের মনোবল নিম্নমুখী।’

বিএনপির কূটনৈতিক উইংয়ের এক সদস্য জানান, লু’র সঙ্গে আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করতে কূটনৈতিক উইং থেকে চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ইতিবাচক ফল আসেনি।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকসহ নানা কারণে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তারাও বাংলাদেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ভোটাধিকার ও আইনের শাসন দেখতে চায়। তারাও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ দেখতে চায়। একই দাবিতে বিএনপিও রাজপথে আন্দোলন করছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ গণতান্ত্রিক বিশ্বের সবার চাওয়া হচ্ছে দুর্নীতিমুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।’

তিনি বলেন, ডোনাল্ড লু’র এ সফরে দেশের কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দৃশ্যমান কোনো বৈঠক ছিল না। তা হলে কেন বিএনপির সঙ্গে বৈঠক হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ডোনাল্ড লু যে উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সফর করেছেন, তা তিনি সরকারের কাছে বলে গেছেন। তারা এখানে গণতন্ত্র এবং স্বচ্ছ অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলে গেছেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘ডোনাল্ড লু যা বলা দরকার, তা তিনি বলে গেছেন। বিশেষ করে মানবাধিকার ও নির্বাচন। অনেক কথাই তো ভেতরে থাকে, এসব কথা সরকার বলতে পারবে। তার পরও তিনি একটা কাজ করে গেছেন। সেটা হলোÑ র‌্যাবকে বলেছেন, তোমরা ভালো কাজ করছ। এ রকম কাজ করতে পারলে হয়তো নিষেধাজ্ঞা তুলে নেব। এ অবস্থায় র‌্যাব তো আর সরকারের কথা (বেআইনি নির্দেশ) শুনবে না।’ পুলিশ ও র‌্যাবকে সরকারের (বেআইনি নির্দেশ) পালন করা থেকে সরিয়ে আনা হয়েছে বলে মনে করেন দিলারা চৌধুরী। তিনি বলেন, এখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনীতির স্বার্থ আছে। এ স্বার্থটা তারা কীভাবে রাখবে, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে। ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে বৈঠক না হওয়ায় তাদের মাঝে একটা অস্বস্তি থাকতে পারে। তবে তা আমি বলতে পারব না।’

এদিকে লু’র সঙ্গে বিএনপির বৈঠক না হওয়ায় গত দুদিন ধরে সরকারের মন্ত্রী ও নেতারা নানা তীর্যকপূর্ণ বক্তব্য রাখছেন। যদিও গত সোমবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘দেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার নেই। নির্বাচন ব্যবস্থা সরকার ধ্বংস করেছে। লু বাংলাদেশ সফর করে তিনিও বিষয়টি বলে গেছেন।’

সূত্র: আমাদের সময়
আইএ/ ১৮ জানুয়ারি ২০২৩

Back to top button