জাতীয়

মামলার ফেরে ৩১০০০ কোটি

ঢাকা, ৭ জানুয়ারি – বিচারাধীন রাজস্ব-মামলার সংখ্যা ২৩ হাজারের বেশি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে এসব মামলার নিষ্পত্তি হলে সরকারের আদায় হবে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু রাজস্ব-মামলার আপিল ট্রাইব্যুনাল, জজ কোর্ট, হাইকোর্ট প্রভৃতি পার হয়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে বছরের পর বছর লেগে যায়। উপরন্তু নতুন মামলা যোগ হয় প্রায় প্রতিদিন। এতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বাড়ে এবং নিষ্পত্তি হয়ে রাজস্ব আদায়ে গতি কমে যায়। কবে এ জট কাটবে তা অনিশ্চিত।

এসব মামলার বেশিরভাগ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের দায়ের করা। ভ্যাটে বা আমদানি-রপ্তানিতে ব্যবসায়ীরা যে অঙ্কের রাজস্ব পরিশোধ করেছেন এনবিআরের হিসাব তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা মামলা করেছেন। বিচারাধীন আয়কর মামলার বেশিরভাগই বড় অঙ্কের। এগুলোর অর্ধেকের বেশি করদাতারা করেছেন। এনবিআর থেকে করা মামলার সংখ্যাও কম নয়।

মামলা সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এনবিআরের হিসাবমতো রাজস্ব পরিশোধ না করলে করদাতাকে বা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকে এনবিআরে তলব করা হয়। নির্ধারিত দিনে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এনবিআরে তথ্য-প্রমাণ নিয়ে হাজির হয়। এসব ক্ষেত্রে সমাধানে ২-৩ মাস বা বেশি সময় লেগে যায়।

যে পক্ষের প্রতিকূলে সিদ্ধান্ত হয় সে পক্ষ এনবিআরের আপিল ট্রাইব্যুনালে মামলা করে। নতুনভাবে শুনানি চলে। সবকিছু শেষ করে মামলা নিষ্পত্তিতে বছর পার হয়ে যায়। ট্রাইব্যুনালে হেরে যাওয়া পক্ষ জজ কোর্টে যায়। সেখানে হেরে যাওয়া পক্ষ উচ্চ আদালতে যায়। প্রতিটি ক্ষেত্রে শুরু থেকে নতুনভাবে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন ও সাক্ষ্যগ্রহণ চলে। আপিল ট্রাইব্যুনাল, জজ কোর্ট পার হতে পারেনি এমন মামলার সংখ্যাও কম নয়। এভাবে মামলাচক্রে আটকা পড়ে আছে রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। এক যুগ ধরে বিচারাধীন রয়েছে এমন রাজস্ব-মামলাও আছে। এনবিআর মামলাজট কমাতে চেষ্টা করছে। আদালতও আন্তরিক। তবু আশানুরূপ সাফল্য আসেনি।

এনবিআরের প্রধান কার্যালয় ও এনবিআরের বিভিন্ন দপ্তর থেকে অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে পৃথক পৃথক চিঠি দিয়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচারাধীন রাজস্ব-মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির প্রস্তাব করা হয়েছে। ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের সাবেক কমিশনার শওকত হোসেন অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে জোরালো চিঠি পাঠিয়েছিলেন।

ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের তৎকালীন কমিশনার (সাবেক) ও বর্তমানে এনবিআরের আপিলেট কমিশনের (২) কমিশনার শওকত হোসেন বলেন, আমি বিচারাধীন রাজস্ব-মামলার নিষ্পত্তিতে অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে চিঠি পাঠালে তিনি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেন। এসব মামলায় সামান্য কিছু আদায় হয়েছে, তবে বেশিরভাগ অনাদায়ী।

