জাতীয়

গণঅবস্থান থেকে নতুন কর্মসূচি দেবে বিএনপি

নজরুল ইসলাম

ঢাকা, ১০ জানুয়ারি – সরকারের পদত্যাগসহ ১০ দফা দাবিতে গণঅবস্থান কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আগামীকাল বুধবার বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো যুগপৎ আন্দোলন শুরু করছে। এ নিয়ে দলগুলো ব্যাপক প্রস্তুতিও নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দল ও জোট নেতারা জানান। গণঅবস্থান কর্মসূচি থেকে যুগপৎ আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

এই আন্দোলনের মূল দল বিএনপি নতুন কর্মসূচি ঠিক করতে সমমনা দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। গতকাল সোমবার ১১ দলীয় জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট ও ১২ দলীয় জোটের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছে। এসব বৈঠকে পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে আলোচনায় আছে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় লংমার্চ, রোডমার্চ, পদযাত্রা ও পথসভা এবং ২৫ জানুয়ারি ‘বাকশাল দিবস’ পালন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সমমনা দল ও জোটের মতামতের পর পরবর্তী কর্মসূচি চূড়ান্ত করবে বিএনপি। জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় বলেন, ‘গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটিয়ে দেশে ভোটাধিকার, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। যত নির্যাতন করা হোক, এখান থেকে পেছনে ফেরার কোনো সুযোগ নেই।’

এদিকে, যুগপৎ আন্দোলনে থাকা জামায়াতের সঙ্গে গত ৩০ ডিসেম্বরের কর্মসূচির পর বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি বলে জামায়াত নেতারা জানিয়েছেন। দলটির নেতারা বলেন, রাজধানী ঢাকার মালিবাগে গত ৩০ ডিসেম্বর গণমিছিলে পুলিশি আক্রমণ করা হলে জামায়াতের বহু নেতাকর্মীকে আহত ও গ্রেপ্তার করা হয়। এ পর্যন্ত বিএনপির

দিক থেকে এ নিয়ে কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। এমনকি জামায়াতের সঙ্গে কোনো নেতা যোগাযোগও করেননি। এ নিয়ে জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, ‘এ ঘটনায় জামায়াত নেতাকর্মীদের মাঝে অসন্তোষ আছে। গত ৩০ ডিসেম্বরের পর বিএনপির পক্ষ থেকে কেউই যোগাযোগ করেনি। এর পরও আমরা যুগপৎ আন্দোলনে আছি, দেখা যাক।’

জানতে চাইলে জামায়াতের নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১১ জানুয়ারি গণতন্ত্র হত্যা দিবস পালন করবে।’ মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, ‘১১ জানুয়ারি আমরা বিভাগীয় শহরে আলোচনা সভা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেখানে যুগপৎ আন্দোলনের ১০ দফাও থাকবে।’

জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের এক নেতা বলেন, ‘যুগপৎ আন্দোলন করব কাদের সঙ্গে? আন্দোলনের মূল দল বিএনপি। তারা কী চায় তা তাদের স্পষ্ট করতে হবে। তারা কী সরকারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী, নাকি সবার মতামতের ভিত্তিতে আন্দোলন করবে? সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সবার লক্ষ্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটিয়ে নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করা। ফলে চূড়ান্ত আন্দোলনে যাওয়ার আগে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের বোঝাপাড়া হতে হবে।’

জামায়াতের এক নেতা বলেন, সরকারের দিক থেকে জামায়াত নানা চাপে আছে। যেহেতু তাদের পক্ষে গণঅবস্থান কর্মসূচি করা সম্ভব নয়; সে কারণে গণঅবস্থান কর্মসূচি না করে ১১ জানুয়ারি সেনা সমর্থিত ওয়ান ইলেভেন সরকারের ক্ষমতাগ্রহণের দিনটিকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করবে জামায়াত।

সরকারের পদত্যাগ, সংসদ বিলুপ্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনসহ ১০ দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দল ও জোট। যুগপৎ আন্দোলনের প্রথম কর্মসূচি গত বছরের শেষদিকে ঢাকায় ৩০ ডিসেম্বর ও অন্যান্য জেলা ও মহানগরে ২৪ ডিসেম্বর গণমিছিল করে। যুগপৎ আন্দোলনের দ্বিতীয় দফার কর্মসূচি ও নতুন বছরের প্রথম কর্মসূচি গণঅবস্থান করবে মোস্তফা মোহসীন মন্টু নেতৃত্বাধীন গণফোরাম, ৪ দলের জোট গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য এবং ১৫টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত সমমনা গণতান্ত্রিক জোট। যুগপৎ আন্দোলনের প্রথম দফার কর্মসূচিতে ৩২টি রাজনৈতিক দল ও সংগঠন রাজপথে ছিল।

