জাতীয়

বাংলাদেশ কি আইএমএফের ঋণ সহজে পাচ্ছে?

গোলাম মওলা

ঢাকা, ১৫ জানুয়ারি – অর্থনীতির ‘কালো মেঘ’ যেন কেটে যায়, সেজন্য সরকার ভর্তুকি কমানোসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দেওয়া বেশ কিছু পরামর্শও বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে আজ রবিবার (১৫ জানুয়ারি) মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কোভিডের কারণে ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরের মুদ্রানীতি এক বছরের জন্য ঘোষণা করা হয়। আগের সফরে এসে আইএমএফের প্রতিনিধি দল বছরে দুই বার মুদ্রানীতি ঘোষণার পরামর্শ দিয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকও তাতে সম্মতি দিয়ে ছয় মাসের মুদ্রানীতি করার কথা বলেছিল। সেটির আলোকেই আগামী জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত চলতি অর্থবছরে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা হবে।

এই মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। অথচ ভর্তুকির কমানোর পরামর্শ মেনে নতুন করে বিদ্যুতের দাম ৫ শতাংশ বাড়িয়েছে সরকার। এর আগে গত আগস্টে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। আর গত জুনে বেড়েছে গ্যাসের দাম। বাড়তে পারে পানির দামও।

অবশ্য ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন হলে বেশ কিছু কঠিন শর্ত মানতে হবে বাংলাদেশকে। আইএমএফের ঋণের শর্ত পূরণ করতে পারছে না বলে পাকিস্তানের ঋণ আটকে আছে। এর আগে সরকার আইএমএফের কাছে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ চেয়ে চিঠি দেওয়ার পর আইএমএফের একটি দল বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে আইএমএফ প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছে। চলতি মাসের শেষে আইএমএফ বোর্ড বাংলাদেশের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করবে এবং ফেব্রুয়ারির শুরুতেই ঋণের প্রথম কিস্তি পাওয়া যাবে। চূড়ান্ত আলোচনার জন্য আইএমএফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) অ্যান্তইনেত মনসিও সায়েহ পাঁচ দিনের সফরে শনিবার (১৪ জানুয়ারি) ঢাকায় এসেছেন।

আইএমএফের উচ্চপদস্থ এই কর্মকর্তা ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীতে থাকবেন। সফরকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও সরকারের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।

জানা যায়, ১৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার দেখা করার কথা রয়েছে। ১৮ জানুয়ারি তিনি পদ্মা সেতু পরিদর্শন করবেন। বর্তমান বৈশ্বিক মন্দা এবং অন্যান্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের বিষয়ে সায়েহ আইএমএফ সদর দফতরে রিপোর্ট করবেন। তার প্রতিবেদন আইএমএফের বোর্ড সভায় উপস্থাপন করা হবে। এর ভিত্তিতে ঋণ দেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে।

সরকার আশা করছে, চূড়ান্ত অনুমোদনের পর ফেব্রুয়ারিতে আইএমএফের ঋণের প্রথম কিস্তি পাওয়া যাবে। প্রথম কিস্তি বাবদ ৪৫ কোটি ৪৫ লাখ ডলার মিলবে। এরপর প্রতি ছয় মাস পরপর পর্যালোচনা করে কিস্তির অর্থ ছাড় করা হবে। আইএমএফ বলেছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা চলছে। ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছে মার্কিন ডলার, যা আঘাত করছে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে। আইএমএফের দিক থেকে সহায়তা দেওয়ার পদক্ষেপ এ কারণেই নেওয়া হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিই ছিল। বাণিজ্য ঘাটতি, ক্রমবর্ধমান জ্বালানি খরচ, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকুচিত হওয়ার কারণে সংকটের কাছাকাছি রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। আইএমএফ থেকে বাংলাদেশ যে ঋণ পাচ্ছে, তা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সহায়তা করবে বলে আশা করছে সংস্থাটি।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, এটি আইএমএফের ৪২ মাসের ঋণ কর্মসূচি। বোঝাই যাচ্ছে সরকারকে অনেক শর্ত মেনে নিতে হবে। তবে ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের কাঠামোগত সংস্কারের কাজে হাত দেওয়াই উচিত সরকারের।

জানা গেছে, সরকার আইএমএফের সঙ্গে ঋণ নিয়ে একটি নীতিগত চুক্তিতে পৌঁছেছে। এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার অপেক্ষা।

আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি বাংলাদেশকে তিনটি বিভাগে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেবে। আইএমএফ এক্সটেন্ডেড ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি (ইসিএফ)-এর অধীনে ৮২২ দশমিক ৮২ মিলিয়ন সম্পূর্ণ সুদমুক্ত এসডিএফ প্রদান করবে।

আইএমএফ ফ্লোটিং এসডিএফআই+১ শতাংশ সুদের হারে এক্সটেনডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটির (ইসিএফ) অধীনে বাংলাদেশকে আরও ১ হাজার ৬৪৫ দশমিক ৬৪ মিলিয়ন এসডিএফ প্রদান করবে এবং রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটির (আরএসএফ) অধীনে ফ্লোটিং এসডিএফআই+০ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদের হারে ১ বিলিয়ন ডলার এসডিআর দেবে। এই ঋণ সাত কিস্তিতে পাওয়া যাবে। সুদের হার ফ্লোটিং হবে। এসডিআর সুদের হার অনুযায়ী সামগ্রিক ঋণের পরিমাণের ওপর গড় সুদের হার হবে ২ দশমিক ২ শতাংশ।

৩৫২ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন এসডিআর বা প্রায় ৪৪৭ দশমিক ৪৮ মিলিয়ন মূল্যের ঋণের প্রথম কিস্তি পাওয়া যাবে ফেব্রুয়ারিতে এবং পরবর্তী ছয়টি সমান কিস্তি হবে ৫১৯ মিলিয়ন এসডিআর বা প্রায় ৬৫৯ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ এর আগে ১২ বার আইএমএফের ঋণ পেয়েছে। ১৯৭২ সালে সদস্য হওয়ার পর আইএমএফ থেকে প্রথম ঋণ নেওয়া হয় ১৯৭৪ সালে। ২০১২ সালে নেওয়া সর্বশেষ ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার। সেটাই ছিল আইএমএফের কাছ থেকে নেওয়া সর্বোচ্চ ঋণ। আর এবার বাংলাদেশ পাবে আরও বেশি—৪৫০ কোটি ডলার। এই অর্থের মধ্যে ৩২০ কোটি ডলার পাওয়া যাবে বর্ধিত ঋণ সুবিধার (ইসিএফ-ইএফএফ) আওতায় এবং বাকি ১৩০ কোটি দেওয়া হবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায়। অর্থাৎ আগামী বাজেটে অর্থ ব্যয়ের জন্য সরকারের হাতে বাড়তি অর্থ থাকবে। আইএমএফ ছাড়াও বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকেও বাজেট সহায়তার অর্থ চেয়েছে সরকার।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন
এম ইউ/১৫ জানুয়ারি ২০২৩

Back to top button