জাতীয়

রাজউকের গায়েব নথি উদ্ধারে তোড়জোড়

শাহজাহান মোল্লা

ঢাকা, ১০ জানুয়ারি – অনলাইনে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বরাবর হাজার হাজার গ্রাহক প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ যে সব আবেদন করেছেন, সেগুলো গায়েব হয়ে গেছে; রীতিমতো হ্যাক হয়ে গেছে রাজউকের সার্ভার। এ সংবাদ পুরনো। সর্বশেষ সংবাদ হচ্ছে, এসব নথিপত্র পুনরুদ্ধারে শুরু হয়েছে কর্তৃপক্ষের তোড়জোড়; তদন্তে নামানো হয়েছে ৩টি প্রতিষ্ঠান। তদন্তকারী এসব প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর রাজউককে নিশ্চিত করেছে, ফাইলগুলো হ্যাক হয়েছে। তবে কে, কীভাবে হ্যাক করেছে- এসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। হ্যাকিংয়ের নেপথ্য কারণই বা কী- তাও জানা যায়নি।

রাজউক চেয়ারম্যান বলছেন, এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে পাওয়া যাবে উত্তর। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, রাজউকেরই কিছু কর্মকর্তা এ হীনকা-ের সঙ্গে জড়িত। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে চেয়ারম্যান বলেন, রাজউকের কেউ জড়িত থাকলে তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

 

জানা গেছে, টেকনোহ্যাভেন কোম্পানি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ সেবাটি দেওয়া হতো। বিস্ময়কর হলেও সত্যি, হ্যাক হওয়ার পর জানা গেছে রাজউকের কাছে নাকি এর কোনো নিয়ন্ত্রণই ছিল না! হ্যাক হওয়ার পর তথা সার্ভার বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত রাজউকের কর্মকর্তারাই জানতেন না যে, এটি তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। গত ১৭ ডিসেম্বর দৈনিক আমাদের সময়ে ‘রহস্যজনকভাবে রাজউকের নকশা অনুমোদন সার্ভার বন্ধ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এর পর নড়েচড়ে বসে কর্তৃপক্ষ। সার্ভারটি যে তৃতীয় পক্ষের কাছে এবং এতে যে কর্তৃপক্ষের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই- এসব বিষয়ে সজাগ হয়।

 

এদিকে রাজউক বলছে তাদের ৩০ হাজার ফাইল হারিয়ে গেছে। কিন্তু ৩০ হাজার নয়, বাস্তবে ৬৯ হাজার ফাইল গায়েব হয়ে গেছে বলে রাজউকের পরিকল্পনা উন্নয়ন শাখার একাধিক কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে। এত বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের আবেদন তৃতীয় পক্ষের হাতে এভাবে অরক্ষিত রাখা কতটা যৌক্তিক ছিল? এখন এমন প্রশ্ন তুলছেন খোদ রাজউকেরই অনেক কর্মকর্তা। রাজউকের নিজস্ব কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকাটা খুবই অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন তারা। কর্মকর্তাদের কেউ কেউ অনলাইন সেবার পরিবর্তে আগের মতো ম্যানুয়াল পদ্ধতির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলছেন, আগে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ থাকলেও কখনো ফাইল গায়েব হয়েছে বলে তাদের জানা নেই। এখন তো সবই গেল।

দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ এবং ফাইল আটকে রেখে বাড়তি টাকা আদায়ের ভোগান্তি থেকে গ্রাহকদের মুক্তি দিতে ২০১৯ সালের ২ মে তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম অটোমেশন পদ্ধতির উদ্বোধন করেন। এতে করে রাজউকের ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র (এলইউসি), কনস্ট্রাকশন পারমিট (সিপি) বা নির্মাণ অনুমোদন এবং অকুপেন্সি সার্টিফিকেট (ওসি) ইত্যাদি বিষয় অনলাইনেই সম্পন্ন হতো। আগে এসব কাজে ছয় মাস থেকে এক বছর লেগে যেত। অনলাইন চালু হওয়ার পর এসব কাজ মাত্র এক মাসের মধ্যেই হয়ে যেত। অনলাইন সেবা চালু হওয়ার পর গ্রাহকরাও অনেকটা স্বস্তি বোধ করতে শুরু করেন। কোন ফাইল কোন টেবিলে রয়েছে, কার্যক্রম কতটা এগিয়েছে- ইত্যাদি বিষয় অনলাইনে সার্চ করেই জানতে পারতেন গ্রাহক। কিন্তু আধুনিক ও প্রযুক্তিসমৃদ্ধ এ সেবা কাদের যোগসাজশে কীভাবে হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল- এ প্রশ্ন তুলেছেন গ্রাহকরা। কারণ এতে করে তারা ফের চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

গত সপ্তাহে রাজউকের সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্টকে নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন রাজউক চেয়ারম্যান। সেখানে তাকে কড়া জেরার মুখে পড়তে হয়। বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চেয়ারম্যান মহোদয় তো টেকনিক্যাল পার্ট বোঝেন না। রাজউকের যিনি সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট তিনিও কোনো যথার্থ জবাব দিতে পারেন না। এটা কোনো কথা হলো? তিনি জানান, বৈঠকে সিস্টেম অ্যানালিস্টের কাছে জানতে চাওয়া হয় কীভাবে এমন চুক্তি হলো? এত দিন কেন সেটি রাজউককে অবহিত করা হয়নি?

