জাতীয়

আমানউল্লাহ আমানকে নিয়ে বিএনপিতে ‘অস্বস্তি’

ঢাকা, ১৪ জানুয়ারি – ‘১০ ডিসেম্বরের পর দেশ চলবে খালেদা জিয়ার কথায়’-বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমানের এই বক্তব্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার রেশ এখনও কাটেনি। বিএনপি নেতারা মনে করছেন, আমানের ‘অপরিপক্ক’ এই বক্তব্যের মূল্য দিতে হয়েছে দলকে।

তার এই বক্তব্যের পর ১০ ডিসেম্বর বিএনপির কর্মসূচি ঘিরে সরকার বিরোধী দলের ওপর চড়াও হয়। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসসহ সিনিয়র নেতাদের গ্রেফতার হন। ১০ ডিসেম্বর স্বাভাবিক কর্মসূচি পালন করা হবে-বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার বলা হলেও সরকার সেটি বিশ্বাস করেনি। প্রশাসনের ধরপাকড়ে আন্দোলন স্তিমিত হয়।

আমানউল্লাহ আমানের বক্তব্য ও সাম্প্রতিক ভূমিকা নিয়ে বিএনপিতে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছে। তাকে মহানগর কমিটিতে না রাখার বিষয়েও মত দিয়েছেন অনেকে।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবারের স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও দলের অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যা, সন্দেহসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমানকে নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা হয়। বৈঠকে গুলশান কার্যালয়ে ১৫ সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ও আন্দোলন নিয়ে ‘বিতর্কিত’ বক্তব্যের পেছনে তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন স্থায়ী কমিটির নেতারা। এছাড়া নয়াপল্টনে চার শতাধিক নেতা-কর্মী গ্রেফতার হলেও প্রথমেই আমানের জামিন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন তারা।

স্থায়ী কমিটির ওই বৈঠকে নেতারা জানান, ক্ষমতাসীনদের নানা বাধার পরও গত কয়েক মাসে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন সফল করেছে বিএনপি। এতে সারাদেশের নেতাকর্মী ও সাধারণ সমর্থকদের মাঝে চূড়ান্ত আন্দোলনের মানসিকতা তৈরি হয়েছে। বিগত দিনের মতো তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও চূড়ান্ত আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু গত ১০ ডিসেম্বর গোলাপবাগের বিভাগীয় গণসমাবেশ এবং ১১ জানুয়ারি গণ-অবস্থান কর্মসূচিতে ঢাকার প্রস্তুতি মনোপূত হয়নি। আগামী দিনে কী কর্মসূচি নেওয়া যায়, সে বিষয়টিও ওঠে বৈঠকে। ঢাকাকে প্রস্তুত করে সরকার পতনের এক দফার চূড়ান্ত আন্দোলনে যেতে মত দেন নেতারা। বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারকের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে আমানউল্লাহ আমানকে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি। এছাড়া বিষয়টি নিয়ে স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা হলেও তারা বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

সূত্রমতে, বৈঠকে গত ১০ ডিসেম্বরের গণসমাবেশের আগে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমানসহ বেশ কয়েকজন নেতার বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হয়। এক অনুষ্ঠানে আমান বলেছিলেন, ‘১০ ডিসেম্বরের পর দেশ চলবে খালেদা জিয়ার কথায়’। ওই বক্তব্যের পর সরকার ভয় পেয়ে যান বলে মনে করেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। যদিও এ বক্তব্যের পর আমান উল্লাহ আমানকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ডেকে সতর্ক করেছিলেন।

আবারও সেই বিষয়টি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উঠে আসে। বৈঠকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ করে এক নেতা বলেন, গ্রেফতার হয়েছি কিনা তখনও জানতাম না। কিন্তু ডিবি অফিসে তার কাছে গল্পের ছলে জানতে চাওয়া হয়, আমরা বসে যাব কিনা? যতবারই বলেছি, তাদের এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেই। থাকলে আমি জানতাম। অন্যান্য বিভাগীয় গণসমাবেশের মতোই এটা একটি গণসমাবেশ। কিন্তু ডিবি পুলিশ কোনো অবস্থায় তা বিশ্বাস করতে চায়নি।

