জাতীয়

বিদেশে বাংলাদেশিদের সম্পদের ব্যাপারে দুদক কেন নীরব?

ঢাকা, ১৭ জানুয়ারি – দেশের বাইরে সম্পদ বা বাড়ি করা বাংলাদেশিদের ব্যাপারে দেশের উচ্চ আদালত বার বার দুদককে তদন্তের নির্দেশ দিয়ে যাচেছন৷ কিন্তু দুদকের নিজের উদ্যোগে তদন্ত শুরুর নজির খুব কম৷ আর তদন্তে শেষ পর্যন্ত কী হয় তাও জানা যায় না৷

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের(টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘‘হাইকোর্টকে যে এই বার বার নির্দেশ দিতে হয় তাতে প্রমাণ হয় যে যাদের এই কাজ তারা ঠিকমত তাদের দায়িত্ব পালন করছে না৷

তবে দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম বলেন, ‘‘আমাদের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে আইনি প্রক্রিয়ায় এগোতে হয়৷ এটা সময়সাপেক্ষ৷’’

দুবাইয়ে ৪৫৯ বাংলাদেশির সম্পদ

সর্বশেষ দুবাইয়ে ৪৫৯ বাংলাদেশির সম্পদ কেনার অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে দুদকসহ চার সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট৷ দুদক ছাড়াও সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) এই নির্দেশ দেয়া হয়৷

বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রোববার এই আদেশ দেন৷ ৩০ দিনের মধ্যে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দিতে বলেছেন আদালত৷ পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য ধরে একটি রিটের শুনানিতে এই নির্দেশ দেয়া হয়৷

গত ১১ জানুয়ারি একটি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হয় যে দুবাইয়ে ৪৫৯ বাংলাদেশির এক হাজারের মতো প্রপার্টি আছে৷ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজের সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ইইউ ট্যাক্স অবজারভেটরি জানিয়েছে, বাংলাদেশে তথ্য গোপন করে দুবাইয়ে প্রপার্টি কিনেছেন ওই ৪৫৯ বাংলাদেশি৷ ২০২০ সাল পর্যন্ত তাদের মালিকানায় সেখানে মোট ৯৭২টি সম্পত্তি ক্রয়ের তথ্য পাওয়া গেছে৷ কাগজে-কলমে যার মূল্য সাড়ে ৩১ কোটি ইউএস ডলার৷

 

ওয়াসার এমডির ১৪ বাড়ি

এর কয়েকদিন আগে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক(এমডি) তাকসিম এ খানের যুক্তরাষ্ট্রে ১৪টি বাড়ি থাকার খবর প্রকাশিত হয় সংবাদমাধ্যমে৷ এরপর ৯ জানুয়ারি হাইকোর্টের একই বেঞ্চ ওই বাড়ির বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেয় দুদককে৷ তবে ওয়াসার এমডি অবশ্য যুক্তরষ্ট্রে তার স্ত্রীর নামে একটি বাড়ি থাকার কথা স্বীকার করেন৷ আর সব সম্পদের কথা অস্বীকার করেছেন৷

এর আগে যারা দেশের বাইরে অর্থ পাচার করে সেখানে সম্পদ গড়ে তুলেছেন তাদের একটি তালিকা দুদকের কাছে চায় হাইকোর্ট৷ গত বছরের ২৭ জানুয়ারি এরকম মোট ৬৭ জনের তালিকা হাইকোর্টে জমা দেয় দুদক তবে ওই তালিকায় বিস্তারিত তথ্য না থাকায় আদালত তখন অসন্তোষ প্রকাশ করেন৷ এর আগেও আদালতের নির্দেশে দুদক ২০২১ সালের ৬ ডিসেম্বর ২৯ ব্যক্তি ও ১৪ প্রতিষ্ঠানের তালিকা দেয়৷

লন্ডনের অভিজাত এলাকায়ও বাংলাদেশিরা

হাইকোর্টের সর্বশেষ নির্দেশের পরও বিদেশে বাংলাদেশিদের অঢেল সম্পদ থাকার তথ্য প্রকাশ হয়েছে৷ ১৫ জানুয়ারি একটি বাংলা দৈনিক খবর দিয়েছে লন্ডনের অভিজাত এলাকায় বাড়ির মালিক বিদেশিদের মধ্যে বাংলাদেশিরাও আছেন৷ খবরে বলা হয়, প্রাইম সেন্ট্রাল লন্ডনে প্রপার্টি ক্রেতাদের মধ্যে বিদেশি এখন ৪০ শতাংশ৷

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধনীদের বিনিয়োগ কোটায় অভিবাসনসংক্রান্ত সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাস্টনস এই তথ্য জানিয়েছে৷ তারা বলছে ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে ওই এলাকায় ৯৮টি লেনদেনের মাধ্যমে প্রায় ১২ কোটি ২৯ লাখ পাউন্ড মূল্যের প্রপার্টি কিনেছেন বাংলাদেশিরা৷ যা বাংলাদেশি মুদ্রায় এক হাজার ৫৬১ কোটি টাকা৷