অভিযোগ রয়েছে বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহল ইচ্ছাকৃতভাবেই সার্ভার হ্যাক বা বন্ধ রেখে নিজেদের কাজ গুছিয়ে নিতেই এমনটি করেছেন। তবে রাজউক ভবনে কর্মকর্তাদের মুখে মুখে আলাপ শোনা গেছে যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি ছিল তাদের যোগসাজশে কেউ হয়তো এটি করেছেন।

গ্রাহকদের দাবি নতুন বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) গেজেট হওয়ার পর পরই এমন কা- নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। বিশেষ করে রাজউক থেকে একটা সুযোগ যখন দেওয়া হলো যে, ২৩ আগস্টের আগে যাদের প্ল্যান জমা আছে তারা আগের নিয়মেই অনুমতি পাবেন। অর্থাৎ ২০ ফুটের নিচে একটা সড়কের পাশে কোনো ভবন নির্মাণ করতে চাইলে ১০ বা ১২ তলা পর্র্যন্ত করতে পারবেন। মানুষ সেই সুযোগটা নিতে যখন তড়িঘড়ি করছিল তখনই ওয়েবসাইট বন্ধ।

সার্ভার বন্ধ হয় ৬ ডিসেম্বর। আর ৪ ডিসেম্বর রাজউক থেকে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে- সবার অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে, রাজউক অধিভুক্ত এলাকায় ২০২২ সালের ২৩ আগস্ট বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (২০২২-২০৩৫- গেজেট আকারে প্রকাশিত হওয়ার পূর্বে ঢাকা মহানগর ইমারত [নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ] বিধিমালা ২০০৮ এবং ড্যাপ ২০১০-২০২২) আলোকে জমাকৃত সব ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র/অনাপত্তিপত্র পূর্বতন নিয়মে অর্থাৎ ২০২২ পূর্ববর্তী জমাকৃত যেসব ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র অনলাইনে আবেদনকারীর আইডিতে রিসাবমিট স্টেজ পেন্ডিং রয়েছে তা আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সব কাগজপত্র/জিজ্ঞাসার জবাবসহকারে রিসাবমিট করার জন্য আবেদনকারীদের অনুরোধ করা হলো। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে রিসাবমিট করতে ব্যর্থ হলে আবেদনপত্র বাতিলের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।

রাজউক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা বলেন, অনুমোদিত নকশার হার্ড কপি আমাদের কাছে আছে। সেগুলো হারালেও কোনো সমস্যা নেই। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া সব রিকভারি হয়ে যাবে। যারা এ বিষয়ে অভিজ্ঞ তারা কাজ করছে। তবে আমাদের একটা বিষয় নিশ্চিত করেছে হারিয়ে যাওয়া সবগুলো রিকভারি হবে। মাঝখান দিয়ে সেবা প্রত্যাশীদের একটু সময় ব্যয় হলো। এ ছাড়া কোনো ক্ষতি হয়নি। কোনো আবেদনই মুছে যায়নি। আবেদনের সঙ্গে যে সংযুক্তি থাকে জমির দলিল, মিউটেশন, প্ল্যানের নকশা এগুলো ডিলিট হয়েছিল। সেগুলো আবার সবই রিকভারি হবে। রিকভারি হয়েও গেছে। সেগুলো যাচাই বাছাই করে ফাইলভিত্তিক সাজানো কাজ চলছে। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে সব ঠিক হয়ে যাবে।

কারা এই কাজের সঙ্গে জড়িত? চিহ্নিত হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, ‘সেটা খুঁজে বের করার জন্য তিনটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। জাতীয় কম্পিউটার কাউন্সিলের একটি অভিজ্ঞ টিম কাজ করছে। এ ছাড়া রাজউক থেকে সাইবার ক্রাইমে অভিযোগ করা হয়েছিল। তারাও তদন্ত করছে। তা ছাড়া বুয়েটের কম্পিউটার বিভাগ থেকে আরও একটি তদন্ত করছে। সবই রাজউকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তদন্তে যদি রাজউকের কেউ জড়িত থাকার প্রমাণ মেলে আমরা কাউকে ছাড় দেব না। তদন্তকারী সংস্থাগুলো প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে এটি হ্যাক হয়েছে। কিন্তু কে করেছে সেটা এখনো নিশ্চিত করে বলেনি। আশা করি কম সময়ে সেই তথ্যও পাব। রাজউক থেকে তাগিদও দিয়েছি, যেন দ্রুত দেয়।’

রাজউকের সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট কাজী মোহাম্মদ মাহাবুবুল হক বলেন, হারিয়ে যাওয়া ফাইল পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। ঠিক কত দিন লাগবে এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। তবে প্রসেসের মধ্যে রয়েছে। কোথা থেকে কী হয়েছিল সেগুলো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট এলেই জানা যাবে।

সূত্র: আমাদের সময়
আইএ/ ১০ জানুয়ারি ২০২৩

Back to top button