ওই নেতা বলেন, ইলিয়াস আলী গুমের ঘটনায় মুখ ফসকে একটি বক্তব্য দিয়েছিলাম, সেই ঘটনায় আমার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। তাহলে আমানের কাছে কেন ব্যাখ্যা চাওয়া হবে না? এরপর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বিষয়টি মহাসচিবকে দেখতে বলেন। বৈঠকে ওই নেতা আরও বলেন, সরকারের লোকজন সঙ্গে নিয়ে তো আর সরকার বিরোধী আন্দোলন করা যাবে না। যার কথাকে কেন্দ্র করে সবাই গ্রেফতার হয়েছেন, তাকেই আবার কারাগারে নেওয়ার আগে ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে সাধারণ নেতাকর্মীদের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এটা পরিষ্কার হওয়া দরকার।

সূত্রমতে, স্থায়ী কমিটির এ বৈঠকের আগে বুধবার নয়াপল্টনে গণঅবস্থান কর্মসূচিতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান সভাপতিত্ব করেননি। আগের দিন বিএনপি থেকে জানানো হয়েছিল গণঅবস্থান কর্মসূচিতে অন্যদের সঙ্গে পরিচালনায় থাকবেন আমানউল্লাহ আমান। এরপর থেকে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় তা আরো জোরালো হয়, গণ-অবস্থানে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নেতাকর্মী উপস্থিতি দেখতে চান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সে অনুযায়ী বিশেষ অতিথি হিসেবে মির্জা আব্বাস যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন দলের কেন্দ্রীয় একজন নেতা লাইভে বিস্তারিত দেখান। তখন ঢাকা মহানগরের উত্তরের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম।

সূত্র আরও জানায়, ১৫ সংগঠন নিয়ে জোট করল কে? এ প্রশ্নও ওঠে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে। ২০ দলীয় জোট ভেঙে দেওয়া, আবার গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ১৫ সংগঠনের সমন্বয়ে জোট করা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উদ্দেশে স্থায়ী কমিটির একজন নেতা জানতে চান, এটা কেমন হলো, আমরা জোট ভেঙে দিলাম, আবার গুলশান কার্যালয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবমুখী ১৫ সংগঠন নিয়ে একটি জোট গঠন করলাম-এটা কেমন বার্তা গেল? এ সময় স্থায়ী কমিটির আরেক নেতা বলেন, একটি বিষয়ে ফোকাস করা দরকার। ছোট ছোট দল নিয়ে গুলশান অফিসে একটি জোট হয়েছে। আসলে এগুলো কোনো রাজনৈতিক দল নয়। এ জন্যই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ৫৪ দলের ৫৪টি ঘোড়ার ডিম পাড়ার মতো মন্তব্য করার সুযোগ পেয়েছেন। এটা কারা করছে, কীভাবে করছে? এর একটা বিহিত হওয়া প্রয়োজন। এ জোট আত্মপ্রকাশের অনুষ্ঠানে স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু থাকলেও তিনি এ বিষয়ে জানতেন না। আমান উল্লাহ আমানের তত্ত্বাবধানে হয়েছে। একজন নেতা জানতে চান, আমানকে দলের অথরিটি কে দিয়েছে? এ সময় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও বলেন, তাকেও এ জোট গঠনের বিষয়ে অবহিত করা হয়নি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন নেতা ও একজন ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ঢাকা মহানগরের সমস্যা সমাধান এবং দলের সন্দেহভাজন নেতাদের দূরে রেখে আন্দোলনের পরিকল্পনা করলেই সফলতা আসবে। ২০১৪ সালের আন্দোলন ঢাকার নেতাদের জন্য ব্যর্থ হয়েছে। এবার সেই ঢাকাকে ঠিক করেই আন্দোলনে যেতে হবে।

সূত্র: যুগান্তর
এম ইউ/১৪ জানুয়ারি ২০২৩

Back to top button