আগামীকাল বুধবার ঢাকাসহ ১০ বিভাগীয় শহরের গণঅবস্থান কর্মসূচি সফল করতে আন্দোলনের মূল দল বিএনপি ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। মূল দল বিএনপি ও অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠনের জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌর, থানা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড পর্যায়ের বিভিন্ন ইউনিট এরই মধ্যে গণসংযোগ, কর্মিসভা, লিফলেট বিতরণসহ প্রস্তুতিমূলক কর্মকা- প্রায় শেষ করেছে।

এদিকে, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের জামিনে মুক্ত হওয়ায় নেতাকর্মীদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। এ অবস্থায় ১১ জানুয়ারি নয়াপল্টনে গণঅবস্থান কর্মসূচিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেবেন। এ ছাড়াও স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে কুমিল্লায় ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, সিলেটে গয়েশ্বরচন্দ্র রায়, রাজশাহীতে ড. আবদুল মঈন খান, ময়মনসিংহে নজরুল ইসলাম খান, চট্টগ্রামে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, রংপুরে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়ারম্যানদের মধ্যে খুলনায় শামসুজ্জামান দুদু, ফরিদপুরে আহমদ আজম খান থাকবেন। এসব কর্মসূচি সফল করতে দফায় দফায় বৈঠক করে নানা দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম বিভাগের দলনেতা মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘সরকারের পতনের লক্ষ্যে নতুন বছরে প্রথম কর্মসূচি নিয়ে আমরা মাঠে নামছি। ১১ জানুয়ারির গণঅবস্থান সফলে আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি। এ জন্য বিভাগের নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রস্তুতি সভা করেছি। আশা করি, আমাদের এ কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষও সম্পৃক্ত হবেন।’ তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে বিভাগীয় এ কর্মসূচি পালনে লালদীঘির ময়দান বা কাজীর দেউড়ির সামনে স্থান চাওয়া হয়েছে। আশা করি, সরকার এতে অনুমতি দেবে।’

ময়মনসিংহ বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ‘শান্তিপূর্ণভাবে আমরা কর্মসূচি পালন করব। আমরা সব সময় পুলিশকে যেমন অবহিত করি, ঠিক একইভাবে অবহিত করেছি। ময়মনসিংহ শহরে বিএনপির কার্যালয়ের সামনে নতুন বাজারসংলগ্ন হরিকিশোর রায়ের রোডে গণঅবস্থান কর্মসূচি করব।’

বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ বলেন, নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে হবে গণঅবস্থান কর্মসূচি। প্রস্তুতি ভালো, সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা সেখানে উপস্থিত থাকবেন। শান্তিপূর্ণভাবে চার ঘণ্টার কর্মসূচি শুরু এবং শেষ করব। আশা করছি, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে সরকার বাধা দেবে না।’

মাঠে থাকবে ৩৪ রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী পরিষদসহ আরও ১৫ সংগঠন : যুগপৎ আন্দোলনের শুরুতে গণমিছিলের কর্মসূচিতে সমমনা রাজনৈতিক দল ও জোট তেমন প্রভাব ফেলতে না পারলেও এবারের কর্মসূচিকে ঘিরে নানা তৎপরতা শুরু করেছেন তারা। কাল গণঅবস্থান কর্মসূচিতে বিএনপি ছাড়াও সাতদলীয় গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, ১১ দলীয় জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট মাঠে থাকবে। এ ছাড়াও কর্নেল (অব) ড. অলি আহমেদের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি- এলডিপি, মোস্তফা মোহসীন মন্টুর নেতৃত্বাধীন গণফোরাম, ৪ দলীয় জোট গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য এবং ১৫ সংগঠন সমন্বয়ে সমমনা গণতান্ত্রিক জোটও মাঠের থাকার ঘোষণা দিয়েছে।

গণঅবস্থান কর্মসূচি বাস্তবায়নে সাতদলীয় জোট গণতন্ত্র মঞ্চ কয়েক দফা প্রস্তুতি বৈঠক করেছে। ওইদিন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে তারা গণঅবস্থান কর্মসূচি পালনে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জোটের একাধিক নেতা জানিয়েছেন। পূর্ব পান্থপথ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বড় আকারে গণঅবস্থান কর্মসূচি পালনে প্রস্তুতি নিচ্ছে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি- এলডিপির নেতাকর্মীরা। এ ছাড়াও সব বিভাগীয় শহরে দলটির এ কর্মসূচি পালন করবে।

বিজয়নগর পানির ট্যাঙ্কের সামনে গণঅবস্থান কর্মসূচি পালন করবে ১২ দলীয় জোট। পুরানা পল্টন মোড়ে কর্মসূচি পালনের কথা জানিয়েছেন ১২ দলের জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সমন্বয়ক ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। আরামবাগে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কে এ কর্মসূচি পালন করবে মোস্তফা মোহসীন মন্টু নেতৃত্বাধীন গণফোরাম। জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম এক বিবৃতিতে জানান, বুধবার ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ পালন করবে তারা। এ জন্য দেশের সব মহানগরী শাখায় আলোচনা সভা করা হবে।

সূত্র: আমাদের সময়
আইএ/ ১০ জানুয়ারি ২০২৩

Back to top button