জাতীয়

এক কমিটি থেকে বাদ পড়ে অন্য কমিটিতে আছেন বিতর্কিতরাও

অমরেশ রায়

ঢাকা, ০৩ জানুয়ারি – আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে এসেছে অনেক নতুন মুখ। জ্যেষ্ঠতার ক্রমে এসেছে কিছুটা রদবদল। তিন দফায় ঘোষিত ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ, উপদেষ্টা পরিষদ ও জাতীয় কমিটির ‘চমক’ বলতে এটুকুই। এর বাইরে পুরোনোরাই ঘুরেফিরে আছেন নতুন তিন কমিটিতে। এক কমিটি থেকে বাদ পড়লেও আরেক কমিটিতে ঠাঁই মিলেছে কয়েকজন নেতার।
সাংগঠনিক দক্ষতা ও যোগ্যতার মূল্যায়নে কারও কারও পদোন্নতি ঘটলেও বাদ পড়েছেন দু’একজন। তবে, বিতর্কিত ব্যক্তিদেরও জায়গা হয়েছে নতুন কমিটিতে। উপদেষ্টা পরিষদে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত দু’জনের বিরুদ্ধে রয়েছে গুরুতর অভিযোগ।

রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা বলছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এবার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে খুব বেশি পরিবর্তন আনার ঝুঁকি নিতে চায়নি ক্ষমতাসীন দলটি। যদিও ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের পর আগাম আরেকটি জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে দলের নেতৃত্বে আমূল পরিবর্তন আসার ইঙ্গিত আগেই দিয়ে রেখেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। গত ২৪ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলনের কাউন্সিল অধিবেশনে সভাপতি পদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা দশবার এবং সাধারণ সম্পাদক পদে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের টানা তৃতীয়বার নির্বাচিত হন। কাউন্সিল অধিবেশনে অনেকগুলো পদ ফাঁকা রেখে ৮১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের ৪৮ জন, ৫১ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদের ৪২ জন ও জাতীয় কমিটির দলীয় সভাপতি মনোনীত ২১ সদস্যের ১৬ জন নেতার নাম ঘোষণা করেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা।
এর দু’দিন পর নবনির্বাচিত সভাপতিমণ্ডলীর প্রথম বৈঠকে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক পদে জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। গত রোববার ফাঁকা পদগুলোতে মনোনীতদের নাম ঘোষণার মধ্য দিয়ে দলের কেন্দ্রীয় এই তিন ফোরাম পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। তবে এখনও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যের একটিসহ শ্রম ও জনশক্তিবিষয়ক সম্পাদক এবং একটি কার্যনির্বাহী সদস্য পদ ফাঁকা রাখা হয়েছে। একইভাবে উপদেষ্টা পরিষদের পাঁচটি ও জাতীয় কমিটির দলীয় সভাপতি মনোনীত একটি সদস্য পদ খালি রয়েছে।

‘চমক’ দেখালেন যাঁরা :তিন ফোরাম মিলিয়ে এবার নতুন মুখ হিসেবে এসেছেন ১২ নেতা। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদে পাঁচজন, উপদেষ্টা পরিষদে তিনজন ও জাতীয় কমিটিতে চার নেতার অন্তর্ভুক্তি হয়েছে। আরও পাঁচ নেতা রয়েছেন, যাঁরা কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ থেকে বাদ পড়লেও উপদেষ্টা পরিষদে ঠাঁই পেয়েছেন।
কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য পদে এবার নতুন যুক্ত হয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা জেবুন্নেছা হক। এর আগে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ সদস্য ছাড়াও সিলেটে দল ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পদে ছিলেন তিনি। নারীজাগরণে বিশেষ অবদানের জন্য বেগম রোকেয়া পদক এবং বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব পদক পাওয়া প্রবীণ রাজনীতিবিদ জেবুন্নেছা হককে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে এনে সম্মানিত করেছেন শেখ হাসিনা। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১৯ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলীতে এখনও একটি পদ ফাঁকা রয়েছে।

যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক পদে মাশরাফি বিন মুর্তজার অন্তর্ভুক্তিও ছিল আরেক ‘চমক’। কার্যনির্বাহী সদস্যের ২৮ পদের মধ্যে এখন পর্যন্ত যে ২৭ জনের নাম ঘোষণা করা হয়েছে, এর মধ্যে ২৩ জনই পুরোনো কমিটিতে একই পদে কিংবা অন্য পদে ছিলেন। নতুন যুক্ত হয়েছেন চারজন। তাঁরা হচ্ছেন- অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী আরাফাত, তারানা হালিম, নির্মল কুমার চ্যাটার্জি ও কবি তারিক সুজাত। এর মধ্যে দলের গবেষণাধর্মী কাজের সঙ্গে যুক্ত অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী আরাফাত টেলিভিশন টকশোতে সরকার ও আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার জন্য বেশ পরিচিত। অভিনেত্রী তারানা হালিম সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। তারিক সুজাত জাতীয় কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক। আর নির্মল কুমার চ্যাটার্জি স্বেচ্ছাসেবক লীগের বর্তমান সহসভাপতি এবং বাংলাদেশ পূজা উদ?যাপন পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। অবশ্য, নতুন কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য পদ পাওয়া সাখাওয়াত হোসেন শফিক গত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তাঁকে প্রথমে সাংগঠনিক সম্পাদক পদ থেকে বাদ দেওয়া হলেও বগুড়ার একমাত্র নেতা বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত কার্যনির্বাহী কমিটিতে রেখে দেওয়া হয়েছে।

তবে গত কার্যনির্বাহী সংসদের পাঁচ নেতাকে বয়সজনিত ও অসুস্থতার কারণে এবার উপদেষ্টা পরিষদে রাখা হয়েছে। তাঁরা হলেন- রমেশ চন্দ্র সেন, নুরুল ইসলাম নাহিদ, হাবিবুর রহমান সিরাজ, অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান খান ও হারুনুর রশীদ। এর মধ্যে রমেশ চন্দ্র সেন, নুরুল ইসলাম নাহিদ ও অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খান গত কমিটিতে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। আর হাবিবুর রহমান সিরাজ শ্রম ও জনশক্তিবিষয়ক সম্পাদক এবং হারুনুর রশীদ যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। এ ছাড়া উপদেষ্টা পরিষদে নতুন যুক্ত হয়েছেন তিনজন। তাঁরা হলেন- সাবেক তথ্য কমিশনার অধ্যাপক সাদেকা হালিম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মাজেদা রফিকুন্নেছা।
এ ছাড়া জাতীয় কমিটির দলীয় সভাপতি মনোনীত সদস্য হিসেবে নতুন যুক্ত হয়েছেন চারজন। তাঁরা হচ্ছেন- মঞ্জুরুল হক লাভলু, অ্যাডভোকেট বলরাম পোদ্দার, অধ্যক্ষ জোবায়দা খাতুন পারুল ও আব্দুল্লাহ আল মামুন তোফাজ্জল।

পদোন্নতির ‘চমক’ :নতুন কমিটিতে পদোন্নতি পেয়ে খানিকটা ‘চমক’ দেখিয়েছেন চার নেতা। তাঁদের মধ্যে ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য করা হয়েছে। বিদায়ী কমিটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ছিলেন তিনি। বিদায়ী কমিটির ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দীকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে। নতুন ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক হয়েছেন আমিনুল ইসলাম আমিন। বিদায়ী কমিটিতে উপপ্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ছিলেন তিনি। এ ছাড়া নতুন কমিটির উপপ্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে এসেছেন সৈয়দ আবদুল আউয়াল শামীম। তিনি আগের কমিটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন। সাংগঠনিক দক্ষতা ও যোগ্যতার বিচারে পদোন্নতি দিয়ে এই চার নেতাকে পুরস্কৃত করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি।

