ব্যবসা

রিজার্ভ সাশ্রয়ে ইডিএফ ঋণে আরও কড়াকড়ি

ঢাকা, ৫ জানুয়ারি – বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অর্থে গঠিত রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আকার কমিয়ে আনতে ঋণ বিতরণেও কড়াকড়ি আরোপ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ তহবিলের আওতায় বিতরণ হওয়া যেসব ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়েছে, সেগুলো আদায় না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে অর্থায়ন করবে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে এ তহবিলের ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর দাবি জানানো হলেও যাচাই-বাছাই শেষে সেটিও নাকচ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ ছাড়া ইডিএফ ঋণের চাপ কমাতে সম্প্রতি রপ্তানি সহায়ক ১০ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন তহবিল গঠন করা হয়েছে। চলমান ডলার সংকটে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ পাওয়ার শর্ত পূরণে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

রপ্তানি শিল্পের বিকাশ ও প্রসারের জন্য সহজ শর্তে ঋণ দিতে ১৯৮৯ সালে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল গঠন করা হয়। মাত্র ১ কোটি ৫০ ডলার নিয়ে গঠিত এ তহবিলের আকার রিজার্ভ থেকে অর্থের জোগান দিতে দিতে ৭০০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ইডিএফসহ অন্য ঋণ তহবিলগুলোতে জোগান দেওয়া অর্থ রিজার্ভ থেকে আলাদা করে দেখানোর পরামর্শ দিয়েছে। রিজার্ভের হিসাব আন্তর্জাতিক মানদ-ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতেই এমন পরামর্শ দেওয়া হয়।

সংস্থাটির পরামর্শ অনুযায়ী, রিজার্ভের অর্থে গঠিত তহবিলগুলো আলাদা করে দেখানো এবং এগুলো পর্যায়ক্রমে গুটিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরই মধ্যে রিজার্ভের অর্থে গঠিত গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড থেকে পুনঃঅর্থায়ন পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আর ইডিএফের আকার ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ কারণে এ তহবিল থেকে অর্থায়নে ক্রমশ কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, ইডিএফ থেকে আগের মতো ঢালাও ঋণ দেওয়া হচ্ছে না। এর পরিবর্তে সময়মতো ইডিএফের টাকা ফেরত আনতে ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া যেসব ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়েছে, সেসব ঋণ সমন্বয় না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে নতুন করে অর্থায়ন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ইডিএফ থেকে রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানির জন্য ৬ মাস বা ১৮০ দিন মেয়াদি ঋণ দেওয়া হয়। কেস টু কেস ভিত্তিতে এ মেয়াদ আরও ৩ মাস বা ৯০ দিন পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর ইডিএফ ঋণের পেমেন্ট প্রত্যাবাসিত রপ্তানি আয় থেকে দিতে হয়। বাজার থেকে ডলার কিনে এটা পেমেন্ট করার সুযোগ নেই। অর্থাৎ ইডিএফের পেমেন্ট করার জন্য অবশ্যই রপ্তানি করতে হবে এবং সেই রপ্তানির টাকা এনে পেমেন্ট করতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, গত মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) একটি প্রতিনিধি দল। ওই বৈঠকে গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার যুক্তি তুলে ধরে সংগঠনটির পক্ষ থেকে ইডিএফ ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর দাবি জানানো হয়। সভায় ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, গ্যাস সংকটের কারণে যথাসময়ে উৎপাদন করে রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ইডিএফের ঋণও ফেরত দেওয়া যাচ্ছে না। তাই চলমান পরিস্থিতিতে যতদিন পর্যন্ত গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়া যায়, ততদিন পর্যন্ত ইডিএফ ঋণের সাধারণ মেয়াদ অন্তত ১ মাস বাড়ানো যায় কিনা সেই দাবি জানান তারা। এ সময় যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে সংগঠনটির দাবি পর্যালোচনা করে দেখার আশ্বাস দেন গভর্নর।