মন্ত্রী জানে, দুদক জানে না

২০২১ সালের জুন মাসে খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল জানান যে কানাডায় ২৮ জন বাংলাদেশির বাড়ি কেনার তথ্য আছে তার কাছে৷ তিনি তখন জানান, ‘‘ওই ২৮ জনের চারজন মাত্র রাজনীতিবিদ, বাকিরা সরকারি কর্মকর্তা৷ কিন্তু দুদক সেই তথ্য নিয়ে আগে কাজ করেনি৷ সংবাদ মাধ্যমে এছাড়াও অষ্ট্রেলিয়া,মালয়েশিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের সম্পদের তথ্য ছাপা হয়৷ কানাডায় ‘বেগম পাড়া’ বলে পরিচিতি পেয়েছে বাংলাদেশিদের আবাসিক এলাকা৷ সেখানে বাংলাদেশি প্রবাসীদের একাংশ বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অনেক দিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন৷ সম্প্রতি কানাডা বিদেশিদের বাড়ি কেনার ওপর দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে৷

দুদক কী করে

দুদকের মানিলন্ডারিং অনুবিভাগ থেকে পাওয়া আংশিক তথ্য মতে, মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত এপর্যন্ত মোট ১১৭টি মামলা দায়ের হয়েছে, এর মধ্যে ৮৩টি মামলার তদন্ত চলছে৷ ৩২টি মামলায় চার্জশিট ও দুটি মামলায় ফাইনাল রিপোর্টসহ ৩৪টি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে, তদন্তাধীন ৮৩টি মামলায় ১১ জন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে৷

এই বিভাগের তথ্যে দেখা গেছে, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, হংকং, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ পাচার করা হয়েছে৷ পাচারের ধরনের ক্ষেত্রে দুদকের তিনটি মামলর ক্ষেত্রে অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট থেকে ঋণ নিয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে পাচার করার বিষয় তদন্তে পাওয়া গেছে৷ অন্যান্য ক্ষেত্রে হুন্ডি, ট্রেড বেইজড মানিলন্ডারিং না নগদ টাকা করা হয়েছে তা দুদক এখনো তদন্ত করে নির্ধারণ করতে পারেনি৷

তবে ২০২০ সালে হাইকোর্টে দাখিল করা দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, দুদক ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত অর্থ পাচারের অপরাধে ৪৭টি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে ও ৮৮টি মামলা তদন্ত করছে৷ পাচারের তুলনায় সামান্য অর্থ তারা ফেরতও এনেছে৷

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘‘বাংলাদেশে মানি লন্ডারিং ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে৷ তবে শুধু দুদক নয়, এটা প্রতিরোধের দায়িত্ব বাংলদেশ ব্যাংক, এনবিআর, সিআইডির৷ হাইকোর্টের এইসব ঘটনা তদন্তে বার বার নির্দেশ দেয়া প্রমাণ করে যে, যাদের এটা প্রতিরোধের দায়িত্ব তারা ঠিকমত দায়িত্ব পালন করছেন না৷”

তার কথা, ‘‘এর অনেক কারণ থাকতে পারে৷ অর্থসংক্রান্ত অপরাধ ধরার মতো সক্ষমতা না থাকা আবার দুদক আইনেরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে৷ এগুলো হয়তো যুক্তি হতে পারে৷ কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, দুবাইয়ের ঘটনায় যা দেখলাম যারা অর্থ পাচার করে সেখানে সম্পদ গড়েছেন তারা সবাই প্রভাবশালী৷ তারা রাজনৈতিকভাবেও প্রভাবশালী৷ আইনে আছে, আন্তর্জাতিক আইনে আছে তারপরও তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ হয় না৷ বিষয়টি এখন ধরলে হাত পুড়ে যাবার মতো অবস্থা হয়েছে৷ ”

আর দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম বলেন, ‘‘সংবাদমাধ্যম তথ্য দিতে পারে৷ কিন্তু সেই সব তথ্য আমাদের সঠিকভাবে আইনগত প্রক্রিয়ায় সংগ্রহ করতে হয়৷ দেশের বাইরের তথ্য আনতে হলে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্স-এর আওতায় আনতে হয়৷ এটা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার৷”

তার কথা, ‘‘আমরা প্রথমে তথ্য সংগ্রহ করে তা যাচাই বাছাই করি৷ তথ্য সঠিক হলে আমরা অভিযোগ গঠন( মামলা) করি৷ তারপর আবার তদন্ত এবং চার্জশিট হয়৷ তথ্য প্রমাণ সঠিক না হলে তো মামলা প্রমাণ করা যায় না৷”

তিনি বলেন, ‘‘আমাদের সংবাদ মাধ্যম থেকে যেরকম তথ্য পাই৷ তেমনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছ থেকেও অভিযোগ পাই৷”

‘হাইকোর্ট সর্বশেষ যে দুইটি বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন সেই আদেশের সার্টিফায়েড কপি আমরা পাইনি৷ পেলে তদন্ত শুরু হবে৷ তবে আমি কমিশনকে মৌখিকভাবে জানিয়ে দিয়েছি, জানান এই আইনজীবী৷

সূত্র: ডয়চে ভেল
আইএ/ ১৭ জানুয়ারি ২০২৩

Back to top button