জাতীয়

মিত্রবলয় বাড়াতে চায় আ. লীগ

মুহম্মদ আকবর

ঢাকা, ১১ জানুয়ারি – নানা কর্মসূচিতে রাজপথে রয়েছে বিএনপি। সভা-সমাবেশে তারা জোর গলায় বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে তারা সংসদ নির্বাচনে যাবে না। যদিও ভেতরে ভেতরে নির্বাচনে যাওয়ার ছক কষছে বলে গুঞ্জন আছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রীতিমতো ‘নির্বাচনী ট্রেনে’ উঠে গেছে। তাদের বেশির ভাগ কর্মসূচিই এখন নেওয়া হচ্ছে নির্বাচনকে মাথায় রেখে। আরেকবার ক্ষমতায় আসতে ঘর গোছানোর পাশাপাশি মিত্র বাড়ানোর নানা পরিকল্পনাও করে যাচ্ছে দলটি। এ ক্ষেত্রে তারা জাতীয় পার্টিসহ ছোট কিছু দলকে নির্বাচনী জোটে ভেড়াতে চায়। আবার যেসব দলের শীর্ষনেতাদের ভাবমূর্তি ভালো, তাদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের মিত্র বানানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, আগামী নির্বাচন ঘিরে দেশি-বিদেশি শক্তিগুলো বড় ধরনের ষড়যন্ত্র করতে পারে। আওয়ামী লীগের কাছে এ ধরনের তথ্যও রয়েছে। ফলে যেসব দেশ আগের নির্বাচনগুলোয় আওয়ামী লীগের পক্ষে ছিল, সেসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার পরিকল্পনা রয়েছে। আর যেসব দেশের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে, সেসব দেশকেও মিত্র বানাতে চায় দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। এ লক্ষ্যে দলের একাধিক ‘সেল’ কাজ করছে। অন্যদিকে আগামী জাতীয় নির্বাচন ঘিরে যেসব ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে পারে- তারাও আওয়ামী লীগের নজরে রয়েছে বলে দলটির নেতারা জানিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও চৌদ্দ দলের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু বলেন, ‘চৌদ্দ দলের বলয় বাড়ানোর বিষয়ে আমি জানি না। আমাদের মধ্যে এখনো এ নিয়ে কোনো আলাপ হয়নি।’

জানা গেছে, নির্বাচন সামনে রেখে একাধিক পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী ফোরাম। প্রথম পরিকল্পনা ছিল- স্বাধীনতার সপক্ষের দল ও বর্ষীয়ান নেতাদের নিয়ে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। এই তালিকায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), চৌদ্দ দল থেকে বের হয়ে যাওয়া বাংলাদেশ জাসদ ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নামও ছিল। তবে এই ভাবনা বেশিদূর এগোয়নি।

সূত্র বলছে, দ্বিতীয় পরিকল্পনায় আছে স্বাধীনতার সপক্ষের দলের সমন্বয়ে বিরোধীদলীয় শীক্ত হিসেবে দাঁড় করানো। এ বিষয়ে রাজনৈতিক মহলে দরকষাকষি চলছে বলেও একাধিক সূত্রে জানা গেছে। ব্যক্তিগত পরিচিতি যাদের আছে যেমন- ড. কামাল হোসেন, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও সুলতান মনসুরসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে দরকষাকষি চলছে বলে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগ নেতাদের ভাষ্য, স্বাধীনতার সপক্ষের ছোট বড় দলগুলোকে বিরোধী দলে রেখে বিএনপি-জামায়াতের বিকল্প শক্তি হিসেবে ভাবা হচ্ছে। এতে দেশকে স্বাধীনতার চিন্তা নিয়ে চলতে বেগ পেতে হবে না।

নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ মিত্রশক্তি বাড়ানোর কথা ভাবছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে দলটির সভাপতিম-লীর সদস্য আবদুর রহমান বলেন, ‘স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণকারী কোনো দল আমাদের জোটভুক্ত হতে চাইলে নিশ্চয়ই স্বাগত জানাব।’

