জাতীয়

কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় এক বছরে ১০৩৪ শ্রমিকের মৃত্যু

ঢাকা, ০২ জানুয়ারি – ২০২২ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ১০৩৪ জন শ্রমিক নিহত এবং ১০৩৭ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হয়ে ১৩৫ জন শ্রমিক নিহত এবং ১৫৫ জন আহত হন।

বিভিন্ন সেক্টরে ১৯৬টি শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে ১১৫টি শ্রমিক অসন্তোষ ঘটে তৈরি পোশাক খাতে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে ‘বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মক্ষেত্র পরিস্থিতি বিষয়ে সংবাদপত্র ভিত্তিক বিলস জরিপ-২০২২’-এ এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। জরিপে দুর্ঘটনা, নির্যাতন, শ্রম অসন্তোষ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এই জরিপ প্রকাশ করা হয় সোমবার (২ জানুয়ারি)।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ১০৩৪ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়, এরমধ্যে ১০২৭ জন পুরুষ এবং ৭ জন নারী শ্রমিক। খাত অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি ৪৯৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয় পরিবহন খাতে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১৮ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয় নির্মাণ খাতে। তৃতীয় সর্বোচ্চ ১১২ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয় কৃষি খাতে। এছাড়া দিনমজুর ৪৬ জন, কনটেইনার ডিপোতে ৪৪, মৎস্য শ্রমিক ৪৩ জন, ইলেক্ট্রিক শ্রমিক ২২ জন, নৌ-পরিবহন খাতে ১৫ জন, হোটেল রেস্টুরেন্ট শ্রমিক ১২ জন, ইটভাটা শ্রমিক ১০ জন, জাহাজ ভাঙা শিল্প শ্রমিক ৭ জন, কেমিকেল ফ্যাক্টরি শ্রমিক ৬ জন এবং অন্যান্য খাতে ১০০ জন শ্রমিক নিহত হন।

২০২২ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ১০৩৭ জন শ্রমিক আহত হন, এরমধ্যে ৯৬৪ জন পুরুষ এবং ৭৩ জন নারী শ্রমিক। মৎস্য খাতে সর্বোচ্চ ৫০৩ জন শ্রমিক আহত হন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কনটেইনার ডিপোতে ১২৫ জন আহত হন। তৃতীয় সর্বোচ্চ তৈরি পোশাক খাতে ৯০ জন শ্রমিক আহত হন। এছাড়া পরিবহন খাতে ৮৭ জন, নির্মাণ খাতে ৮৬ জন, নৌ পরিবহন খাতে ২৫, জাহাজ ভাঙা শিল্পে ২৩ জন, উৎপাদন শিল্পে ১৫ জন, কৃষি শিল্পে ১৫ জন, মেডিসিন ফ্যাক্টরিতে ১২ জন, দিনমজুর ৯ জন, স্টিল মিলে ৭ জন এবং অন্যান্য খাতে ৪০ জন শ্রমিক আহত হন।

সড়ক দুর্ঘটনা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, বজ্রপাত, অগ্নিকাণ্ড, সমুদ্রে ঘূর্ণিঝড়ে ট্রলার ডুবি, পড়ন্ত বস্তুর আঘাত, মাথায় কিছু পড়া, বিষাক্ত গ্যাস, নৌ দুর্ঘটনা, দেয়াল/ছাদ ধসে পড়া, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ইত্যাদি কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

২০২১ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ১০৫৩ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয় এবং আহত হন ৫৯৪ জন শ্রমিক।

জরিপ অনুযায়ী ২০২২ সালে কর্মস্থলে আসা-যাওয়ার পথে ৩৬ জন শ্রমিক নিহত এবং ১২২ জন শ্রমিক আহত হন। নিহত শ্রমিকদের মধ্যে ১৩ জন নারী শ্রমিক এবং আহত শ্রমিকদের মধ্যে ৫৩ জন নারী শ্রমিক ছিলেন। ২০২১ সালে কর্মস্থলে আসা-যাওয়ার পথে ৯১ জন শ্রমিক নিহত এবং ১১৪ জন শ্রমিক আহত হন।