শওকত হোসেনের চিঠিতে উল্লেখ ছিল, সাজেক সোয়েটার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ১৮টি চালানে পণ্য আমদানিতে ৪৩ কোটি টাকা শুল্ক পরিশোধ করে। এনবিআর বলেছে, তাদের কাছে রাজস্ব পাওনা ৯৫২ কোটি টাকা। পাওনা পরিশোধ করে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য ছাড়িয়ে নিতে তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি এনবিআরের বিরুদ্ধে মামলা করে ব্যাংক গ্যারান্টি হিসেবে একটি লিখিত কাগজ বন্দরে জমা দিয়ে পণ্য ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। ৫ বছর ধরে এ মামলার পক্ষে-বিপক্ষে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন, শুনানি চলছে। এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে এখনো এনবিআর পাওনা রাজস্ব আদায় করতে পারেনি।

তার চিঠিতে আরও উল্লেখ ছিল, সাভার ডিইপিজেডের মেসার্স চায়না সাউথ ব্লিচিং অ্যান্ড ডাইং ফ্যাক্টরি লিমিটেডের কাছে ৫২০ কোটি টাকা রাজস্ব দাবি করেছে এনবিআর। গাজীপুরের ভোগরা এলাকার মেসার্স নাসরিন জামান লিটওয়্যার লিমিটেডের শুল্ককর ৫০ কোটি টাকা। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ এলাকার মেসার্স বাংলাদেশ তাইওয়ান সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কাছে শুল্ককর ৩০ কোটি টাকা। নরসিংদীর পলাশের মেসার্স দেশবন্ধু সুগার মিলস লিমিটেডের শুল্ককরের পরিমাণ ৯১ কোটি টাকা। ময়মনসিংহের ভালুকার বড়াডুবা এলাকার মেসার্স এক্সপেরিয়েন্স টেক্সটাইল লিমিটেডের কাছে এনবিআর ৩২ কোটি টাকা দাবি করেছে। মেসার্স এইচ কবীর অ্যান্ড কোং লিমিটেডের কাছে এনবিআর ২৫ কোটি টাকা রাজস্ব দাবি করেছে। নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাট এলাকার মেসার্স আনন্দ শিপইয়ার্ড অ্যান্ড শিপওয়েজ লিমিটেডের শুল্ককরের পরিমাণ ২৫ কোটি টাকা।

মামলা দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণ বিষয়ে এনবিআরের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজস্ব-মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্যে হাইকোর্টে গঠিত বেঞ্চের অপর্যাপ্ততা, অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরে রাজস্ব-মামলা পরিচালনায় আইন কর্মকর্তার স্বল্পতা, বিচারধীন মামলার সার্টিফায়েড কপিপ্রাপ্তিতে প্রক্রিয়াগত সমস্যা, ট্রাইব্যুনালের আদেশের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত রেফারেন্স মামলায় করদাতার আরজির কপি সংশিষ্ট দপ্তরের দেরিতে পাওয়া এবং রাজস্ব-মামলার শুনানিকালে আইন কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধিদের লিয়াজোঁর অভাব। আয়কর আইনের ১৬ সিসিসি অনুযায়ী ন্যূনতম কর না দিয়ে আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সরাসরি হাইকোর্টে রিট করার কারণেও মামলা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এ ছাড়া, অর্র্থ আইন অনুযায়ী সারচার্জ আরোপ করার বিরুদ্ধে মামলা করে নিয়মিত কর পরিশোধ করা হয় না।

এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করফাঁকির অভিযোগে আয়কর আইনের ৯৩ ধারায় মামলা পুনঃউšে§াচন করা হলে বা কোনো করদাতার তথ্য চেয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকে ১১৩ ধারায় নোটিস দিলে এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেও হাইকোর্টে রিট হয়। খেলাপি করদাতাদের কাছে বকেয়া আয়কর আদায়ের লক্ষ্যে ১৪৩ ধারা অনুযায়ী খেলাপি করদাতার ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হলেও হাইকোর্টে যাওয়া হয়। এসব কারণেও রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া জটে পড়ে। বিধিবিধান সম্পর্কে শুল্ককরদাতা ও আইন প্রয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাখ্যাগত পার্থক্যের কারণে (বিশেষভাবে শুল্কের পরিমাণ নিয়ে মতভিন্নতা, পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস, পরিমাণগত ও মিথ্যা ঘোষণার কারণেও) মামলা হয়। ভ্যাট সম্পর্কিত মামলায় অবৈধ রেয়াত গ্রহণ, ভ্যাট দলিলাদি রক্ষণাবেক্ষণ না করা, মিথ্যা দাখিলপত্র দেওয়া, ভ্যাট চালান না দেওয়া, উৎসে কর পরিশোধ না করা এবং সময়মতো ভ্যাট পরিশোধ না করা প্রভৃতি কারণেও মামলা হয়। সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন রাজস্ব-মামলার সংখ্যা ২৪ হাজার ৫৭২। এসব মামলার নিষ্পত্তি হলে রাজস্ব খাতে সরকারের আদায় হবে ৩০ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা।

এনবিআর সদস্য মইনুল খান বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভ্যাট পরিশোধ করেছে বা আমদানি রপ্তানিতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে শুল্ক জমা দিয়েছে। এনবিআরের নজরে এসব পড়লে ঠিকমতো রাজস্ব পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। অনেক অসাধু প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের অঙ্গীকারনামা দিয়ে পণ্য ছাড় করিয়ে মামলা করে ব্যবসা চালাতে থাকে। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত রাজস্ব পরিশোধে বাধ্য নয় ব্যবসায়ী। মামলার তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনে ও শুনানিতে অনেক সময় লেগে যায়। অসাধু ব্যবসায়ীরা রাজস্ব পরিশোধে প্রক্রিয়া বিলম্ব করতেই মামলা করে থাকেন। অনেক সময় এনবিআরের হিসাবের সঙ্গে একমত না হলেও মামলা করেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, পাওনার পরিমাণ নিয়ে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও এনবিআর একমত না হলেই সাধারণত মামলা হয়। মামলা নিষ্পত্তিতে সময় লাগার জন্য ব্যবসায়ীরা দায়ী নয়।

অর্থ মন্ত্রণালয় আদালতের বাইরে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির জন্য বিকল্প বিরোধনিষ্পত্তি আইনে (এডিআর) করদাতা, ব্যবসায়ী ও এনবিআরকে আহ্বান জানিয়েছে। এডিআরে দ্রুততম সময়ে মামলা নিষ্পত্তিতে ফ্যাসিলেটর হিসেবে এনবিআরের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ীদের নিয়ে সেল গঠন করা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় খুব একটা সফলতা আসেনি।

এডিআরের ফ্যাসিলেটর এনবিআরের সাবেক সদস্য আমিনুল করিম বলেন, এডিআরের আওতায় আয়কর খাতে কিছু করদাতা অংশ নিলেও শুল্ক ও ভ্যাট খাতে যেসব মামলা বিচারাধীন আছে সেসব আসছে না। ফলে রাজস্ব মামলাগুলোর কোনো সুরাহা হচ্ছে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এডিআরে রাজস্ব-মামলার নিষ্পত্তি হলে আদালতের চেয়ে কম পরিমাণে রাজস্ব পরিশোধ করা যাবে। কিন্তু বেশিরভাগ মামলার উদ্দেশ্য হচ্ছে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করে মামলা ঝুলিয়ে রাখা এবং রাজস্বও ঝুলিয়ে রাখা।

শীর্ষস্থানীয় এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করে বলেন, এডিআরে মামলা নিষ্পত্তিতে এনবিআরের দিক থেকে দক্ষতার অভাব রয়েছে। এজন্য এডিআর সফল হয়নি।

সূত্র: দেশ রূপান্তর
আইএ/ ৭ জানুয়ারি ২০২৩

Back to top button