জাতীয়

মার্চ-এপ্রিলের চিন্তায় সরকার

লুৎফর রহমান কাকন

ঢাকা, ১৭ জানুয়ারি – আসন্ন গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদা মেটানো নিয়ে ভাবনায় আছে সরকার। মার্চ-এপ্রিলে গরম পড়তে থাকে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদা তখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের চাহিদা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়ে। জ্বালানি তেলের সংকটের কারণেও তখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়। আর অতিরিক্ত গ্যাস ও বিদ্যুতের জোগান নিশ্চিত করতে অর্থের সংস্থান নিয়েও ভাবতে হচ্ছে সরকারকে। এরই মধ্যে সরকার নির্বাহী আদেশে ৫ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। এ অবস্থায় যে কোনো দিন বাড়ানো হতে পারে গ্যাসের দাম। এরই মধ্যে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পেলে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির গেজেট প্রকাশ হবে।

বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার বিশেষ করে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) পাশ কাটিয়ে নির্বাহী আদেশে দাম বৃদ্ধি করা হতে পারে। সম্প্রতি বিদ্যুতে দামও একইভাবে বাড়ানো হয়েছে।

তীব্র গ্যাস সংকটে পর গত অক্টোবরে ব্যবসায়ীরা সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন। বৈঠকে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে গ্যাসের দাম কিছুটা বাড়িয়ে হলেও গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করার অনুরোধ জানানো হয়। ফলে সরকার গ্যাসের আমদানি নিশ্চিত করতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া আইএমএফের ঋণপ্রাপ্তির জন্য জ্বালানি খাতের সংস্কারসহ সংস্থাটির বিভিন্ন পরামর্শ বা শর্তপূরণের বিষয়টিও রয়েছে। কারণ আগামী মাসেই ঋণের প্রথম কিস্তি ছাড় হতে পারে।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে জ্বালানি বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ খায়রুজ্জামান মজুমদার বলেন, আগামী মার্চ-এপ্রিলে গ্যাসের চাহিদা বাড়বে। শিল্প এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে। সরকার গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে। গ্যাসের মূল্য সমন্বয় নিয়েও সরকার ভাবছে। তিনি বলেন, এখন স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম কিছুটা নিম্নমুখী। এটা একটা ভালো খবর। মার্চ-এপ্রিলের দিকে যাতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো যায়, সেই ভাবনাকে সামনে রেখে জ্বালানি বিভাগ কাজ করছে।

গত কয়েক বছর ধরে চলা গ্যাস সংকটের পর গত বছর থেকে বিদ্যুতের সংকটও দেখা দেয়। বিশেষ করে করোনা মহামারী-উত্তর বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে দেশে জ্বালানির সরবরাহ ব্যবস্থা টালমাটাল হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম অনেক বেশি বেড়ে যাওয়ায় আমদানিতে লাগাম টেনে ধরে সরকার। ডলার সংকটে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ করে দেওয়া হয়। জ্বালানি তেল আমদানিতেও রাশ টানা হয়। ফলে দেশে জ্বালানির সংকট দেখা দেয়।

গ্যাসের সংকটের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়। জ্বালানি তেলের সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলে গত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরজুড়ে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট দেখা দেয়। নভেম্বরে মাঝামামাঝি সময় থেকে শীত চলে আসায় বিদ্যুৎ চাহিদা কমে যায়। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা স্বস্তিতে আছে সরকার। তবে মার্চ থেকেই আবার গরম চলে এলে গ্যাস এবং বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে। ফলে গ্রীষ্মকালীন চাহিদা মেটাতে ভাবনায় আছে সরকার।

 

নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক জ্বালানি বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, প্রতিনিয়ত গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। একদিকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। ফলে সরকারের আমদানির দিকে বেশি ঝুঁকতে হচ্ছে। তিনি বলেন, শীতের কারণে এখন সংকট প্রকট আকার ধারণ করেনি। তবে গ্রীষ্মকালে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে লোডশেডিং বেড়ে যাবে। আবার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বেশি গ্যাস সরবরাহ করলে শিল্পকারখানায় কমে যাবে। ফলে মার্চ-এপ্রিলের দিকে এলএনজির আমদানি বাড়াতেই হবে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি করে সরবরাহ করতে হবে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, এ ছাড়া সরকার ভর্তুকি থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ পেতে চেষ্টা করছে সরকার। তাদের পরার্মশ রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংস্কার করার। বিশেষ করে ভর্তুকি কমিয়ে আনার। ফলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

এত দিন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর কাজটি এককভাবে করত বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। জ্বালানি বিভাগের সূত্র বলেছে, বিদ্যুৎ বা গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অবলম্বন করে বিইআরসি। ফলে সরকার আইন সংশোধন করে নির্বাহী আদেশে দাম বৃদ্ধির ক্ষমতা সংরক্ষণ করেছে। আইন সংশোধনের পর পরই নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। এখন গ্যাসর দাম বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বিতরণ কোম্পানিগুলো গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির আবেদন করেছে জ্বালানি বিভাগে। ভোক্তাপর্যায়ে বিক্রয় মূল্যের মধ্যে উৎপাদন চার্জ, এলএনজি চার্জ, গ্যাস উন্নয়ন তহলিব, জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল, বিইআরসি গবেষণা তহবিল, ট্রান্সমিশন চার্জ, মূল্যসংযোজন কর ও ডিস্ট্রিবিউশন চার্জ বৃদ্ধির আবেদন করা হয়েছে। বিশেষ করে, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি জ্বালানি বিভাগের আবেদন করেছে তাদের ডিস্ট্রিবিউশন চার্জ ১৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৬৪ পয়সা করার জন্য। এর আগে তিতাসের ডিস্ট্রিবিউশন চার্জ ছিল ৫৫ পয়সা। তখন বিইআরসি গণশুনানির মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণকালে তিতাসের ডিস্ট্রিবিউশন চার্জ ৫৫ পয়সা থেকে কমিয়ে ১৩ পয়সা নির্ধারণ করে দেয়। তিতাস দফায় দফায় জ্বালানি বিভাগে চিঠি লিখে জানিয়েছে, তাদের ডিস্ট্রিবিউশন চার্জ ১৩ পয়সা নির্ধারণ করায় লোকসানে পড়েছে কোম্পানিটি।

উল্লেখ্য, বিইআরসি গত বছরের ৫ জুলাই গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের দাম গড়ে ২২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বাড়িয়েছিল। তখন শিল্প খাতে ব্যবহৃত ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের দাম ১৫ দশমিক ৫২ শতাংশ বাড়িয়ে ১৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। আগে এ শ্রেণির গ্যাসের দাম ছিল ১৩ টাকা ৮৫ পয়সা। অর্থসংকটে গত বছরের জুলাই থেকে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি বন্ধ রাখে পেট্রোবাংলা।

অন্যদিকে, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আইএমএফের কাছে বাংলাদেশের ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ প্রস্তাবটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়ছে। গতকাল বাংলাদেশ সফররত আইএমএফ উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, চলতি মাসের ৩০ তারিখ ঋণ প্রস্তাবটি অনুমোদিত হতে পারে। সে হিসেবে ফেব্রুয়ারির মধ্যেই আইএমএফের কাছ থেকে ঋণের প্রথম কিস্তি পাওয়ার কথা রয়েছে। এ সময় বিদেশি এ সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী সংস্কার কর্মসূচি বা সংস্কার করার কথা ঋণ পাওয়ার আগেই সেগুলোর বাস্তবায়ন বা দৃশ্যমান করতে হবে। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ভর্তুকি কমাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এখন গ্যাসের দামও বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

গত অক্টোবরে আইএমফ প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করে। সূত্রে জানা যায়, এসব বৈঠকে জ্বালানি খাতের সংস্কারের পরার্মশ ছিল আইএমএফ প্রতিনিধি দলের।

সূত্র: আমাদের সময়
আইএ/ ১৭ জানুয়ারি ২০২৩

Back to top button