সংবাদপত্র ভিত্তিক জরিপ অনুযায়ী, ২০২২ সালে কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হন ৩৩৮ জন শ্রমিক। এরমধ্যে ২৯৪ জন পুরুষ এবং ৪৪ জন নারী শ্রমিক। ৩৩৮ জনের মধ্যে ১৩৫ জন নিহত, ১৫৫ জন আহত, ৩৪ জন নিখোঁজ, ১ জনের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয় এবং অপহৃত ১৩ জনকে পরবর্তীতে উদ্ধার করে পুলিশ। অপহৃতদের মধ্যে ১০জন মৎস্য শ্রমিক এবং তিনজন ইটভাটা শ্রমিক ছিলেন।

সবচেয়ে বেশি ৯০ জন শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হন পরিবহন সেক্টরে, যার মধ্যে ৬৪ জন নিহত, ২৬ জন আহত হন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬৬ জন শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হন মৎস্য খাতে, যার মধ্যে ৪ জন নিহত, ২২ জন আহত, ৩০ জন নিখোঁজ এবং ১০ জন শ্রমিককে উদ্ধার করে পুলিশ। তৃতীয় সর্বোচ্চ ৩৩ জন গৃহশ্রমিক নির্যাতনের শিকার হন, যার মধ্যে ১২ জন নিহত, ২০ জন আহত, ১ জনের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়।

এছাড়া ৩৩ জন গণমাধ্যমকর্মী নির্যাতনের শিকার হন, যার মধ্যে একজন নিহত এবং ৩২ জন আহত হন। ২৯ জন নিরাপত্তাকর্মী নির্যাতনের শিকার হন, যার মধ্যে ১০ জন নিহত এবং ১৯ জন আহত হন। কৃষি খাতে ২৫জন শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হন, যার মধ্যে ১৮ জন নিহত, ৬ জন আহত এবং একজন নিখোঁজ হন।

কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের ধরনগুলোর মধ্যে রয়েছে—শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ, ছুরিকাঘাত, খুন, রহস্যজনক মৃত্যু, অপহরণ, মারধর ইত্যাদি। ২০২১ সালে কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হন ২৮৬ জন শ্রমিক। এরমধ্যে ২৩২ জন পুরুষ এবং ৫৪ জন নারী শ্রমিক।

জরিপ অনুযায়ী, ২০২২ সালে কর্মক্ষেত্রের বাইরে নির্যাতনের শিকার হন ৩৩০ জন শ্রমিক। এরমধ্যে ২১৩ জন নিহত, ৭৪ জন আহত, ১ জন নিখোঁজ, ৪২ জনের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়। ৩৩০ জনের মধ্যে ২৫২ জন পুরুষ এবং ৭৮ জন নারী শ্রমিক। কর্মক্ষেত্রের বাইরে নির্যাতনের ধরনগুলোর মধ্যে রয়েছে—শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, যৌন হয়রানি, ছুরিকাঘাত, খুন, রহস্যজনক মৃত্যু, অপহরণ, মারধর ইত্যাদি। ২০২১ সালে ৩০০ জন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রের বাইরে নির্যাতনের শিকার হন।

২০২২ সালে বিভিন্ন সেক্টরে সব মিলিয়ে ১৯৬টি শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটে। জরিপ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ৮৯টি শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটে বকেয়া বেতনের দাবিতে। এছাড়া দাবি আদায়ে ৪০টি, বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে ১৯টি, বেতন বাড়ানোর দাবিতে ১১টি, লে-অফের কারণে ৭টি, বোনাসের দাবিতে ৬টি এবং অন্যান্য দাবিতে ২৪টি শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটে। আন্দোলন করতে গিয়ে এ সময় ১০ জন শ্রমিক আহত হন। আহতদের মধ্যে ৭ পুরুষ এবং ৩ জন নারী শ্রমিক ছিলেন। আহতদের মধ্যে সবাই টেক্সটাইল মিলের শ্রমিক ছিলেন।

২০২১ সালে বিভিন্ন সেক্টরে সব মিলিয়ে ৪৩১টি শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে বেশি ১৭২টি শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনা ঘটে তৈরি পোশাক খাতে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫০টি শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনা ঘটে পরিবহন খাতে। এছাড়া ২০২০ সালে বিভিন্ন সেক্টরে সবমিলিয়ে ৫৯৩টি শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনা ঘটে।

সূত্র: বাংলানিউজ
এম ইউ/০২ জানুয়ারি ২০২৩

Back to top button