পদের ক্রমে বড় ‘চমক’ :নতুন কমিটির সভাপতিমণ্ডলীতে আগের কমিটির প্রায় সবাই বহাল থাকলেও জ্যেষ্ঠতার ক্রমে বড় রদবদল এনেছেন শেখ হাসিনা। সভাপতিম লীর নামের ক্রমে শীর্ষস্থান দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রামের ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে। আগের কমিটির জ্যেষ্ঠ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন প্রয়াত সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। তাঁর মৃত্যুর পর সভাপতিমণ্ডলীর শীর্ষস্থানে চলে আসা মতিয়া চৌধুরীর অবস্থান জাতীয় সম্মেলনে ঘোষিত কমিটিতেও সেটাই ছিল। তবে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার সময় মতিয়া চৌধুরীর নাম দ্বিতীয়তে নেমে এসেছে। এ ছাড়া নতুন কমিটিতে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম ও নতুন অন্তর্ভুক্ত ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের নাম শাজাহান খান, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আব্দুর রহমানের ওপরে রাখা হয়েছে।
তবে নতুন কমিটি ঘোষণায় বড় ‘চমক’ এসেছে চারটি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে। এই পদে পুরোনো চারজনই পুনর্বহাল হলেও তাঁদের ক্রমে রদবদল ঘটিয়েছেন শেখ হাসিনা। এ ক্ষেত্রে বিদায়ী কমিটির তিন নম্বর সিরিয়ালে থাকা ড. হাছান মাহমুদকে এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। বিদায়ী কমিটির এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফকে দুই নম্বরে, চার নম্বরে থাকা আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমকে তিন নম্বরে এবং তিন নম্বরে থাকা ডা. দীপু মনিকে সবার শেষে নিয়ে আসা হয়েছে। জাতীয় সম্মেলনে ঘোষিত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকদের এই ক্রম পূর্ণাঙ্গ কমিটিতেও বহাল রেখে সংশ্নিষ্টদের ভাবনার কিছুটা ‘খোরাক’ জুগিয়েছেন দলীয় সভাপতি।

বাদ পড়লেন মোশাররফ-কাওছার :দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য পদ থেকে সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বাদ পড়াকেও কিছুটা ‘চমক’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দু’দফায় আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী এবং বর্তমান মেয়াদসহ টানা তিন দফায় ফরিদপুর-৩ আসনের নির্বাচিত এই সংসদ সদস্য আগে থেকেই বিতর্কিত ছিলেন। ২০২০ সালের জুনে ফরিদপুরে দুর্নীতিবিরোধী বিশেষ অভিযানে তাঁর ভাইসহ ঘনিষ্ঠ অনেক সহযোগী গ্রেপ্তার হয়ে এখনও কারাগারে। বর্তমানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়বিষয়ক মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি হলেও খন্দকার মোশাররফ হোসেন দীর্ঘদিন ধরেই সংসদে অনুপস্থিত। নির্বাচনী এলাকাতেও যান না। এখন দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।

অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ থেকে বাদ পড়া একমাত্র নেতা হচ্ছেন অ্যাডভোকেট এবিএম রিয়াজুল কবির কাওছার। তিনি গত কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য থাকলেও এবার কোথাও জায়গা দেওয়া হয়নি।

তবু বিতর্ক রয়েই গেল : আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ঠিক করা হয় চুলচেরা যাচাই-বাছাই ও বিচার-বিশ্নেষণ শেষে। যোগ্যতা ও দক্ষতার পাশাপাশি সততা ও স্বচ্ছ ইমেজের ব্যক্তিরাই স্থান পান দলটিতে। তবে সদ্য ঘোষিত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ এবং উপদেষ্টা পরিষদে তিন ‘বিতর্কিত’ নারীর নাম অন্তর্ভুক্ত করায় কিছুটা হলেও সমালোচনার মুখে পড়েছে নতুন কমিটি।

এর মধ্যে উপদেষ্টা পরিষদের নতুন সদস্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠায় সে সময় ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। উপদেষ্টা পরিষদের আরেক সদস্য মাজেদা রফিকুন্নেছা ফিলিপাইনের রাষ্টদূতের দায়িত্ব পালনকালে নিজ পরিবারের তিন সদস্যকে দূতাবাসে নিয়োগ দিয়ে সমালোচনার জন্ম দেন। তাঁর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ভিসা ফি আদায়ের অভিযোগও ছিল।
অন্যদিকে, সদ্য সমাপ্ত রংপুর সিটির ভোটে শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও জামানত হারানো আওয়ামী লীগ প্রার্থী অ্যাডভোকেট হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া আবারও কার্যনির্বাহী সদস্য পদ পাওয়ায় আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তিনি আগের কমিটিতেও একই পদে ছিলেন।

সূত্র: সমকাল
আইএ/ ০৩ জানুয়ারি ২০২৩

Back to top button