জানা যায়, ওই বৈঠকের পর ইডিএফের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মতামত প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ আর্থিক বাজারে বিভিন্ন প্রামাণিক মেয়াদ ১ দিন, ৭ দিন, ১ মাস, ৩ মাস, ৬ মাস, ৯ মাস ও ১২ মাস নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২-এর বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত স্বল্পমেয়াদি ঋণের মেয়াদ ক্ষেত্র মতে ৯০ দিন হতে ১৮০ দিন নির্ধারিত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ৭ মাস মেয়াদ বিবেচনাযোগ্য নয় এবং এর বিপরীতে কোনো আইনি ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যমান ১৮০ দিনের মেয়াদ আরও ৩০ দিন বৃদ্ধি করে ২১০ দিনে উন্নীত করার প্রস্তাব যুক্তিগত নয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইডিএফ ঋণের মেয়াদ কেস টু কেস ভিত্তিতে বৃদ্ধির সুযোগ থাকায় স্বাভাবিক মেয়াদ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাও নেই। তাতে বলা হয়, যেসব ব্যাংকের ইডিএফ হতে গৃহীত ঋণের মেয়দোত্তীর্ণ বকেয়া রয়েছে, ওই সব ব্যাংকের অনুকূলে নতুন করে অর্থায়ন স্থগিত রাখতে হবে। তবে যেসব গ্রাহকের মেয়াদোত্তীর্ণ বকেয়া সম্পূর্ণরূপে সমন্বয় হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অন্য কোনো বকেয়া নেই, তাদের ক্ষেত্রে কেস টু কেস ভিত্তিতে নতুন অর্থায়ন সুবিধা অব্যাহত রাখা যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বলেন, ইডিএফ ঋণ নিয়ে নানা কথাবার্তা হচ্ছে। তবে ইডিএফ ঋণের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে গেছে এমনটিও নয়। এ কারণে এ স্কিমটার আদলে রপ্তানি সহায়ক আরেকটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। ওই তহবিল থেকেও এ খাতের উদ্যোক্তারা রপ্তানি পণ্যের কাঁচামাল আমদানির জন্য স্বল্প সুদে ঋণ পাবেন।

স্থানীয় রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বা স্থানীয়ভাবে সংগ্রহের বিপরীতে ব্যবসায়ীদের প্রাক-অর্থায়ন সুবিধা দিতে গত ১ জানুয়ারি ১০ হাজার কোটি টাকার একটি তিহবিল গঠন করা হয়েছে। এ তহবিল থেকে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন রপ্তানিকারকরা। তবে ইডিএফ থেকে ডলারে ঋণ মিললেও নতুন তহবিল থেকে নিতে হবে টাকায়। ঋণের মেয়াদ হবে ১৮০ দিন। তবে রপ্তানি বিল যথাসময়ে ফেরত না আনতে পারলে একবার ৯০ দিন মেয়াদ বাড়ানো যাবে।

জানা যায়, এক সময় লন্ডন ইন্টার ব্যাংক অফার রেটের (লাইবর) সঙ্গে ইডিএফের ঋণের সুদহার নির্ধারিত হতো। করোনার প্রভাব শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত ছয় মাসের গড় লাইবরের সঙ্গে দেড় শতাংশ যোগ করে সুদহার নির্ধারিত হতো। তবে করোনা ভাইরাসের প্রভাব শুরুর পর তহবিল খরচ কমাতে প্রথম দফায় দুই শতাংশ সুদ নির্ধারণ করা হয়। এর পর গত ২০ জুলাই সুদের হার বাড়িয়ে ৩ শতাংশ করা হয়। আর সবশেষে গত মাসে সুদের হার আরও এক শতাংশ বাড়িয়ে ৪ শতাংশ নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ১৩ নভেম্বর থেকে এ নতুন সুদহার কার্যকর হয়েছে।

সূত্র: আমাদের সময়
আইএ/ ৫ জানুয়ারি ২০২৩

Back to top button