দলের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য বলেন, ‘নির্বাচন একটা জটিল সমীকরণ। এ সমীকরণে অনেক কিছু দৃশ্যমান থাকে, অনেক কিছু অদৃশ্য থাকে। মনোনয়ন দেওয়া কিংবা কোনো আসনে ছাড় দেওয়ার মধ্য দিয়ে কিছু সমীকারণ বাস্তবায়ন হয়। এবারও এমন কিছু হতে পারে।’

সভাপতিম-লীর আরেক সদস্য বলেন, আগামী নির্বাচনে বিদেশি শক্তির তীক্ষ্ন নজর রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা অধিকারের সীমারেখাও অতিক্রম করছে। সেই সঙ্গে দেশে বিরামহীন ষড়যন্ত্র তো আছেই। সব মিলে আগামী নির্বাচনটা খুব সহজ হবে বলে আওয়ামী লীগ মনে করছেন না। তবে আগামী এক বছর বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম আরও দৃশ্যমান হবে। এসব উন্নয়ন কার্যক্রম দেখিয়ে, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় আওয়ামী লীগের অনিবার্যতা তুলে ধরে এবং রাজনীতির হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে দলটি ফের ক্ষমতায় আসবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী পরিকল্পনা সম্পর্কে দলের যুগ্ম সাধারণ আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘জয় পেতে আওয়ামী লীগ জনসমর্থনের বিষয়েই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।’

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন বলেন, ‘চলার পথে নীতি-আদর্শের প্রশ্নে ঐক্য তো হতেই পারে। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে বিশ্বাসী; যারা মনে করেন, শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতীক- তাদের সঙ্গে তো ঐক্য হতেই পারে।’

দলটির আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘ভোটের রাজনীতির হিসাবে আওয়ামী লীগের বড় বন্ধু হলো জনগণ। তাই জনগণের সঙ্গে কোথাও সম্পর্কের ছেদ পড়েছে কিনা, আওয়ামী লীগ তা খতিয়ে দেখবে এবং সমস্যা থাকলে সমাধান করবে। আর এটা করতে পারলে নির্বাচনে জেতার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। তবে যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন, যারা দেশটাকে ভালোবাসেন, তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগ দেশ গড়তে চায়।’

দেশের-বিদেশের ষড়যন্ত্র নিয়ে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ড. শাম্মী আহম্মেদ বলেন, ‘ষড়যন্ত্র তো হচ্ছেই। কারণ তারেক জিয়া লন্ডনে বসে অবৈধ পয়সা দিয়ে লবিস্ট নিয়োগ করে ষড়যন্ত্র করছে। আওয়ামী লীগ জন্মলগ্ন থেকেই ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে আসছে। জনগণ সঙ্গে থাকলে পৃথিবীর কোনো শক্তিই যে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, তা আমরা একাত্তরে প্রমাণ করেছি।’ তিনি বলেন, ‘ষড়যন্ত্র হচ্ছে এটা আপনারাও জানেন, আমরাও জানি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আমাদের সুস্পর্ক থাকবে; কিন্তু তাদের কাছে ধন্যা দেওয়া তো অন্য জিনিস। তাদের কাছে দেশের স্বার্থবিরোধী কথা বলতে গেলে তারা তো একটা কমেন্ট করবেই। নিজেদের জাহির করতে চাইবে। সেই সুযোগ তো আমরাই করে দিচ্ছি। একটা হলো সম্পর্ক রাখা, আরেকটা হলো দেশের বিরুদ্ধে, সংবিধানের বিরুদ্ধে কথা বলা- এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। এখানে আমি বিদেশিদের দোষ দিচ্ছি না। আমাদের দেউলিয়াত্বই আমাদের জন্য দোষের।’

সূত্র: আমাদের সময়
আইএ/ ১১ জানুয়ারি ২০২৩

Back to top button